
শেষ আপডেট: 4 April 2024 15:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেই কবে মোহনবাগানে পা রেখেছিলেন। ১৯৭৮ সাল হবে, সেইসময় নরেন্দ্র নায়েকের বয়স ছিল ১৪বছর। বাবার হাত ধরে এসেছিলেন। ৪৬ বছর মোহনবাগানে কাটিয়ে যখন ওড়িশার জাজপুরে নিজের দেশে ফিরছেন, তখন নুরিদা-র (পোষাকি নাম নরেন্দ্র নায়েক) চোখ ভরা জল।
গত পয়লা এপ্রিল মোহনবাগানের এই নির্ভরযোগ্য প্রবীণ মালিকে বলে দেওয়া হয়েছে, ‘‘এবার তুমি আসতে পারো।’’ প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি ‘আসতে পারো’ কথাটি কিসের জন্য বলছেন কর্তারা। মানুষের জীবনেও এভাবে এপ্রিল ফুল হতে পারে, এই ৬০ বছরের মালি ভাবতেই পারেননি।
মোহনবাগান ক্লাবে কবে থেকে ৬০ বছরে কর্মজীবন শেষ হয়, সেটি এই অভিজ্ঞ মালিও বুঝতে পারেননি। দীর্ঘ প্রায় পাঁচদশক কাটিয়ে তাঁকে ক্লাব প্রশাসন দিয়েছে মাত্র ৭৫ হাজার টাকা। এই টাকায় তাঁর বাকি জীবন কীভাবে কাটবে, সেটি ভেবেই আকূল নুরিদা।
প্রাক্তন ও বর্তমান ফুটবলারদের কাছে তিনি ছিলেন অস্থায়ী অভিভাবক। মাঠে আসার পর থেকে ফুটবলারদের মানিব্যাগ থেকে শুরু করে সোনার চেন, হাতের সোনার বালা থেকে নানা প্রয়োজনীয় জিনিস তাঁর হাতেই দিতেন ফুটবলাররা। সেই তালিকায় কারা ছিলেন না? সুব্রত ভট্টাচার্য থেকে শিশির ঘোষ, কিংবা মানস-বিদেশ থেকে হালফিলের প্রীতম কোটাল, শুভাশিস বসুদের কাছে তিনি ছিলেন ভরসার শেষ কথা।
মোহনবাগান ক্লাব প্রশাসনে মানস ভট্টাচার্য, সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায়রা থেকেও যেন নেই। নুরিদা-র হয়ে বলার মতো ক্ষমতা তাঁর অর্জন করতে পারলেও নিস্পৃহ হয়ে রয়েছেন। কিন্তু সবুজ মেরুন জনতার কাছে এই মালিরা হৃদয়জুড়ে রয়েছেন। তাঁরা এই মালির পাশে থাকার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে সদস্যদের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করেছেন। বিশেষভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উত্তরের মোহনবাগান থেকে। ওই মেরিনার্স সংস্থা থেকেও বিবৃতি দিয়ে বহু অভিযোগ তোলা হয়েছে।
কেন এই অমানবিক আচরণ করলেন মোহনবাগানের বর্তমান কর্তারা? বৃহস্পতিবার দ্য ওয়াল-কে ক্লাব সচিব দেবাশিস দত্ত জানিয়েছেন, ‘‘এই যে ৭৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে, এটাই অনেক। কারণ এর আগে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে একেকটা মালিকে। আমরা বেশি দিয়েছি।’’
তিনি আরও বলেছেন, ‘‘এর আগে তো কোনও সচিব, সভাপতি ক্লাব কর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি নিয়ম চালু করেনি। আমরা সেই চেষ্টা করছি, যাতে তাঁদেরও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়। আর আমি এসে ক্লাবের মালি থেকে কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য বিমা চালু করেছি।’’
তারপরেও ময়দানে তো বটেই, ক্লাবের অন্দরেও নানা প্রশ্ন উঠছে। সদস্যদের কার্ড রিনিউ হওয়ার পরে স্টাফ বেনিফিটের জন্য যে দুটি টাকা করে বাড়তি নেওয়া হয়, সেই অর্থ তা হলে কোথায় গেল? আরও বলা হচ্ছে, যে মালি দেশ, পরিবার ছেড়ে বছরের পর বছর যে ক্লাবের হয়ে প্রাণপাত করলেন, তিনি কী করে এই কম টাকা পেতে পারেন!
ক্লাবের একাংশ এও বলছে, ৪৬ বছরে ক্লাব যা ট্রফি জিতেছে, সেই ট্রফি থেকে লভ্যাংশ হিসেবে ৫০ টাকা দেওয়া হলেও এই অর্থের চারগুণ হয়, তারপরেও কী করে এত অমানবিক হতে পারল ক্লাব প্রশাসন, সেই প্রশ্নও উঠছে।