
ভিনেশ ফোগত এবং চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডক্টর দীনেশ পারদিওয়ালা।
শেষ আপডেট: 7 August 2024 19:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ মুহূর্তের এদিক-ওদিকে সোনার দুয়ার থেকে ফিরছেন সোনার মেয়ে ভিনেশ। প্যারিস অলিম্পিক্সে মেয়েদের ফ্রিস্টাইল রেসলিংয়েয়ের ফাইনালে উঠেও ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে গেছেন মাত্র ১০০ গ্রাম ওজন বেশি থাকায়। গোটা দেশে শোকের ছায়া নেমেছে, সেই সঙ্গেই প্রশ্ন উঠেছে, কী করে বেশি হল এই শেষ ১০০ গ্রাম। এত দিন ধরে এত কড়াভাবে ওজন ধরে রেখে ৫০ কেজির ক্যাটেগরিতে খেললেন ভিনেশ, শেষের ফাইনালে এসে কী করে ব্যর্থ হলেন ওজন পরীক্ষায়!
চলতি প্যারিস অলিম্পিক্সে ভিনেশ সব ম্যাচই খেলেছিলেন ৫০ কেজিতে। কিন্তু ফাইনালে নামার আগে দেখা যায়, তাঁর ওজন বেশি হয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রে বিজেন্দর সিংয়ের মতো কিংবদন্তি বক্সার জানিয়েছেন, ওজন এইসব ক্যাটাগরিতে বাড়তেই পারে। তারজন্য সাপোর্ট স্টাফ, কোচ ও চিকিৎসকদের বিষয়টি দেখতে হয়। স্টেজে মেকাপ দিতে গিয়ে ভিনেশকে সারা রাত জেগে ট্রেনিং করতে হয়েছে। তিনি দৌড়েছেন, সাইক্লিং করেছেন। তাঁকে জল পর্যন্ত ভাল করে খেতে দেওয়া হয়নি। সেই কারণে তিনি সকালে অসুস্থ হয়ে গিয়েছেন। তাঁকে ভিলেজের হাসপাতালে ভর্তিও করতে হয়।
ভারতীয় অলিম্পিক্স অ্যাসোসিয়েশনের চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডক্টর দীনেশ পারদিওয়ালা এই ওজন-বিতর্কের উপর আলোকপাত করে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনটি বাউট শেষ করার পরেই ভিনেশের ওজন ক্যাটেগরির বর্ডারের চেয়ে খানিকটা বেশি ছিল। কিন্তু, অনেক চেষ্টা করেও সময়মতো তা নামানো যায়নি। কেন? Sকটি ভিডিও বিবৃতিতে, ডক্টর পারদিওয়ালা এবং ভারতীয় অলিম্পিক্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পিটি ঊষা এই বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ডক্টর পারদিওয়ালা বলেছেন, 'কুস্তিগীররা সাধারণত তাঁদের স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে কম ওজন বিভাগে অংশগ্রহণ করেন। এটাই স্বাভাবিক, কারণ এটা তাদের একটু সুবিধা দেয়। তারা কম শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করার সুযোগ পায়। এখন এরকম ওজন কমিয়ে খেলার সময়ে, সকালে যখন ওজন মাপা হয়, তখন যাতে ওজনটা কমই থাকে, সেই কমানোর প্রক্রিয়ায় খাবার বা জল একেবারে মাপমতো গ্রহণ করাটা খুব জরুরি। এছাড়াও খেলোয়াড়কে ঘামানো হয়, সনা বাথ দেওয়া হয়, ঘাম ঝরানো ব্যায়াম করানো হয়। আবার এইভাবে ওজন কমাতে গিয়ে যদি শরীর দুর্বল হয়ে যায়, শক্তি কমে যায়, তাহলে হিতে বিপরীত।
সবমিলিয়ে এই পদ্ধতি খুব সহজ নয়। তাই বেশিরভাগ রেসলার মাপ করে কম জল খান। ওজন মাপা হয়ে গেলে হাই ক্যালরি খাবার খেয়ে এনার্জি ফেরানোরও চেষ্টা করেন। এই খাবার এবং তার ক্যালরির পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখেন বিশেষজ্ঞ নিউট্রিশনিস্ট। প্রতিটি অ্যাথলিটের জন্য নির্দিষ্ট নিউট্রিশনিস্ট থাকেন। ভিনেশেরও ছিল। সেই মতোই দিনে দেড় কেজি ওজনের সমান খাবার খেতেন তিনি।
আবার কখনও কখনও, প্রতিযোগিতার পরেই ওজন বৃদ্ধির একটি খুব জরুরি কারণ থাকে, জল খাওয়া। ভিনেশের তিনটি বাউট ছিল মঙ্গলবার, যা খেলা খুব সোজা নয়। তাই খেলার পরে ডিহাইড্রেশন এড়াতে কিছু বেশি পরিমাণ জল দিতে হয়েছিল ভিনেশকে। হয়তো ম্যাচের পরে এই ওজন বেড়ে যাওয়া এবং আবার পরের ম্যাচের আগে তা কমিয়ে ফেলা-- এই পদ্ধতিতে ভিনেশ, তাঁর কোচ, তাঁর পুষ্টিবিদ আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন, এক রাতে ওজন কমিয়ে ফেলবেন।
তবে সকালে ওজন মাপার সময় দেখা যায়, তা হয়নি সমস্ত প্রচেষ্টার পরেও। সারা রাত ধরে ঘাম ঝরানো, চুল কাটা, পোশাক ছোট করা, রক্ত বের করে নেওয়া-- সব করার পরেও ভিনেশের ওজন ৫০ কিলোগ্রাম ওজন বিভাগের চেয়ে ১০০ গ্রাম বেশি ছিল এবং তাই তাঁকে 'ডিসকোয়ালিফায়েড' ঘোষণা করা হল।
এমনকি, ভিনেশের ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ করার জন্য, জলের বদলে শরীরে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে কিছু লিকুইড পুশ করা হয়েছিল, ওজন ন্যূনতম রাখতে। এই ওজন কমানোর পদ্ধতি যখন চলছিল, ভিনেশের সমস্ত প্যারামিটার স্বাভাবিক ছিল এবং ভিনেশও পুরো সুস্থ-স্বাভাবিক ছিলেন।'
মঙ্গলবার সারাদিন, সারারাত এই ওজন কমাতে প্রাণপাত পরিশ্রম করেন ভিনেশ। জল প্রায় খানইনি, খাবার তো দূরের কথা। একটানা স্কিপিং, সাইক্লিং, জগিং-এর মতো ঘামঝরানো কার্ডিও এক্সারসাইজ করতে থাকেন। ঝেড়ে ফেলতে থাকেন অতিরিক্ত যেটুকু ওজন আছে সেটুকুও। শেষ মুহূর্তে কেটে ফেলেন চুল। এমনকি শরীর থেকে রক্তও বার করে নেওয়া হয় তাঁর। ফলস্বরূপ, প্রবল ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু এত কষ্ট করেও থেকে গেল শেষ ১০০ গ্রামের কাঁটা। ওইটুকু আর কমেনি ম্যাচের আগে।
জানা যায়, আজ প্রতিযোগিতার আগে সকালবেলায় নিয়মমামাফিক ওজন নেওয়া হয় ভিনেশের। তখন যখনই দেখা যায়, তাঁর ওজন ৫০ কেজির থেকে ১০০ গ্রাম বেশি, তখনই ভিনেশ খানিকটা সময় চেয়ে নেন সেই ওজন ঝরানোর জন্য। কিন্তু তা দেওয়া হয়নি। 'ডিসকোয়ালিফায়েড' হয়ে যান তিনি।