দেবাশিস দত্ত
(মোহনবাগান অর্থ সচিব)
বিশ্বাস করুণ, যেদিন আমরা কল্যাণীতে পাপা দিওয়ারার গোলে আই লিগ ট্রফি জয় নিশ্চিত করলাম, তার আগের রাতে যেমন চেষ্টা করেও আমি দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। গতকাল শনিবারও একই অবস্থা ছিল। শুধু এ পাশ, ও পাশ করে গিয়েছি, ঘুম আসছিল না।
মনের ভেতরে একটা চাপা টেনশন হচ্ছিল। প্রায় আট মাস আগে আই লিগ খেতাব নিশ্চিত করেছি আমরা, আর রবিবার সকালে সেই ট্রফি স্পর্শ করার সুযোগ হল আমাদের। টেনশন ওটা নিয়ে নয়, ওটা তো একটা অমোঘ তৃপ্তি।
আসলে চিন্তা গ্রাস করছিল উৎসব কেমন হবে, সবটা সুসম্পন্নভাবে হবে তো? এটা নিয়েই চিন্তা হচ্ছিল। কারণ সময়টা আমাদের অনুকূলে নয়, করোনা কাল আমাদের ঘরবন্দী জীবনে অভ্যস্ত করে দিয়েছে। ইচ্ছে হলেই আমরা বাইরে যেতে পারি না। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে গল্গ করতে পারি না।
সেই আবহের মধ্যে সদস্য-সমর্থকদের এই আবেগ দেখে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, এটা মোহনবাগানই পারে। একটা সময় উল্টোডাঙা ও শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে যা অবস্থা হয়েছিল, দেখে মনে হবে আবেগের ভিসুভিয়াস ঘটছে। শুধু মাথার সারি, আর সবুজ মেরুন আবির ও ফুটবলার ও কোচদের নামে জয়ধ্বনি চলছিল।
এই আবেগের কারণে যিনি এই পরিস্থিতির মধ্যে গত সাত মাস ঘরের বাইরে পা রাখেননি, সেই আমাদের শ্রদ্ধেয় সভাপতি ৭৪ বছরের টুটুদা (স্বপনসাধন বসু)-ও চলে এসেছেন সল্টলেকের নামী হোটেলে ওই মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে। ঘরে আর বসে থাকতে পারেননি, কারোর মানাও শোনেননি এই দিনটার জন্য।

অনেকেই বলেছেন আমাকে, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে এই উৎসবের কী দরকার ছিল? আমি একটাই কথা বলেছি, আবেগকে রুখবেন কিভাবে? এই যে আগামী সপ্তাহ থেকেই দুর্গাপুজো শুরু হবে, বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব, মানুষ কী রাস্তায় বেরবে না, কলকাতার নামী পুজো প্যান্ডেলে ভিড় হবে না, কেউ কী বলতে পারবেন? আমি তো ফেরার সময় দেখলাম ধর্মতলা নিউ মার্কেটে পুজোর মার্কেটিংয়ের জন্য ভিড়ে ছয়লাপ। আমরা সেগুলি কী বন্ধ করতে পারছি, তা হলে?
এমন কিছু কিছু ঘটনা ঘটবে আমাদের সমাজের বুকে, সেদিন কোনও বেড়াজালই আটকাবে না। কোনও নিয়ম থাকবে না সেদিন। আমি বলছি না যে নিয়ম ভাঙাটাই গৌরবের বিষয়, কিন্তু আপনি পারবেন না সেই বাঁধভাঙা আবেগকে রুখতে। রবিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত যে উৎসবের মিছিল হয়েছে, তাতে মানা যায়নি সামাজিক বিধি। কিন্তু কিছু করারও নেই। সমর্থকদের এই আনন্দের রংয়ের কোনও ভাষা নেই আমার কাছে।
গতবারের এই আই লিগ চ্যাম্পিয়ন করার জন্য আমি ও টুম্পাই (মোহনবাগান সচিব সৃঞ্জয় বসু) সহ ক্লাবের বাকি কর্তারা যে প্রাণপাত পরিশ্রম করেছি, সেটি যে সার্থক, তার জন্য ভাল লাগছে। একটা পুরো টিম তখনই সাফল্য পায়, যখন সবাইয়ের অবদান থাকে কিছু না কিছু, সেটাই হয়েছে গত মরসুমে। একটা ইউনিট হিসেবে আমরা কাজ করেছি, সবাই নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে।
আর হয়তো বড় জোর একমাস পরেই আমরা আইএসএল খেলতে নামব। আই লিগ ট্রফি জয় আমাদের কাছে ইতিহাস হয়ে থাকল। দলের ফুটবলাররা থাকতে পারলে ভাল লাগত, কিন্তু তাদেরও পেশাগত দায়বদ্ধতায় গোয়ায় শিবিরে থাকতে হয়েছে। মনে পড়ছিল খেতাব জয়ী কোচ কিবুর (ভিকুনা) কথা, স্বাভাবিকভাবেই মনে এসেছে বেইতিয়া, ফ্রান মোরান্তে, গঞ্জালেজ, পাপাসহ বাকি আমাদের ঘরের ছেলেদের কথাও। ওরা মাঠে ওই লড়াই না দেখালে এই দিনটাই আসত না। ওদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। ভিকুনা মানুষ হিসেবেও দারুণ ছিলেন।
এবার একেবারে অন্য লড়াই, আরও কঠিন পথ। এটিকে-মোহনবাগান দলের কোচ আন্তোনিও হাবাস, তাঁর পরামর্শেই আমরা দলগঠন করেছি। যারা স্থানীয় ছিল তাদের অনেকেই এ দলে রয়েছে, নতুনরা এসে আবারও প্রমাণ করবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব। সবসময় মনে রাখতে হবে, মোহনবাগান একটা প্রতিষ্ঠান, সেই ক্লাবে ফুটবলাররা ভাল খেলে নিজেদের প্র্মাণ করলে তারাও সুপারস্টার হয়।