শুভ্র মুখোপাধ্যায়
একবার বাংলার নামী ফুটবলার রহিম নবিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, নবি আপনার পছন্দের পজিশন কী? জবাবে হুগলী পান্ডুয়ার ছেলেটি বলেছিলেন, ‘‘আমার কোনও পছন্দের পজিশন নেই। আমাকে কোচ যে পজিশনে খেলাবেন, আমি সেই পজিশনেই খেলতে পারি। এমনকি ছোটবেলায় পাড়ার মাঠে গোলকিপিংও করেছি, তাই গোলের নিচে দাঁড়াতে বললেও এতটুকু ভাবব না।’’
নবিরও আগে বাংলার প্রাক্তন নামী তারকা সুদীপ চট্টোপাধ্যায় এরকম কার্যকরি ফুটবলার ছিলেন। তিনি যে কোনও কোচের তুরুপের তাস ছিলেন। ম্যাচের আগে বিপক্ষ কোচও সংশয়ে থাকতেন, সুদীপকে কোচ কি পজিশনে খেলাবেন, তাই নিয়ে।
সুদীপের পরে ওই নবি, তিনিও ডিফেন্ডার থেকে মিডফিল্ডার কিংবা নঈমউদ্দিন তাঁকে স্ট্রাইকারেও খেলিয়েছেন ভারতীয় দলে। এরকম ফুটবলার ভারতীয় ফুটবলেও কমছে।
বহুদিন পরে এমনই এক রত্নের খোঁজ মিলেছে যিনি স্ট্রাইকার দিয়ে নিজের জীবন শুরু করেছিলেন। তারপর ক্ষেত্র বিশেষে মিডফিল্ডেও খেলেছেন। কিন্তু চলতি আইএসএলে ওই তরুণই এস সি ইস্টবেঙ্গল দলের ডিফেন্সের বড় ভরসা। ড্যানি ফক্স চোটের কারণে বাইরে চলে যাওয়ায় বিপক্ষের ফল্গু ধারার মতো আক্রমণগুলিকে বছর ২৩-য়ের ওই ছেলেটিই সামলাচ্ছেন। গত ম্যাচে সেই কারণে ম্যাচের সেরাও হন।
কেরলের মালাপুরাম জেলার মহম্মদ ইরশাদই এই মুহূর্তে রবি ফাউলারের ইস্টবেঙ্গল দলে ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে ভরসার নাম। রক্ষণে এই দীর্ঘকায় ডিফেন্ডারের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে দলের ভবিষ্যৎ। প্রথম তিনটি ম্যাচে তেমন সুবিধে করতে পারেননি, কারণ অনভিজ্ঞতা একটা কারণ হতে পারে, তারপর মানিয়ে নেওয়ারও একটা ব্যাপার ছিল।
ক্রমে সেই ভয়-ভীতি কাটিয়ে লাল হলুদ রক্ষণকে মজবুত করেছে ইরশাদের ডিফেন্সিভ গুণ। যে কারণে ব্রিটিশ কোচ রবি ফাউলার পর্যন্ত ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্সে মিডিয়াকে জানিয়েছেন, ‘‘ডিফেন্সে ফক্সের অভাব অনেকটা দূর করেছে ইরশাদ, ওর বল স্ন্যাচিং বেশ ভাল, আগামী দিনের তারকা হতে চলেছে।’’
কেরলের তিরুর স্পোর্টস অ্যাকাডেমির ফসল এই ইরশাদ। তারপর ওই অ্যাকাডেমি থেকে ভিভা কেরালা যুব দলে নাম লেখান। সেইসময়ই নজরে পড়ে সাজি প্রভাকরণের, তিনিই ইরশাদকে নিয়ে যান ডিএসকে শিবাজিয়ান্স ক্লাবে। ন্যাশনাল গেমস ফুটবল খেলে মহারাষ্ট্রের হয়ে। ওই টুর্নামেন্টে কেরলের এই ছেলেটি স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে সকলের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন।
ডিএসকে শিবাজিয়ান্সের হয়ে ইরশাদ আই লিগেও খেলেছিলেন ২০১৬ মরসুমে। শিলং লাজং ম্যাচে প্যাট্রিক ডিপান্ডার পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নেমে খেলার ৮৭ মিনিটে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। গোলটিও দুরন্ত করেছিলেন নেইমারের এই ভক্ত।
ইরশাদ টেলিফোনে মারগাওয়ের হোটেল থেকে বলছিলেন, ‘‘আমি আইএম বিজয়নের খেলা দেখে বড় হয়েছি, আমাদের স্বপ্নের নায়ক ছিলেন জো পল আনচেরিও। তাই ছোটবেলা থেকে স্কুলের হয়ে গোল করব, এটা একটা শখ ছিল। পরে আই লিগ ও ন্যাশনাল গেমসেও গোল করেছি। তবে এখন আমি গোল করার চেয়ে গোল আটকানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েই মাঠে নামি।’’
ইরশাদের খেলার উন্নতির বিকাশ ঘটেছে অবশ্য গোকুলাম কেরালা এফসি-তে আসার পরেই। ওই ক্লাবে এসে তাঁকে খেলানো হয় সেন্টার ব্যাক পজিশনে। তখনই তাঁর পজিশন বদল হতে থাকে। যেহেতু দীর্ঘকায় ও সুঠাম চেহারার, সেই কারণেই কোচেরাও তাঁর মতো ডিফেন্ডারকে বক্সের মধ্যে রাখতে চাইছিলেন।
গোকুলাম কেরালার আগে তিনি একটা মরসুম খেলেছিলেন মিনার্ভা পাঞ্জাবে। ওই ক্লাবে তিনি খেলেছিলেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ড পজিশনে। গোকুলামে এসে দেখলেন রাইটব্যাক পজিশনে সুশান্ত ম্যাথিউ চোট পেয়েছেন, কোচ তাঁকে ওই পজিশনে খেলেত বললেন। সেই শুরু।
কেরলের ওই ক্লাবের হয়ে স্মরণীয় পারফরম্যান্স গতবারের ডুরান্ড কাপে। ওই টুর্নামেন্টে মোহনবাগানের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচে দারুণ পারফরম্যান্স করেছিলেন ইরশাদ। যিনি নিজের জীবন শুরু করেছিলেন সেনা জওয়ান হিসেবে। সেই কাজ ছেড়েই তিনি পাকাপাকিভাবে চলে আসেন ফুটবলে। সেই প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘‘আমার স্বপ্ন দেশের হয়ে ফুটবল খেলা। সেই স্বপ্নের জন্য ছুটে চলেছি। তবে ইস্টবেঙ্গলের মতো বড় ক্লাবের জার্সি পরে খেলছি, এটাও কম পাওনা নয়।’’
জীবনের এই পথচলায় পরিবারকে কৃতিত্ব দেওয়ার পাশে কোচ বিনু জর্জের কথা বিশেষভাবে বলেছেন। ‘‘বিনু জর্জ স্যার না থাকলে আমাকে কেউ চিনতই না। স্যার আমাকে এখনও প্রতিদিন কথা বলে জানিয়ে দেন কোথায় আরও ভাল করতে হবে। স্যার আমার জীবনের পথ প্রদর্শক বলতে পারেন। আমি ওঁর সব কথা মেনে চলি।’’
ভারতীয় দলের শিবিরেও ডাক পেয়েছিলেন। জাতীয় দলের কোচ ইগর তাঁর খেলার প্রশংসাও করেছিলেন। তবে প্রাক্তন জওয়ানের প্রবল ইচ্ছে চলতি আইএসএলের সফল ফুটবলার হওয়া। সেই জন্যই প্রাণপাত পরিশ্রম করে চলেছেন সাহেব কোচের তত্ত্বাবধানে। ভুল করতেই করতেই যে একেকজনের জীবনে কখন সোনা রোদের আগমন ঘটে, তার বড় প্রমাণ ইরশাদ। ভারতীয় ফুটবলের নয়া নক্ষত্রের।