
শেষ আপডেট: 1 September 2018 13:04
দেবার্ক ভট্টাচার্য্য
'দাদা, একটা টিকিট হবে?' হোয়াটাসঅ্যাপ থেকে শুরু করে ফেসবুক গ্রুপ, সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে একটাই প্রশ্ন। বড় ম্যাচের আগে টিকিটের জন্য হাহাকার, সকাল থেকে ক্লাব তাঁবু, আইএফএ অফিসের সামনে লম্বা লাইন মনে করিয়ে দিচ্ছে সত্তর আশির দশকের ছবি। মোহন সমর্থকেরা টগবগ করে ফুটছেন বড় ম্যাচের আগে। আর হবে নাই বা কেন? বহুদিন পরে যে মোহনবাগান কলকাতা লিগের ডার্বি খেলতে নামছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের থেকে এগিয়ে। হোক না সেটা বেশি গোল করার জন্য। তবু এগিয়ে তো। একটাই দাবি। ডার্বি জিততেই হবে। আর এই অবস্থায় সবুজ মেরুন সমর্থক থেকে শুরু করে বাগান কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তী সবাই একজনের দিকেই তাকিয়ে। ডিপান্ডা ডিকা। ক্যামেরুনের এই ফরোয়ার্ডই যে তাঁদের নয়নের মণি। লিগ শুরু হওয়ার আগের দিনেই কলকাতায় পা দিয়েছিলেন বলে প্রথম ম্যাচে তাঁকে নামাননি কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তী। যদিও তিনি বলেছিলেন দেশে প্র্যাকটিসের মধ্যেই ছিলেন। আর সেটা যে সত্যি তা প্রমাণিত হলো পরের ম্যাচ থেকেই।
প্রায় প্রতি ম্যাচেই গোল পাচ্ছেন। আগের বছরের ফর্ম যেন ধরে রেখেছেন ডিকা। প্রায় একার কাঁধেই প্রতি ম্যাচে দলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। আর গোলের পর দেখা যাচ্ছে সদ্য সন্তান জন্মানোর আনন্দে তাঁর অভিনব সেলিব্রেশন। ফুটবলের পরিভাষায় প্রলিফিক স্ট্রাইকার বলতে যা বোঝায়, ডিকা ঠিক তাই। গোলটা খুব ভালো চেনেন। অফ দ্য বল ঠিক জায়গায় নিজেকে নিয়ে যেতে পারেন। উইথ দ্য বল ডিফেন্ডারকে সঙ্গে নিয়ে খেলতে পারেন। হেড, শুটিং সব ভালো। পঞ্চাশ পঞ্চাশ সিচুয়েশনে বল জালে জড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
এই ডিকার গোলেই গত দুই ডার্বিতে জয় পেয়েছিল মোহনবাগান। আর তাই রবিবাসরীয় ডার্বিতেও মোহন জনতার উৎসব করার প্রধান দায়িত্ব ডিকার কাঁধেই। তবে ডিকা নিজে কিন্তু সেটা মানতে নারাজ। তিনি টিম গেমের পক্ষপাতি। বারবার বলছেন, 'আমি কেন, হেনরিও তো আছে।' তবে যেদিন থেকে ডিকা-হেনরি জুটি সবুজ মেরুন আক্রমণ ভাগে খেলা শুরু করেছেন, সেদিন থেকেই শঙ্করলাল উগান্ডার স্ট্রাইকার হেনরিকে খেলাচ্ছেন একটু পেছন থেকে। তাঁর প্রধান কাজ হলো ডিকার জন্য বল তৈরি করা। শেষ ম্যাচে এরিয়ানের বিরুদ্ধেও দেখা গিয়েছে সেই ছবি।
কিন্তু রবিবার তো সামনে এরিয়ান নয়, থাকবে ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্স। থাকবেন মোহন তাঁবু ছেড়ে ইস্টবেঙ্গল তাঁবুতে যোগ দেওয়া কিংশুক, চলতি মরশুমে দারুণ খেলা সামাদ আলি মল্লিক। আর সর্বোপরি কোস্টারিকান বিশ্বকাপার জনি অ্যাকোস্টা। ডার্বিতেই যাঁর অভিষেক হতে চলেছে। চলতি মরশুমে জর্জ টেলিগ্রাফের বিরুদ্ধে জাস্টিন মরগ্যানের বিশ্বমানের গোল ছাড়া একটাও গোল হজম করতে হয়নি মিনার্ভা ছেড়ে লাল হলুদে যোগ দেওয়া গোলকিপার রক্ষিত ডাগরকে।
তাই কাজ যে মোটেই সহজ হবে না সেটা জানেন কোচ শঙ্করলাল চক্রবর্তী। তাই ডার্বির আগে ওপেন প্লে ছাড়াও বারবার সেট পিসের অনুশীলন করিয়েছেন তিনি। দল যদি ওপেন প্লে থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যাতে সেটপিস থেকে ফসল তুলতে পারেন। আর সেটপিসের জন্য মোহন কোচ যাঁর দিকে তাকিয়ে তিনি হলেন, বহু ডার্বির নায়ক, বহু যুদ্ধের সাক্ষী, এতদিনের ইস্টবেঙ্গল মিডফিল্ড জেনারেল মেহতাব হোসেন। যদিও চলতি লিগে প্রত্যেক ম্যাচেই দ্বিতীয়ার্ধেই মেহতাবকে নামিয়েছেন শঙ্করলাল, কিন্তু ডার্বিতে হয়তো প্রথম থেকেই দেখা যেতে পারে ময়দানের এই বুড়ো ঘোড়াকে।
কিন্তু গোল করলেই তো শুধু হবে না, মাঝমাঠের কর্তৃত্ব রাখা কিংবা ডিফেন্স মজবুত রাখার কাজটাও তো সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর এখানেই মোহনবাগানের থেকে এগিয়ে লালহলুদ। কারণ ইস্টবেঙ্গল মাঝমাঠে রয়েছেন সিরিয়ান জাদুকর আল আমনা। সঙ্গে পাহাড়ি বিছে ডানমাওয়াইয়া ও ব্র্যান্ডন। এ বার তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন মিনার্ভাকে আই লিগ চ্যাম্পিয়ন করতে মূখ্য ভূমিকা নেওয়া কমলপ্রীত সিং ও কাশিম আইদারা। তাই বলাই যায় ইস্টবেঙ্গল মাঝমাঠ খেলা পরিচালনা করলে ডিকাদের কাজটা সহজ হবে না। আর সেজন্যই বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে সেই মেহতাব হোসেন, সৌরভ দাস, ব্রিটো, পিন্টু মাহাতাদের।
লিগের প্রথম দুটো ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল অ্যাটাকিং ফোর্সের দুর্বলতা চোখে পড়লেও সেটা অনেকটাই ঢেকে দিয়েছেন জবি জাস্টিন। কেরালার এই স্ট্রাইকারের হেড কোয়ালিটি খুব ভালো। ডার্বিতে যদি সুভাষ ভৌমিক জোড়া স্ট্রাইকার খেলাতে চান, তাহলে হয়তো জবির সঙ্গে জুটি বাধবেন বালি গগনদীপ। চলতি মরশুম খুব একটা ভালো না কাটলেও ডার্বি তো অনেককেই নায়ক বানিয়েছে। তাই বড় ম্যাচকেই হয়তো পাখির চোখ করতে চাইছেন পাঞ্জাবের এই স্ট্রাইকার।
চলতি মরশুমে মাঝেমধ্যেই মোহন ডিফেন্সে দুর্বলতা চোখে পড়েছে। দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার নাইজিরিয়ান কিংসলে ও কিম কিমার মধ্যে মাঝে মধ্যেই বোঝাপড়ার অভাব চোখে পড়ছে। এই সুযোগ যাতে ইস্টবেঙ্গল নিতে না পারে তার জন্য বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছেন কোচ শঙ্করলাল। কারণ তিনি যানেন ডার্বি জিততে যতটা দরকার ডিকা-হেনরিকে ঠিক ততটাই দরকার কিংসলে-কিম কিমা জুটিকে।
বড় ম্যাচের আর ২৪ ঘণ্টাও বাকি নেই। ডার্বি জিততে পারলেই মোহনবাগানের লিগ খরা কাটবে। তাই দলের দুর্বলতা ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন মোহন কোচ। সেই সঙ্গে শান দিচ্ছেন নিজের সেরা অস্ত্রে। ডিপান্ডা ডিকা। মোহন কোচের তুরুপের তাস। মোহন সমর্থকদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।
সম্ভাব্য একাদশ :
গোলকিপার : শিল্টন পাল
ডিফেন্স : কিংসলে, কিম কিমা, অভিষেক আম্বেকর, অরিজিৎ বাগুই
মিডফিল্ড : মেহতাব হোসেন, ব্রিটো, সৌরভ দাস, পিন্টু মাহাতা
স্ট্রাইকার : ডিপান্ডা ডিকা, হেনরি কিসেকা
সম্প্রচার : বিকেল ৪.৩০, সাধনা নিউজ ( ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলেও দেখা যাবে খেলা )