সুব্রত ভট্টাচার্য
রবীন্দ্রসদনে সুব্রতদা-কে এইভাবে দেখতে যেতে হবে কোনওদিন ভাবিনি। সামনে যেতেই কষ্ট হচ্ছিল। এত প্রাণোচ্ছল মানুষ ছিলেন, ফুটবলারদের কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। এতবড় হেভিওয়েট নেতা কোনওদিন বুঝতে দেননি।
আমি একবার বজবজে ওঁর সারেঙ্গাবাদের বাড়িতেও গিয়েছিলাম। সারেঙ্গাবাদ হাইস্কুলের সামনেই বাড়ি ছিল সুব্রতদাদের। প্রতি শনিবার রাতে কলকাতা থেকে গাড়ি করে চলে যেতেন বজবজের বাড়িতে। রবিবার সারাদিন থেকে ওখান থেকে সোমবার সকালে সরাসরি কলকাতার অফিসে পৌঁছে যেতেন। একবার আমাকে বাটা মোড়ে গাড়ি থামিয়ে একটা দোকানে চা খাইয়েছিলেন। বন্ধুর মতো মিশতেন।
আমি যেবার ১৯৭৪ সালে মোহনবাগানে সই করি, সেইসময় আমাকে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ই সই করিয়েছিলেন। সেইসময় তিনি নামী যুব নেতা। সব থেকে বড় কথা ওই ব্যস্ততার পরেও উনি মাঠে আসতেন, ফুটবলারদের খোঁজ রাখতেন।
তাৎপর্য্যের বিষয়, ফুটবলার রিক্রুটের বিষয়েও সুব্রতদা নাম করেছিলেন। তিনি সমানভাবে চোখ চোখে রেখে লড়েছিলেন ইস্টবেঙ্গলের জীবন-পল্টুর বিপক্ষে। ১৯৮০-৮১ মরসুমে আমাকে বড় অর্থের টোপ দিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। আমাকে সুব্রতদা বলে দিয়েছিলেন, আমার সঙ্গে কথা না বলে কোনও সিদ্ধান্ত নিও না। কথার মধ্যে একটা দাপট ছিল।
যতদূর মনে পড়ছে, কৃশানু-বিকাশকে মোহনবাগানে আনার ক্ষেত্রেও ওঁর অবদান ছিল। মান্নাদা (শৈলেন মান্না) ওঁকে খুব বিশ্বাস করতেন, স্নেহ করতেন। নামী রাজনীতিবিদ হয়েও কোনওদিন মাঠে তার প্রভাব খাটাননি, এটাই বড় কথা।
আমাকে বাবলু বলে ডাকতেন, নব্বই দশকেও মাঠে এসে ফুটবলারদের উদীপ্ত করতেন। মোহনবাগান অন্তপ্রাণ মানুষ ছিলেন। আমাদের সঙ্গে বার তিনেক বাইরের রাজ্যেও গিয়েছিলেন দলকে নিয়ে। রোভার্স কাপেও গিয়েছেন খেলা দেখতে।
এটিকে-মোহনবাগান চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার জন্য একদিন আমাকে ফোন করে আমার মত নিয়েছিলেন। এটা আমার কাছে বাড়তি গর্বের বিষয় ছিল। আমি বলেছিলাম, অর্থের জন্য ক্লাব চালানোর জন্য কারোর সঙ্গে হাত ধরা ভুলের কিছু নয়, উনিও দেখলাম পরে মিডিয়াকেও একই কথা বলেছিলেন। তার মানে আমার কথাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
ওঁর মতো রাজনীতিবিদের চলে যাওয়া আমাদের কারোর কাছেই ভাল নয়। উনি ছিলেন অভিভাবকের মতো, কত দরকারে কথা বলেছি, উনি সমাধান করে দিয়েছেন। বলতেন, বাবলু আমার প্রিয় ফুটবলার, ওঁর লড়াইয়ে আমি অনুপ্রাণিত হই। এইসব মানুষগুলোর জন্যই তো মোহনবাগান ছাড়া কিছু ভাবিনি, খেলে গিয়েছি কম পয়সা নিয়েও।
তাই রবীন্দ্রসদনে সুব্রতদা-কে দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। স্মৃতি যেমন সুখের, তেমনি বেদনারও।
(সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুলিখন)