
শেষ আপডেট: 14 June 2018 03:17
সুদেষ্ণা ঔরঙ্গবাদকর [/caption]
সত্তর , আশির দশকে বেড়ে ওঠা শিশুরা সবাই প্রায় রুশদেশের উপকথা , রূপকথা আর লোকগাথার সঙ্গে পরিচিত। তাতে এক ঠাকুমা প্রায়ই বলতেন- " এবার ঘুমোতে যা , রাত পোহালে বুদ্ধি বাড়ে।"
আজ সন্ধ্যে গড়িয়ে যখন রাতের দিকে যাচ্ছে , রেড স্কোয়্যারের আলোর রোশনাইয়ের সঙ্গে গানবাজনার অনুষ্ঠান চলছে তখন রুশী ফুটবলারদের জন্য এই কামনাই করছিলাম কাল জান লড়িয়ে খেলিসরে ভাই !
গ্রীস্মকালের উত্তর গোলার্ধে থাকার দরুন এমনিতেই মস্কোয় রাত হয়ে অনেক দেরিতে। সূর্যোদয় খুবই তাড়াতাড়ি। আর সেন্ট পিটার্সবার্গে তো জুন মাসে সূর্যাস্তই হয়না। বিখ্যাত হোয়াইট নাইট দেখতে সারা বিশ্বের লোক আসে । কিন্তু আজকের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস হয়ে যাবে দিনটি। ২০১৮র বিশ্বকাপ ফুটবল রাশিয়া। সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যম প্রচার করবে টানটান উত্তেজনায় ভরা খেলা !
শেষমুহূর্তের প্রস্তুতি দেখার জন্য হাজির হলাম মস্কোর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু জনপ্ৰিয় আরবাত স্ট্রিটে। প্রচুর অনুসন্ধানকেন্দ্র আর সহৃদয় পুলিশবাহিনী। আমায় বিদেশী দেখে নিজে থেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। নিজের দেশের পতাকা মুড়িয়ে দিয়ে চলেছে সমর্থকের দল । উদ্বোধনে ম্যাচ যেহেতু সৌদি আরব আর রাশিয়ার, তাই এই দুইদলের সমর্থকরাই চোখে পড়লো বেশি। প্রায় ৩ দশক ধরে এদেশে আছি। এত বর্ণ আর ভাষাভাষী মানুষের মেলা এই প্রথম দেখলাম ! তবে কানে এলো সবচয়ে বেশি স্প্যানিশ। অধিকাংশই লাতিন আমেরিকার বাসিন্দা। দোকানে আর রেস্তোরাঁয় লোকের ঢল , মনে পড়ে যাচ্ছিল দেশের দুর্গাপুজোর কথা!
দোকানে সবকিছুই বিক্রি হচ্ছে বিশ্বকাপের সঙ্গে জড়িত। রাশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত মাত্রীয়স্কা পুতুলের এক সারিতে লেনিন , স্তালিন , রোনাল্ডো , মেসি , পুতিন সবাই। রেস্তোরাঁর জনপ্রিয় খাবার অবশ্যই রুশী স্ত্রগনফ , ক্যাভিয়ার আর প্যানকেক , সঙ্গে ভদকার কথা বলাইবাহুল্য ! দেখে ভালো লাগলো রেস্তোরাঁগুলো ফুটবলের জন্য দাম বাড়ায়নি।
এই চার বছরে যেন জাদুকাঠির ছোঁয়ায় বদলে গেল মস্কো শহর। চোখের পলকে তৈরি হলো নতুন মেট্রো ! যানজটের যন্ত্রনায় শহরবাসী যেন না ভোগে তারজন্য প্রচুর ফ্লাইওভার। লুঝনিকির মূল স্টেডিয়াম পৌঁছনোর জন্য বাস পরিষেবা সব তৈরী। শুধু ভোর হওয়ার অপেক্ষা।
এরপর একমাস চলবে ফুটবলের মহাযুদ্ধ। কত নতুন রেকর্ড গড়বে আর ভাঙবে! জয়ের আনন্দশ্রু অথবা পরাজয়ের বিষন্নতার সাক্ষী থাকবে রাশিয়ার ১২ টি স্টেডিয়াম আর অগুনতি সমর্থক। এই একমাস লোকে হিসেব করে চলবেনা। অনেক ইউরো ডলার উড়বে। সে যায় যাক। ফুটবল যে জীবনমরণ সংগ্রাম !
প্রাণের ফুটবল , রাশিয়ার আতিথেয়তা , কৃষ্ণসাগরের তীরে সোচির সৌন্দর্য , সেন্ট পিটার্সবার্গের ধনাঢ্য রাজকীয়তা, বীরত্বের শহর ভোলগোগ্রাদ আরও অনেক শহরের সৌন্দর্য এই সব যেন স্মৃতির মনিকোঠায় বন্দি করে দেশে ফিরে যায় লোকেরা। কলকাতার মানুষদের কাছে অবশ্যই উপরি পাওনা থাকবে রাশিয়ান সার্কাস আর Mausoleum-এ চিরনিদ্রায় শায়িত লেনিন ।