
শেষ আপডেট: 3 November 2023 16:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'এই ভারতীয় দলটি ভয়ঙ্কর!', দিন কয়েক আগেই বাংলাদেশের কোচ চণ্ডিকা হাথুরুসিংঘাকে এমন কথা বলতে শোনা গিয়েছিল। তাঁর এই মন্তব্য নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল! ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা কেউই মনে করতে পারলেন না, অতীতে ভারতীয় কোনও দলের জন্য এই উপমা ব্যবহার করা হয়েছে বলে। এমন কথা শোনা যেত ১৯৭০-৮০ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রে।
সেই সময় ক্যারিবিয়ানদের পেস বোলিং ছিল মারাত্মক! অ্যান্ডি রবার্টস, মাইকেল হোল্ডিং, জোয়েল গার্নার, কলিন ক্রফট এবং ম্যালকম মার্শাল--- কে ছিলেন না। তাঁদের বলের গতিতে দিশাহারা লাগত অন্যান্য দলের ব্যাটারদের। পরে অবশ্য অস্ট্রেলিয়া দলের জন্যও এমন কথা শোনা গেছে। কিন্তু ভারতীয় দলের ক্ষেত্রে হাথুরুসিংঘার মন্তব্য খুবই 'বিরল'। কিন্তু ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে ভারতীয় দলকে দেখে মনে হবেই, ঠিকই বলেছেন বাংলাদেশের কোচ!
৭টি ম্যাচে ৭টি জয়! বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ঘটনাও বিরল। ভারতকে এখন অনেকেই 'অশ্বমেধ ঘোড়া' বলছেন। এই দলকে থামানো কঠিন। কেউ ব্যর্থ হলে, অন্যকেউ সেই ব্যর্থতা পূরণ করে দিচ্ছেন ঠিকই। ধরা যাক, ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ম্যাচের কথা। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিরাট কোহলি, শুভমন গিল, শ্রেয়স আইয়াররা ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু রোহিত শর্মা, কেএল রাহুল, সূর্যকুমার যাদব ঠিকই ম্যাচের ভাগ্য তৈরি করে দিয়েছিলেন। আবার শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে রোহিত রান পাননি ঠিকই, কিন্তু বিরাট, শুভমন, শ্রেয়স পূরণ করে দিয়েছেন সেই ফাঁক।
সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে টিম ইন্ডিয়া। অনেকেই বলছেন, এবার সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ভারতের। সেমিফাইনালে একটা ভুল, টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেবে তাদের। অপেক্ষা করতে হবে আবারও চার বছর। ২০১৯ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তাই টানা ম্যাচ জিতে যেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের মধ্যে আত্মতুষ্টি দেখা না দেয় সেটাই দেখতে হবে কোচ রাহুল দ্রাবিড়কে!
বৃহস্পতিবার ভারতের ম্যাচ ছিল 'ক্রিকেট দেবতা' শচীন তেন্ডুলকারের ঘরের মাঠ ওয়াংখেড়েতে। ২০১১ সালে এই মাঠেই বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়েছিলেন শচীন। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার একদিনের বিশ্বকাপ জেতার স্বাদ পেয়েছিল ভারত। সেই মাঠে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ছিল 'শচীন, শচীন...' চিৎকার। বলাই বাহুল্য, এদিন ছিল পুরো শচীনময়।
ম্যাচের মাঝে যতবার জায়ান্ট স্ক্রিনে মাস্টার ব্লাস্টার্সকে দেখা গেছে, ততবারই উন্মুক্ত জনতা চিৎকার করে স্টেডিয়াম ফাটিয়েছে। কিন্তু সেই শচীনই কি কখনও এমন বোলিং আক্রমণের সঙ্গে খেলেছেন? কপিল দেব, মনোজ প্রভাকর, শ্রীনাথ, অনিল কুম্বলে, জাহির খান, আশিস নেহেরার মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে খেলেছেন শচীন, কিন্তু একযোগে এমন আক্রমণ পেয়েছেন কি কখনও, প্রশ্ন থেকেই যায়।
ভারতীয় ক্রিকেট দলে, এখন যা অবস্থা তা বাংলার একটা প্রবাদকে মনে করিয়ে দেয়। 'এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায়...', হ্যাঁ সত্যিই কাকে ছেড়ে, কাকে দেখবেন দর্শকরা তা বুঝে ওঠাই ভার। ভারতীয় ক্রিকেট দলের এখন পেস বিভাগের তিনটি স্তম্ভ। সেই স্তম্ভ ভয় ধরাচ্ছে গোটা বিশ্বকে।
জসপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামি ও মহম্মদ সিরাজ। এই আক্রমণ দেখে প্রাক্তন ভারতীয় স্পিনার হরভজন সিং পর্যন্ত বলতে বাধ্য হচ্ছেন, 'আমি এমন ভারতীয় পেস বোলিং ইউনিট দেখিনি। সবাই ১৪০ কিলোমিটার বেগে বল করছে। গতি, সুইং, সিম--- সবই নিখুঁত। আমরা বলতাম পাকিস্তান পেসার তৈরি করে, এখন বলতে হবে ভারত সেই জায়গা নিয়েছে।'
বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে আক্রমণ শুরুটা করছে বুমরা। তাঁর নিখুঁত বোলিং বিপক্ষের ওপেনারকে বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে। এমন শুরু অনেক দিন ভারতীয় ক্রিকেটে দেখা যায়নি। দোসর হিসেবে অবশ্যই আছেন মহম্মদ সিরাজ। তেমন উইকেট না পেলেও তিনি যে বিশ্বকাপে 'কালো ঘোড়া' তা শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ম্যাচে বুঝিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই এই ম্যাচের আগে বলেছিল, সিরাজকে বসিয়ে রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে খেলানো হোক। রোহিত শর্মা যে সিরাজকে খেলিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেননি, তা প্রমাণ করলেন এই পেসার।
এবার আসা যাক, মহম্মদ শামির কথায়। বিশ্বকাপের প্রথম চারটি ম্যাচ ডাগআউটে বসেই কাটাতে হয়েছে। প্রথম সুযোগ পান নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। প্রথম ম্যাচেই ৫ উইকেট। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চার উইকেট আর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে আবার ৫ উইকেট নেওয়ার নজির গড়লেন বাংলার পেসার। চলতি বিশ্বকাপে ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উইকেট এখন তাঁর নামের পাশেই রয়েছে।
ম্যাচ শেষে রোহিতকেও বলতে হয়, 'ব্যাক-টু-ব্যাক পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে সিমাররা কী করতে সক্ষম, তাঁরা দু'দিকেই বল মুভ করতে পারে।' এটাই এখন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাফল্যের মন্ত্র!