শেষ আপডেট: 30 April 2020 16:08
"বঙ্গোপসাগর থেকে চুনী গোস্বামীর মত ধেয়ে আসে বাতাস।" লিখেছিলেন আমার প্রিয় কবি তারাপদ রায়। কলকাতার কোনও ফুটবলার বাংলা কবিতায়। সেই প্রথম। সেই শেষও। হয়তো।
১৯৭২ সাল। লোকটা "বুড়ো" তখন। খেলা ছেড়েছেন বেশ কয়েক বছর। একটা চ্যারিটি ম্যাচে ওনার খেলা দেখতে গেলাম। অবলীলায় সাত-আটজনকে কাটাচ্ছেন। গোল করছেন। পায়ে জাদুময় কারুকাজ। পছন্দ করতাম আগে থেকেই। বাঙাল হয়েও মোহনবাগান, ওনারই খেলার কল্যাণে। আর উনিও যে বাঙাল হয়েও মোহনবাগান। এবার ফ্যান হলাম।
মোট ২৩ বছর তিনি জড়িয়ে ছিলেন মোহনবাগানের সঙ্গে। ৮ বছর বয়সে শুরু। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত, টানা ৮ বছর খেলেছেন জুনিয়র মোহনবাগানে। তারপরে ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৮, টানা ১৫ বছর মোহনবাগানের হয়ে খেলেছেন। ১৯৬৮তেই অবসর নেন ফুটবল থেকে। জীবনে অন্য ক্লাবে যাননি, বাঙাল হয়েও। মোহনবাগানের হয়ে করেছেন ২০০ গোল। চুনী গোস্বামী বলতে মোহনবাগান ছাড়া আর কিছু ভাবা যায়নি, যায় না আর যাবে না কোনওদিন। একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ১৯৬০-১৯৬৪, টানা ৫ বার মোহনবাগান অধিনায়ক ছিলেন। ২৫টি ট্রফি দিয়েছেন মোহনবাগানকে ওই ১৫ বছরে। ৯বার কলকাতা লিগ জিতেছিলেন (১৯৫৪-১৯৫৬, ১৯৫৯, ১৯৬০, ১৯৬২-১৯৬৫)। ১৯৬১র লিগ পেলে টানা ৭বার (১৯৫৯-১৯৬৫) লিগ জেতা হয়ে যেত মোহনবাগানের তখনই। এ নিয়ে আফশোস ছিল তাঁর। ৫ বার করে আইএফএ শিল্ড (১৯৫৪, ১৯৫৬, ১৯৬০-১৯৬২) ও ডুরান্ড কাপ (১৯৫৯, ১৯৬০, ১৯৬৩-১৯৬৫), ৩ বার রোভার্স কাপ (১৯৫৫, ১৯৬৬, ১৯৬৮) ছাড়াও তাঁর খেলার সময়ে মোহনবাগান ১বার জিতেছিল কোচবিহার কাপ (১৯৬২), ট্রেডস কাপ (১৯৬৫) আর অমৃতবাজার শতবার্ষিকী ট্রফি (১৯৬৮)। একজন মানুষের নিঃশ্বাস আর প্রশ্বাসের মতই পরস্পরের পরিপূরক ছিল মোহনবাগান আর চুনী গোস্বামী।
বাংলার হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে (বেশির ভাগটাই ছিলেন অধিনায়ক) ২৫ গোল ছিল চুনী গোস্বামীর। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৪, ২টি এশিয়াড ও ৩টি অলিম্পিকসহ ৪৭টি ম্যাচ খেলেছেন ভারতের হয়ে, করেছেন ১৩টি গোল। তাঁর অধিনায়কত্বেই ভারত ১৯৬২-তে এশিয়াডে সোনা জিতেছিল। ১৯৯১ থেকে ১৯৯২ ছিলেন ভারতীয় ফুটবল দলের ম্যানেজার। তার আগে ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ ছিলেন টাটা ফুটবল অ্যাকাডেমির ডিরেক্টর। ১৯৬৩তে অর্জুন পুরস্কার, ১৯৮৩তে পদ্মশ্রী পুরস্কার আর ২০০৫ সালে মোহনবাগান রত্ন – সবই ছিল ওই ফুটবলের দৌলতে।
ভারতীয় ফুটবলে ত্রিবেণীসঙ্গমের দ্বিতীয় নদীটি আজ রুদ্ধ হয়ে গেল। প্রথম নদীটি রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল ঠিক ৪১ দিন আগে, ২০শে মার্চ ২০২০ তারিখে। বড় একা হয়ে গেলেন আজ তুলসীদাস বলরাম। পিকে-চুনী-বলরাম তিনটি নাম একত্রেই উচ্চারিত হবে ভারতের ফুটবলের শেষ দিন অবধি। কত গর্বে যে তারা গর্বিত করেছিলেন ভারতীয় ফুটবলকে সেই স্বর্ণযুগে, প্রতিটি ভারতীয় ফুটবলপ্রেমী তা জানেন।
শুধু ফুটবল? ওই ১৯৭২ সালেই রঞ্জি ম্যাচ দেখতে গিয়ে "ক্যাপ্টেন"কে দেখে মোহিত হয়েছিলাম। চাকুদা-কে ব্যবহার করাটা দারুণ ছিল। সাথে দুরন্ত ব্যাটিং আর ফিল্ডিং। ১৯৬৭তে ওয়েস্ট ইন্ডিজের গিলক্রিস্টকে ব্যাট করাটা তো এখন প্রায় লোকগাথা। ৪৬টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ১৫৯২ রান, ১টি শতরান আর ৭টি অর্ধশতরান করেছিলেন চুনী গোস্বামী। সর্বোচ্চ রান ছিল ১০৩। উইকেট নিয়েছিলেন ৪৭টি, একবার এক ইনিংসে ৫ উইকেট-সহ। সেরা বোলিং ছিল ৫/৪৭। ক্যাচ নিয়েছিলেন ৪০টি। ১৯৬২-৬৩ থেকে ১৯৭২-৭৩ রঞ্জি ট্রফি খেলেছেন বাংলার হয়ে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা রঞ্জি রানার্স হয়েছিল ১৯৭১-৭২ সালে, ফাইনালে গাভাসকার-অশোক মানকড়-ওয়াদেকার-সোলকার-রমাকান্ত দেশাই-শিভালকার সমৃদ্ধ বম্বের কাছে ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে হেরে গিয়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে মহারাষ্ট্র আর সেমিফাইনালে পাতৌদি-জয়সীমা-আবিদ আলি সমৃদ্ধ হায়দরাবাদকে হারিয়ে দেওয়ার পিছনে অনেকাংশেই সক্রিয় ছিল বাংলা অধিনায়কের প্রখর মস্তিষ্ক। ভারতের খেলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম ও শেষ ব্যক্তি, যিনি দুটি খেলায় একটি রাজ্য দলের প্রতিনিধিত্ব ও অধিনায়কত্ব করেছেন।
তবু, তাঁর মতে, গড়ে ছ’টা দেশ যে খেলাটা নিয়ে লাফালাফি করে, তার চেয়ে ফুটবলের আমেজ অনেক বেশি। ক্রিকেট খেলতে তিনি ভালবাসেন। তবে ফুটবল অন্যরকম ব্যাপার। দু’য়ের মধ্যে তুলনা চলে না। এবং নিজেকে একজন ফুটবলার বলতেই তিনি গর্ববোধ করেন।
এই খেলাটার জন্যই তো একসময় বেজায় তিরস্কৃত হয়েছিলেন বাড়িতে! মধ্যবিত্ত বাবা চিরকালই চেয়েছিলেন, পড়াশোনা নিয়ে থেকে পড়া শেষে ভাল চাকরি করুক ছেলে। খেলা নিয়ে বকাঝকাও করতেন। তবু পালিয়ে পালিয়ে খেলে বেড়াতেন চুনী। মূলত তাঁর মায়ের প্রশ্রয়ে। এশিয়ান গেমসে সোনা জেতার পর অবশ্য বাবা বলেছিলেন— ‘‘চুনী মুখ রেখেছে।"
এছাড়াও লন টেনিসটাও তিনি চমৎকার খেলতেন। সাউথ ক্লাবে তাঁর ডাবলস পার্টনার ছিলেন তাঁর ভাই মানিক গোস্বামী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লুও ছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে কলকাতার শেরিফ হন তিনি। “প্রথম প্রেম” নামের এক বাংলা ছবিতে অভিনয়ও করেছেন তিনি।
অসুস্থতার জন্য ইদানিং কার্যত গৃহবন্দি চুনীদা আজ ৩০শে এপ্রিল ২০২০ তারিখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন মাঠের বাইরে চলে গেলেন, যোধপুর পার্কের একটি প্রাইভেট নার্সিং হোমে, ৮২ বছর বয়সে। বয়সের দাগ কাউকেই ছাড়ে না। ১৯৩৮এর ১৫ই জানুয়ারি জন্মানো চুনীদাকেও ছাড়েনি। তবু চৌত্রিশ বছর বয়সী ওনাকে নিয়েই আমার স্মৃতি দাগহীন থেকে যাবে আরও অনেক, অনেক দিন। অনেক পাওয়া কাপের হিসেব আসে না এর মধ্যে। ভালবাসা হিসেবের হাত ধরেছে নাকি? কোথাও? কখনও? কোনওদিন? মৃত্যুকালে স্ত্রী ও এক পুত্রকে রেখে গেছেন তিনি।
আমাদের আস্ত একটা প্রজন্মকে ফুটবলে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন চুনী গোস্বামীই। অসাধারণ বলপ্লেয়ার চুনী গোস্বামীর ড্রিবলিং রেডিওতে শুনতে শুনতে "দেখতে"ও পেতাম। সেটা ১৯৬৫-৬৬ সাল। আট বছর বয়সের সেই ড্রিবলিংয়ের ছোঁয়াটা আজও এক নিমেষে ভাল করে দেয় যে কোনও মনখারাপ। সেই ড্রিবলিংয়ে নিঃশ্বাস নিতে নিতে উপাসক আমার ময়দানি তীর্থস্থানের ফুটবল ধর্মের চিরকালীন আর চূড়ান্ত ধর্মযাজক আজও ওই একজনই – চুনী গোস্বামী।
চুনী গোস্বামীর মৃত্যু নেই। যতদিন এই ভারতে তথা বিশ্বে ফুটবল থাকবে, চুনীদাও থাকবেন সেখানে।