২০২২ সালের ইউএস ওপেনে প্রথমবার খেতাব জেতার সময় প্রথম সপ্তাহে তিনি নিখুঁত ছিলেন। তার পর থেকে সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। এ বছর একই কায়দায় ফের একবার কোনও সেট না হারিয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢুকলেন। সূচনা এক হলেও সমাপ্তির ছবিটা বদলাবে কি?

কার্লোস আলকারাজ
শেষ আপডেট: 31 August 2025 13:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: টেনিসের শট দিয়ে নয়, আলোচনার শুরুটা হয়েছিল হেয়ারকাট নিয়ে!
ডেভিড বেকহ্যামের স্টাইল মনে করিয়ে দেওয়া বাজ কাট। হাসিখুশি মুখে কার্লোস আলকারাজ (Carlos Alcaraz) যখন ইউএস ওপেন (US Open)-এর মঞ্চে নামলেন, তখনই বোঝা যাচ্ছিল, ফ্লাশিং মেডোয় এবার তিনি অন্য মুডে! কেতাদুরস্ত ক্যারিশমা ভেতরে ভেতরে যেন আত্মবিশ্বাসের বারুদ হিসেবে জমা হচ্ছে!
এরই নিট ফল: প্রথম তিন ম্যাচে টানা নয় সেট জিতে ফেলা। খুইয়েছেন মাত্র ২১ গেম। প্রতিপক্ষ সার্ভ ভেঙেছে মাত্র একবার। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে: ইউএস ওপেনের দ্বিতীয় সপ্তাহে কার্লোস আলকারাজ কতটা অপ্রতিরোধ্য! উইম্বলডনের হতাশা ভুলে বিজিত নয়, বিজয়ীর ট্রফি হাতে তুলতে তিনি কতখানি মরিয়া!
গত দু’বছরে তাঁর শরীরী ভাষায় একটা প্রবণতা চোখে পড়ছিল: মরশুমের অন্তিম লগ্নে শরীর যেন দম ছেড়ে দিচ্ছে! কখনও চোট, কখনও ক্লান্তি, কখনও মানসিক অবসাদ—এই সবকিছু মিলিয়ে আলকারাজ হঠাৎই যখন-তখন জেতা ম্যাচ হাতছাড়া করতেন। গত বছর অলিম্পিক ফাইনাল খেলে সরাসরি নিউ ইয়র্কে এসে দ্বিতীয় রাউন্ডে হেরে যান। সেই ভাঙনই বড় প্রশ্ন তুলেছিল—টুর্নামেন্ট যত এগোয়, তাঁর পারফরম্যান্স গ্রাফ কি তত নিচে নামতে থাকে?
এবারের ছবি কিন্তু পুরোপুরি আলাদা। বছরের প্রথমার্ধে তিনি ইউরোপ শাসন করেছেন। ফরাসি ওপেন আর উইম্বলডন ভাগ করে নিয়েছেন ইয়ানিক সিনারের (Jannik Sinner) সঙ্গে। হার্ডকোর্টে সিনারের রেকর্ড বেশি জমকালো হওয়ায় অনেকেই তাঁকেই ফেভারিট ধরছিলেন। কারণ একটাই—আলকারাজ মাঝেমধ্যে নিচু র্যাঙ্কিংয়ের খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ছন্দ হারান। কাগজে-কলমে সহজ ম্যাচেও অকারণে দীর্ঘায়িত লড়াই! মরশুম শেষের দিকে শরীর সায় না দিলেই বিভ্রান্তি আর বিচ্যুতি স্পষ্ট হয়ে উঠত।
কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের কলকব্জায় বদল এনেছেন স্পেনীয় টেনিস তারকা। আলকারাজের টেকনিক্যাল আপগ্রেডেশন অনেকটাই নিঃশব্দে ঘটেছে। কোচিং টিমের সঙ্গে বসে সার্ভের অ্যাকশন নতুনভাবে সাজিয়েছেন। আগের মতো নিছক শক্তি নয়, বরং গতি ও নিয়ন্ত্রণের মিশেল লক্ষ করা যাচ্ছে। ফল? সার্ভিস গেমে আত্মবিশ্বাস।
ব্যাকহ্যান্ডেও এসেছে পরিবর্তন। দ্রুত কোর্টে বল ধরছেন, র্যাকেট নামাচ্ছেন উঁচু জায়গা থেকে আর শটকে করছেন ফ্ল্যাট। ফলে দ্রুততা ও আক্রমণাত্মক চরিত্র দুটোই খেলায় মিশেছে।
কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আসল উন্নতি মানসিকতায়। আলকারাজ এখন অনেক বেশি নির্মম! ‘সহজ ম্যাচ, তাই ফুরসত’—এমন আত্মতুষ্টি উবে গেছে। ইদানীং, প্রতিটি ম্যাচে সমান মনোযোগ, একই ধাঁচের প্রস্তুতির ছাপ স্পষ্ট।
ইউএস ওপেনের প্রথম রাউন্ডেই লম্বা সার্ভিসের মালিক রেইলি ওপেলকার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অতীতে এমন ম্যাচেই বিপদে পড়তেন। এবার কিন্তু ধৈর্য ধরে সার্ভ ব্রেক করে তিন সেটে জয়। এবং ‘সহজ জয়’! দ্বিতীয় রাউন্ডে মাত্তিয়া বেলুচির বিরুদ্ধে ৩২টি উইনার, সার্ভ রিটার্নে লক্ষণীয় দাপট। তৃতীয় রাউন্ডে লুসিয়ানো দারদেরির বিরুদ্ধে জেতেন ৬-২, ৬-৪, ৬-০ ফলে। মাঝপথে বাঁ-হাঁটুতে ব্যথা পান, সার্ভ ভাঙেনও একবার। এই জায়গাতেই আগে খেই হারাতেন।
এবার ছবিটা উলটে গিয়েছে। আট গেমের মধ্যে সাতটি জিতে ম্যাচ পকেটে পুরেছেন কার্যত হাসতে হাসতে। এটাই আলকারাজের নতুন ভার্সন! ব্যথা, শারীরিক সমস্যা, চাপ—সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে খেলাটা শেষ পর্যন্ত নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার মন্ত্র তিনি শিখে ফেলেছেন।
চতুর্থ রাউন্ডে প্রতিপক্ষ ফরাসি আর্থার রিন্ডারকনেশ (Arthur Rinderknech)। নামের পাশে তেমন আলো নেই। কিন্তু আলকারাজের কাছে এখন একটাই ফর্মুলা: প্রতিটি ম্যাচ যে কোনও মূল্যে ছোট রাখতে হবে, মিনিট বাঁচাতে হবে, শরীর আর ফিটনেসে সতেজ হতে হবে। কারণ, সামনে অপেক্ষা করছেন নোভাক জোকোভিচ (Novak Djokovic) ও সিনারের মতো কড়া-কঠিন প্রতিপক্ষ!
২০২২ সালের ইউএস ওপেনে প্রথমবার খেতাব জেতার সময় প্রথম সপ্তাহে তিনি নিখুঁত ছিলেন। তার পর থেকে সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। এ বছর একই কায়দায় ফের একবার কোনও সেট না হারিয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢুকলেন। সূচনা এক হলেও সমাপ্তির ছবিটা বদলাবে কি?
সিনারের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। কিন্তু আপাতত শক্তিশালী সার্ভিস, ধারালো ব্যাকহ্যান্ড আর নির্মম কায়দায় প্রতিপক্ষকে ছারখার করে তিন অস্ত্র হাতে নিয়ে আলকারাজ এমন নয়া অবতারে হাজির হয়েছেন, যা হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বীদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।