
মেসির কোলে ইয়ামাল
শেষ আপডেট: 22 January 2025 16:25
দ্য ওয়াল ব্যরো: মাতারো। স্পেনের কাতালোনিয়ার শহর। নিরুপদ্রব, নিরিবিলি। পাশেই ছোট্ট শহরতলি রোকা ফোন্ডা। সেবার বসন্তে শহরের আনাচ-কানাচ সেজে উঠেছে। ঘরে ঘরে ‘লা কাস্টানাডা'র তোড়জোড়। ‘লা কাস্টানাডা’… ছেড়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মৃতিতে আয়োজিত পরব।
সেই উৎসবের দিনে ইউনিসেফের একটি দল রোকা ফোন্ডা ঘুরতে আসে। ঘোষণা করা হয়: একটি বিশেষ চ্যারিটির কথা মাথায় রেখে ফোটো ক্যালান্ডার প্রকাশ করতে চায় তারা। যেখানে কোনও ছোট্ট শিশু ও তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ছবি তুলবেন বার্সেলোনার তারকা ফুটবলাররা। এর জন্য লটারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাঁরা ইচ্ছুক, তাঁরা যেন অবশ্যই যোগ দেন।
কথাটা আরও অনেকের মতো শীলা ইবানার কানে গেছিল। ঘরের কাজ সামলে-সুমলে তিনিও নিয়ে আসেন লটারির টিকিট। আর তার কিছুদিন বাদেই ফোন। ইউনিসেফ থেকে। জানানো হয়—শীলা মনোনীত হয়েছেন। কোলের ছেলে লামিনকে নিয়ে তিনি যেন অবশ্যই বার্সেলোনার সদর দফতরে চলে আসেন। ‘ন্যু ক্যাম্পে’র লকার রুমে ফোটোসেশনের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে সপুত্রক তাঁর সঙ্গে ছবি তুলবেন যিনি, তিনি আর কেউ নন, লিওনেল মেসি!
ফোনটা পাওয়ার পর নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না শীলা। কেউ মজা করছে না তো? ইচ্ছে করে মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছে না তো কেউ? ধন্দ ঘোচে দিনকয়েক বাদে। যখন পিওন এসে ইউনিসেফের লোগো-মার্কা একটি খাম তাঁর হাতে দিয়ে যায়।
এরপরের ঘটনাগুলো ঘটে চলে খুব দ্রুত। নির্ধারিত দিনে বার্সেলোনার স্টেডিয়ামে পৌঁছে যান শীলা। সইসাবুদ সেরে কোলের ছেলেকে নিয়ে সটান ঢুকে পড়েন খেলোয়াড়দের লকার রুমে। ঐতিহাসিক ন্যু ক্যাম্পের লকার রুমে। যেখানে পা রেখেছেন জোহান ক্রুয়েফ থেকে রোনাল্ডিনহো। আন্দ্রে ইনিয়েস্তা থেকে রোনাল্ড কোমান। ড্যাবডেবে চোখে সুসজ্জিত ট্রফি ক্যাবিনেট, আলো ঝলমলে মিউজিয়াম ঘুরে দেখিছিলেন তিনি, এমন সময় খবর আসে, লকার রুমে ব্যবস্থাপাতি সেরে ফেলা হয়েছে। ফোটোসেশন শুরু হবে। যার থিম: একরত্তি ইয়ামাল বাথটবে হাত-পা বসে নাড়ছে। ঠিক তখনই তাকে স্নান করানোর অছিলায় খুনসুটিতে মেতে উঠবেন লিওনেল মেসি। পাশে দাঁড়িয়ে শীলা। তবে তাঁকে অনেকটা নেপথ্যচারিণীর ভূমিকা নিতে হবে। তিনি শুধু ছেলেকে চোখে চোখে রাখবেন। স্নান শেষ গা-হাত-পা মুছে ইয়ামালকে কোলে করে আদরও করবেন মেসি। আর এই গোটা পর্বের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করবেন ফোটোগ্রাফার জোন মনফর্ট।
সেদিনের বাকি ঘটনাটুকু এখনও মনফর্টের স্পষ্ট মনে আছে। ‘ডিয়ারিও স্পোর্টসে’র ফ্রিলান্সার হিসেবে তখন কাজ করতেন তিনি। মনফর্ট জানান, আর পাঁচটা অ্যাসাইনমেন্টের চাইতে সেদিনের ফোটোশুট অনেক বেশি ‘চ্যালেঞ্জিং’ ছিল। তার অন্যতম কারণ নাজুক মেসির লাজুকতা! ২০০৭ সালে লিওনেল মেসি সবে ‘লা মাসিয়া’ (বার্সেলোনার অ্যাকাডেমি) থেকে সিনিয়র টিমে জায়গা করে নিয়েছেন। ‘প্রতিশ্রুতিমান’ তকমাটা গায়ে এঁটে আছে; ‘কিংবদন্তি’ আখ্যা তখনও মেলেনি। ফলে স্বভাবভীরুতার খোলস ছেড়ে মেসি কিছুতেই বেরোতে পারছিলেন না। প্ল্যাস্টিকের বাথটবে বসে থাকা অচেনা, অজানা শিশু। পাশে দাঁড়িয়ে তার মা। এই অবস্থায় বাচ্চাটাকে স্নান করাতে হবে, গা মুছিয়ে দিতে হবে, নিতে হবে কোলে আর এই সবকিছুই সেরে ফেলতে হবে হাসিমুখে—গোটা পরিকল্পনাটাই তাঁর কাছে গুবলেট গোছের ঠেকছিল।
এই অবস্থায় ফোটো তোলা, শুধু তোলা নয়… ছবিতে অভিব্যক্ত মানুষ ও মুহূর্তকে জীবন্ত, প্রাণময় করে তোলাটা যে কী কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে, সেটা বিলক্ষণ আন্দাজ করতে পেরেছিলেন মনফর্ট। সতেরো বছর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মেসি এমনিতেই লাজুক, বড্ড মুখচোরা। তা ছাড়া তখন ওর ২০ বছর বয়স। লামিনকে কী করে কোলে তুলতে হবে, সেটাই ভেবে পাচ্ছিল না ও।’ কিন্তু অভিজ্ঞ স্পোর্টস ফোটোগ্রাফার মনফর্ট জানতেন, খেলোয়াড়দের মনস্তত্ত্ব। কীভাবে মুখ করে কিংবা ঘুরে দাঁড়াতে বললে তরুণ ফুটবলার ধাতস্থ হতে পারবেন, জড়তার বল্মীকস্তূপ ভেঙে বেরিয়ে আসবেন ভেতরকার স্বচ্ছ মানুষটি, চরম ভীরু খেলোয়াড়টিও মেতে উঠবেন দিলখোলা হাসিতে—এসবের করণ-কৌশল সবই মনফর্টের আয়ত্তে ছিল। তাই হাল্কা কসরতের পরেই মেসিকে ইয়ামালের সঙ্গে নিবিড়ভাবে বেঁধে ফেলেন তিনি। সেরা খেলোয়াড়ের ভেতর থেকে ছেঁকে নেন তার শৈশব। এরই ফসল সেদিনের একগুচ্ছ ছবি—যা মেসির ড্রিবলিংয়ের মতো উচ্ছ্বল, তাঁর ‘ফার্স্ট টাচে’র মতো নান্দনিক।
আজ থেকে ১৮ বছর আগে শাটারে ক্লিক করেছিলেন মনফর্ট। কিন্তু বাহারি এই চিত্রমালা লোকের ‘নজরে’ আসে গত বছর। যখন স্পেনের হয়ে ইউরোর মঞ্চ দাপিয়ে বেড়ান এক উঠতি ফুটবলার… লামিন ইয়ামাল। ইয়ামালের জীবনের আঁতিপাঁতি খুঁজতে গিয়ে, তাঁর প্রতিভার সুলুকসন্ধান করতে বসে সাংবাদিকরা আবিষ্কার করেন এই অদ্ভুত ‘মেসি-যোগ’! যা দীর্ঘ ১৭ বছর কারও নজরে পড়েনি। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেমি-ফাইনালে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে করা দূরপাল্লার শট যখন বাঁক খেয়ে পোস্টের ইনসাইডে ধাক্কা মেরে জালে জড়িয়ে গেল তখনই… ঠিক তক্ষুনি যেন সম্বিৎ ফিরল সকলের। আর ম্যাচের পরদিন সকালে খবরের কাগজ হাতে পটলডাঙার রোয়াকে বসে সবজান্তা সিধুজ্যাঠা গোছের কেউ বাঁকা হাসি হেসে বলে উঠল, ‘এই সেদিনই তোকে বলেছিলাম না, নিশ্চয় মেসিই…’