
শেষ আপডেট: 14 March 2022 09:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মোহনবাগান (mohun bagan) ক্লাব প্রশাসন থেকে নিঃশব্দে সরে গেল টুটু বসু (Tutu Bose) জমানা। এটি নিঃসন্দেহে ময়দানে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
এককালে টুটু-অঞ্জন জুটি বহু ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন। সে ক্লাব প্রশাসন হোক কিংবা দলগঠন, সবেতেই ওই জুটি বাজিমাত করে গিয়েছিল। সেই দুই কর্তার মধ্যে অঞ্জন মিত্রের জীবনাবসান ঘটেছে দু’বছর আগে। এবার টুটু বসুকে সরিয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ময়দানের রাজনীতিতে টুটু বসু মানে এক অধ্যায়। তিনি গত পাঁচ দশক ধরে ময়দানে একটি প্রভাব রেখে গিয়েছেন। একটা সময় কলকাতা ময়দানে মিথ ছিল, লাগে টাকা দেবে গৌরি সেন, সেই গৌরি সেন বলতে টুটুকেই বোঝাত। মোহনবাগানে (Mohun bagan) যখন তুমুল অর্থ সঙ্কট, সেইসময় টুটু বাবুই নিজ উদ্যোগে অর্থ দিয়ে দলগঠন করতেন। এমনকি নামী বিদেশীদের নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্লাবের বাজেট বহির্ভূত অর্থ আসত টুটুর পকেট থেকে।
এইভাবেই একসময় নেওয়া হয়েছে চিমা ওকোরি, যোস ব্যারেটো, এমনকি সোনি নর্ডিকে নেওয়ার ক্ষেত্রেও টুটু বসুর অবদান ছিল। তিনি ছিলেন মোহনবাগানের লুই বার্লুসকোনি।
গতবার যখন মোহনবাগানের (Mohun bagan) প্রশাসনিক কমিটি গঠন হয়, সেইসময় প্রেসিডেন্ট হিসেবে টুটুর নাম রাখা হয়েছিল। কিন্তু এবার অবশ্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে টুটুকে রাখা হবে না। শুধু তাঁকে রাখাই নয়, তাঁর পরিবারকেও সুকৌশলে সবুজ মেরুন ক্লাব প্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে।
এর আগে আচমকা সচিব পদ থেকে অবসর নিয়েছিলেন টুটুর বড় ছেলে সৃঞ্জয় বসু, যাঁকে ময়দান বেশি চেনে টুম্পাই নামে। তিনি কেন অবসর নেন, এই নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। বলা হয়, সৃঞ্জয়কে সরিয়ে দেওয়ার মূলে ক্লাব রাজনীতির জটিল সমীকরণ। তাঁর সঙ্গে দেবাশিস দত্তের দুরত্ব তৈরি হয়। কারণ দেবাশিস গোপনে বিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের জমি শক্ত করেছিলেন।
সৃঞ্জয় বরং ক্লাবের অঙ্ক টের পাননি। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর বাবা যেহেতু ক্লাব প্রশাসনের মহারাজা, তাই তাঁর কোনও সমস্যা হবে না। কিন্তু মোহনবাগানের অন্দরে তৃণমূল নেত্রীর প্রভাব বাড়তেই বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায় আরও সক্রিয় হয়ে যান। বাবুনকে দরাজ সমর্থনের হাত বাড়িয়েছেন নেত্রী। এমনকি ময়দানে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, তৃণমূল নেত্রীর সমর্থন হারিয়েছেন টুম্পাই, এমনকি টুটু বাবুর সঙ্গেও নাকি মুখ্যমন্ত্রীর সেই নিকট সম্পর্ক আর নেই।
যে কারণে বসু পরিবার নিঃশব্দে সরে গিয়েছে মোহনবাগান থেকে। একটা সময় টুটু বাবুর হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিটের বাড়িতে ক্লাবের মহা বৈঠক চলতো। কিন্তু সেটি বহুদিন আগেই অতীত হয়ে গিয়েছে। এখন বরং দেবাশিসের হেস্টিংসের অফিসে ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়ে থাকে। সেখানে একটা সময় টুম্পাইরাও এসে বৈঠক করেছেন।
এবার মোহনবাগানে দেবাশিস-বাবুনের সন্ধিতে সমর্থকদের ক্ষোভের পাহাড়। যার নমুনা পাওয়া গিয়েছে, নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনে। সেদিন রক্তারক্তি কাণ্ডও ঘটেছিল। অন্তর্বতীকালীন সচিব প্রাক্তন ফুটবলার সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের গাড়ি ভাঙচুরও হয়েছিল।
সমর্থকদের অনেকের রাগ গিয়ে পড়ছে দেবাশিসের ওপর। তিনি বর্তমানে অর্থ সচিব পদে রয়েছেন। তাঁকে টুটু বসুরাই তুলে এনে বড় দায়িত্ব দিয়েছিলেন। টুটুই একসময় বলতেন, আমার তিন সন্তান, টুম্পাই, টুপ্লাই ও দেবাশিস। টুপ্লাই মানে সৃঞ্জয়ের ভাই, তাঁকে মোহনবাগানের সহ সভাপতি করা হয়েছিল। কিন্তু টুপ্লাইও বর্তমান কমিটিতে থাকবেন না, তিনি নাকি এবার মনোনয়নই জমা দেননি। নতুন কমিটিতে এবার বাবুনকেই ফুটবল সচিব হিসেবে দেখা যাবে। তিনি বড় পদ নেবেন না, কিন্তু দড়িটা থাকবে তাঁর হাতেই।
ক্লাব প্রশাসনের অনেকেই বলেন, ‘‘দেবাশিস দারুণ বুদ্ধি ধরেন। কোন সময় কাকে ব্যবহার করতে হয়, সেটি বেশ ভাল জানেন বলেই নিমেষে শত্রুকে বন্ধু বানাতে পারেন।’’ না হলে অঞ্জনের ছায়ায় বেড়ে ওঠা দেবাশিস মোহনবাগানের কিং মেকার হতে চলেছেন। তৃণমূলের সমর্থনে বাবুনের ঘুঁটি হিসেবে দেবাশিসই হতে চলেছেন মোহনবাগানের নয়া সচিব। যাঁর ব্যবসার পুরোটাই নির্ভর করে টুটুর কোম্পানির ওপর।
মনে করা হচ্ছে, ক্লাবে নিজ ক্ষমতা দখলের পাশে ব্যবসাতেও নিজ ক্ষমতায় বলিয়ান হওয়ার কারণে তিনিও বসু পরিবারের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজেই হটসিটে বসতে চলেছেন। আর এই বিষয়ে এটিকে-র সমর্থনও তিনি আদায় করে নিয়েছেন।
সোমবার দুপুরে আসল কথা বললেন অবশ্য মোহনবাগানের প্রাক্তন এক নামী তারকা, যিনি আবার ক্লাব প্রশাসনেও রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্তা ফুটবলার বলছিলেন, কালের নিয়মে সবাইকেই সরে যেতে হয়। একটা সময় বলরাম চৌধুরী, কেষ্ট সাহা, বীরু চট্টোপাধ্যায়, শৈল চট্টোপাধ্যায়রাও সরে গিয়েছিলেন। তবে টুটু বসু জমানা কোনওদিনই শেষ হবে না, যতদিন মোহনবাগান থাকবে ততদিনই থাকবেন টুটু বসু। তাঁর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।