
শেষ আপডেট: 31 July 2019 13:18
আমরা কলকাতায় আসি ৬৮ সালে। ভর্তি হই প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেই তখন থেকে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্ক। মাঠে আসা। খেলা দেখা। আর পাঁচটা সাপোর্টারের মতোই পাগলামি ছিল আমার। কিন্তু কখনওই ভাবিনি ক্লাবের কর্মসমিতিতে থাকব বা শতবর্ষ দেখবার সুযোগ পাব। ওই সময়ে ভাবতাম ষাট বছর বাঁচব। কিন্তু এখন মানুষের গড় আয়ু বেড়ে গিয়েছে। এখন আমার ৭০। তাই সুযোগ যখন পেয়েছি, তখন চেষ্টা করছি শতবর্ষের সমস্ত অনুষ্ঠানে নিবিড় ভাবে যুক্ত থাকতে।
ক্লাবে যুক্ত হওয়ার ঘটনাটা খুব মজার। যে বছর মুসা, জ্যাকসন আর ওপোকু এসেছিল, এটা সে বছরের কথা। ওপোকুর একটা চোট হয়েছিল। ইস্টবেঙ্গলের একজন কেউ ওকে আমার চেম্বারে নিয়ে যায়। আমি দেখে প্রেস্ক্রিপশন লেখার পর আমায় ফি দিতে যায়। আমি বলি, তুমি আমার থেকে অনেক ছোট। তুমি জানো না ইস্টবেঙ্গল আমার কাছে কী। তুমি ফি নিতে বলে আমায় ছোট কোরো না। তারপরই ক্লাব থেকে আমায় অফার দেয় টিমের সঙ্গে যুক্ত হতে।
স্পোর্টস মেডিসিনের কতটা প্রয়োজনীয়তা বা টিমের সঙ্গে একজন চিকিৎসক থাকা যে কতটা জরুরি, এটা ইস্টবেঙ্গলই প্রথম অনুভব করেছিল। আর আশিয়ান কাপ যেমন ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যের মুকুটে একটা পালক, তেমন এ দিক থেকেও একটা মাইলস্টোন। সেমিফাইনালে দেবজিতের (ঘোষ) ওই রকম চোট লাগল। ওঁকে যে ফিরিয়ে আনতে পারা যাবে ভাবিইনি। পরে সবাই বুঝল, কেন স্পোর্টস মেডিসিন দরকার।
ফাইনাল ম্যাচের আগে যা যা ঘটেছে, আর সেগুলো কী ভাবে সামলেছি আমিই জানি। মাইক ওকোরোকে নামিয়েছিলাম ইঞ্জেকশন দিয়ে, এটা অনেকেই জানেন। কিন্তু তার পিছনের কাহিনিটা অনেকেরই জানা নেই। স্ক্যাপুলো ক্ল্যাবিকুলার জয়েন্ট খুলে গিয়েছিল মাইকের। একটা ফলস এক্সরে প্লেট দেখিয়ে ওকে বলি, কিচ্ছু হয়নি তোমার। ইঞ্জেকশন নিলেই হবে। কোনও ফ্র্যাকচার নেই। মানসিক ভাবে উজ্জীবিত করি। মাঠে নামতে রাজি হয়। তারপর ওই অনবদ্য গোল। গোটা টিমটার খেলা বদলে গিয়েছিল ওর একটা গোলে।
শুধু তো ওকোরো নয়। ফাইনালের দিন টিম হোটেল থেকে সুভাষদা আমায় ফোন করে বলছেন, “শান্তিদা মুসা খেলতে চাইছে না। দেবজিৎকে খেলাতে হবে।” আমি তখনই বলি, দেবজিৎকে খেলানো কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। ওকে দশদিন মাঠের বাইরে রাখতে হবে। তাতে যদি মুসা না খেলে টিম নিয়ে ফিরে যাব। তাও আমি কোচকে বলি, দাঁড়ান। আমি কথা বলব মুসার সঙ্গে। পিঠের ব্যথায় কাতরাচ্ছে মুসা। আমি ওকে ওষুধ দিতে যাই। কিন্তু মুসাকে কে বুঝিয়েছিল, হোমিওপ্যাথি খেলে অ্যালোপ্যাথি খেতে নেই। ও কিছুতেই রাজি হল না। তারপর ওকে বলি ইঞ্জেকশন নাও। সেটা তো আর পেটে যাবে না। রাজি হয়। ওকেও মানসিক ভাবে বুস্ট করি। আমি আর ম্যানেজার মনীশ বন্দ্যোপাধ্যায় (বাবলা) অনেক দোকান ঘুরে বেল্ট কিনে আনি মুসার জন্য। ওটা পরেই ও ফাইনাল খেলেছিল। তারপর তো ইতিহাস।
কিন্তু সুরকুমারের যে স্ট্যামিনা আমি দেখেছি, তা আর কারও মধ্যে দেখিনি। একটা রাইট ব্যাকের ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে নখকুণি। এমনিতে নখকুণি হলে সাধারণ লোকে হাঁটতে পারে না। আর সুর ওই নিয়ে গোটা টুর্নামেন্ট খেলেছিল। আমায় শুধু বলত, “শান্তিদা, তুমি যা করার করো। আমি খেলব।” আমার কাজ ছিল, টিম মিটিং-এ যাওয়ার আগে ওর বুড়ো আঙুলটা ইঞ্জেকশন দিয়ে অবশ করে দেওয়া। কোচও জানতেন না এ কথা।
এত কিছুর পরও দিনের শেষে আমি একজন ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। সেই ৬৮ সালে যেমন ছিলাম, তেমনই। আমি সমর্থকদের বলি, তোমাদের রাগ হলে, তোমরা আমাকে বলতে পারো। কিন্তু আমি কাকে বলি? নিজের মধ্যেই পুষে রাখি।