
কার্লো আন্সেলোত্তি
শেষ আপডেট: 29 April 2025 08:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লা লিগায় (La Liga) পোল পজিশনে বার্সেলোনা (Barcelona)। পাঁচ ম্যাচ বাকি। চার পয়েন্ট পিছিয়ে দু'নম্বরে কড়া টক্কর দিচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ (Real Madrid)। পট পরিবর্তনের সমূহ সম্ভাবনা। একটা-দুটো ম্যাচের ফল এদিক-ওদিক হলেই শীর্ষে জায়গা করে নিতে পারেন ভিনিসিয়াস জুনিয়ররা।
এই অবস্থায় ম্যানেজার বদলের জিগির তোলাটা বোকামি নয়, আত্মঘাতীও বটে। তবু ক্লাবের নাম যখন রিয়াল মাদ্রিদ, তখন সবই সম্ভব! ক্যাবিনেটে যখন ছত্রিশখানা লিগ খেতাব, সেই অবস্থায় অল্পেতে তুষ্ট হওয়াটা রিয়ালের ধাতে নেই। তাই চলমান মরশুমেই কোচ পরিবর্তনের ধুয়ো উঠেছে ‘লস ব্ল্যাঙ্কোসে’র অন্দরমহলে!
অথচ গত বছরই দলকে চ্যাম্পিয়নস লিগ, লা লিগা—দুই-ই জিতয়েছেন ইত্যবসরে জাঁতাকলে পড়া ম্যানেজার কার্লো অ্যান্সেলোত্তি। তিন বছর আগে প্রায় চুপিসারেই, বিশ্ব ফুটবলে ঝলমলে রেকর্ড গড়ে ফেলেন এই ষাটোর্ধ ভদ্রলোক। বার্নেবেউ স্টেডিয়ামে এস্প্যানিওল-কে চার গোলে পর্যুদস্ত করে লা লিগা ট্রফি ঘরে এনেছিল রিয়াল। জিতেছিল ৩৫ নম্বর লিগ খেতাব।
কিন্তু এতকিছুর পরেও বরাবরের মতো আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় দলের মাস্টারমাইন্ড অ্যান্সেলোত্তির কৃতিত্ব। ২০২২-এ রিয়ালের হয়ে লিগ জেতার সুবাদে তিনিই হন ইউরোপের একমাত্র ম্যানেজার যিনি পাঁচটি প্রধান দেশের পাঁচখানা ঘরোয়া লিগ সংশ্লিষ্ট ক্লাব ক্যাবিনেটে উপহার দিয়েছেন। আর কোনো ম্যানেজার কোনোদিন এই সাফল্য পাননি। না পেপ গোয়ার্দিওলা, না জোসে মোরিনহো, না ভিনসেন্ট দেল বস্কি, না জিওভানি ত্রাপাত্তোনি—কোনো তাবড় ফুটবল ম্যানেজারই ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইতালি, স্পেন আর জার্মানি—পাঁচটি 'এলিট' দেশের ক্লাব কম্পিটিশন এভাবে দাপটের সঙ্গে শাসন করতে পারেননি!
শুনতে অবাক লাগতে পারে। কিন্তু এতকিছুর পরেও ফুটবল মহলে প্রশ্ন উঠছে: কার্লো অ্যান্সেলোত্তি কি কাব্যে উপেক্ষিত? হয়তো তাই। নইলে ট্যাবলয়েটের রংচঙে পাতা, ফুটবলারদের বিস্ফোরক জবানবন্দি কিংবা আর পাঁচজন ম্যানেজারের বিতর্কিত আত্মজীবনী—কোনও পরিসরেই যে কার্লোর যথোচিত বন্দনা নজরে আসে না কেন?
ফুটবল-বিশ্ব একেবারেই চুপ থেকেছে, এমন নয়। আন্দ্র পির্লো, যাঁকে বলতে গেলে মিডফিল্ডার হিসেবে নতুন পরিচিতি দেন অ্যান্সেলোত্তি, বরাবরই জানিয়েছেন দেশোয়ালি ম্যানেজারকে কী ভয়ানকভাবে শ্রদ্ধা করেন তিনি। মালদিনি, ইব্রাহিমোবিচেরাও ইতিউতি টুকটাক প্রশংসা জানিয়েছেন বটে। কিন্তু সার্বিকভাবে ইউরোপের ফুটবল মহল কার্লোকে উপযুক্ত সম্মান দেয়নি বলেই মনে হয়।
এর অন্যতম কারণ হতে পারে তাঁর নিরুপদ্রব চলন, নিপাট বলন। ঠাটবাটে একেবারেই রংদার নন। টাচলাইনে দাঁড়িয়ে পেপ কিংবা ক্লপের মতো হাত-পা ছুড়ে প্লেয়ারদের নির্দেশ দেন না। টিম শেষ মুহূর্তে গোল দিলে অ্যালেক্স ফার্গুসনের মতো তাঁকে শিশুসুলভ উল্লাসে ফেটে পড়তে দেখা যায় না। প্রেস কনফারেন্সেও একই ছবি। রিপোর্টারদের চাঁচাছোলা প্রশ্নের পরিমিত উত্তর দিতেই পছন্দ করেন কার্লো। কখনও কোনো ক্লাবের বিরুদ্ধে সেভাবে তোপ দাগেননি। মাঠে নামার আগে প্রতিপক্ষ ম্যানেজারের বিরুদ্ধে উল্টোপাল্টা বকে 'মাইন্ড গেম' খেলাও কার্লোর না-পসন্দ। ন্যায্য কিংবা অন্যায্যভাবে হেরে গিয়ে জোসে মোরিনহোর মতো শ্লেষাত্মক সুরে রেফারির নামে বিষোদ্গার করতেও শোনা যায় না তাঁকে।
বদলে নিজেকে বরাবরই পর্দার আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন। ডাগ আউটে দাঁড়িয়ে ঢাউস কোটের পকেটে হাত গুঁজে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নিয়ে পর্যবেক্ষণ চালান। নীরবে, নিশ্চুপে। খেলোয়াড়দের ভুলচুক দেখলে চুইংগাম চিবোতে চিবোতে ভুঁরু তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন খানিকক্ষণ। তারপর খেলোয়াড় পরিবর্তনের নির্দেশ দেন নিস্পৃহ ভঙ্গিমায়। সমস্ত বিষয় পরিচালনায় কোনো বর্ণময় রক আর্টিস্ট নন; বরং এক স্থিতধী, প্রাজ্ঞ অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টরের প্রতিমূর্তি ভেসে উঠতে বাধ্য। আর এটা তো সহজ সত্যি—যত গভীর সংগীত পিপাসুই হন না কেন, জিম মরিসন, ফ্রেডি মার্কারির নাম যেভাবে আপনার স্মৃতিতে ভেসে উঠবে, তত সাবলীলভাবে অস্ট্রিয়ান কন্ডাক্টর কার্লোস ক্লাইবারকে আপনি মনে করতে পারবেন না। ডন কার্লো বার দুয়েক 'কেরিয়ার স্ল্যাম' জিতলেও তিনি হয়তো শেষতক ইউরোপের ময়দানে উপেক্ষিতই রয়ে যাবেন। তারপর সাহেবদের দেশে তাঁকে দেওয়া হবে 'মোস্ট আন্ডাররেটেড ম্যানেজারে'র তকমা।
কী করে ভোলা যায় সোনালি জমানার এসি মিলান টিম! কাকা, মালদিনি, শেভচেঙ্কো, নেস্তা, সিডর্ফ, পির্লো, কাফু— মাঠের আগাগোড়াই যে সোনায় মোড়া। কাকে ছেড়ে কার দিকে চোখ ফেরাই! ৪-৩-১-২ ফর্মেশনে মালদিনির নেতৃত্বে জমাট, প্রায় নিশ্ছিদ্র রক্ষণের দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই৷ এ লড়াই সাবেক ইতালির ক্যাতানেচ্চিও ঘরানার নয়৷ বরং, অনেক বেশি নমনীয়। যেখানে দুই ফুলব্যাক— কাফু আর মালদিনিকে সুযোগ বুঝে ওভারল্যাপ করতে দেখা যায়। ডিফেন্সের ঠিক সামনে পালকের মতো স্বচ্ছন্দগতিতে ভেসে বেড়ান আন্দ্র পির্লো। কখনও লং রেঞ্জ, কখনো-বা ওয়ান-টু পাসে অতর্কিতে হানা দেন বিপক্ষের বক্সে। পির্লো পজিশন ছেড়ে বেরোলে জায়গা ভরাটে এগিয়ে আসে গাটুসো, অ্যাব্রোসিনির স্ক্রিনিং। ময়দানি লব্জে 'ডবল পিভট'। অফেন্সিভ বক্সে তখন তারকার মেলা। কখনও কাকা, শেভচেঙ্কো, সিডর্ফ— কখনো-বা কাকা, ক্রেস্পো, পির্লোদের সুচতুর তালমিলে অপজিশন রক্ষণের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়!
ফুটবল অনুরাগীদের স্মৃতিতে এখনও সজীব চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে লিভারপুলের বিরুদ্ধে কাকার ডিসেন্স-চেরা পাস আর ক্রেস্পো-র অনবদ্য ফিনিশিং! কিংবা ওল্ড ট্রাফোর্ডে কাকার পায়ে সাম্বার ভেলকি! একা হাতে খান তিনেক ডিফেন্ডারকে নাস্তানাবুদ করে অবিস্মরণীয় সোলো গোল—অল টাইম ক্লাসিক! মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে তুলে অ্যান্সিলোত্তির নীচু তারে বাঁধা উচ্ছ্বাস প্রদর্শন সেই ক্লাসিকত্বে বাড়তি রঙ জোগায়নি ঠিকই। পর্দার আড়ালে আগের মতোই নিস্প্রভ থেকেছেন তিনি। কিন্তু ওই উদ্ধতমুষ্টি আর ঠোঁটের গোড়ায় একচিলতে 'আইকনিক' হাসি বনেদি ইতালীয় গরিমার সঙ্গে কোথাও যেন মিলেমিশে গেছে।
হয়তো এই আড়ালটুকু ভবিতব্য নয়। বরং নিখাদ, সহজাত। মার্সেলো লিপ্পি, আরিগো সাচ্চির উত্তরসূরীর ফুটবল-দর্শন আলাদা হতে পারে। কিন্তু ঘরানার ছোঁয়া, দেশের জলহাওয়ার স্পর্শ একেবারেই গায়ে লাগবে না—তা কী করে সম্ভব! ডন কার্লো তিনি। ভিটো কর্লিয়নির মতো তিনিও মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ।