
রজত পাটিদার
শেষ আপডেট: 8 April 2025 14:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুরাণ থেকে বলিউড। সাহিত্য থেকে রাজনীতি। ভারতের সংস্কৃতি বরাবর নায়কদের তোল্লাই দিয়ে এসেছে। ভরকেন্দ্র এক ও অদ্বিতীয় কোনও চরিত্র। যাঁকে ঘিরে সার্বিক প্লট, চারপাশের সমস্ত ঘটনা আবর্তিত হবে।
আইপিএলের গোড়ার দিকে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর দর্শনটাও ছিল এমনই। এমনিতে তারকাখচিত ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগে তারকারাই শেষ কথা বলে। আর মাঠের খেলাকে পাশ কাটালে পড়ে থাকে বিনোদন ও মুনাফা। ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া একটি টুর্নামেন্ট একবার না জিতেও একটি দল সেই বিনোদন ও মুনাফার অঙ্কে কিন্তু আর সবাইকে দশ গোল দিয়েছে। আরসিবি ক্রিকেটীয় তর্ক-বিবাদে ট্রোলড হয়েছে ঠিকই। কিন্তু গত ষোলো-সতেরো বছর ধরে নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করে নিতে পেরেছে। এই বিপণনের প্রধান মুখ অবশ্যই বিরাট কোহলি। আর তাঁর জ্যোতির্বলয়ের পাশে কখনও ঘুরপাক খেয়েছেন এবি ডেভিলিয়ার্স, কখনও ক্রিস গেইল। আরসিবির তিন ঈশ্বর—ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর!
দলকে ছাপিয়ে যখন হাতেগোনা তিন কি চারজন ক্রিকেটারই প্রচারের আলো শুষে নিচ্ছেন, প্রতি বছর উত্তরোত্তর রোজগার বাড়লেও সাফল্য অধরাই রয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই রণকৌশল বদলে ফেলে আরসিবি গোষ্ঠী। ডিরেক্টর পদে বসানো হয় মাইক হেসনকে। যিনি একাহাতে সবকিছু ঢেলে সাজান৷ ২০২০ সালে টনক নড়া শুরু। ‘বড় বড় তারকায় ভরা টিম’ থেকে ‘বড় টিম’ হয়ে ওঠার যাত্রারম্ভ। যার ফল: পরের পাঁচটি সিজনে চারবার প্লে-অফের টিকিট পাকা করা। মুকুটটি মাথায় ওঠেনি ঠিকই, বারবার তীরে এসে তরী ডুবেছে এও সত্য। কিন্তু অতীতের দৈন্যদশা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠেছে আরসিবি৷
এই আবহেই ২০২২ সালে নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান কোহলি। দায়িত্ব চলে যায় ফাফ ডুপ্লেসির হাতে৷ যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নামজাদা ক্রিকেটার হতে পারেন। কিন্তু ভারতীয় সমর্থকদের চোখে—না ব্যাটসম্যান, না অধিনায়ক—কোনও হিসেবেই কোহলির সমতুল্য নন।
ভরকেন্দ্র বদলের সেই ছিল শুরু৷ চলতি মরশুমে যা আরও বেশি করে চোখে লাগছে। কারণ আরসিবির অধিনায়ক এমন একজন যিনি দেশের হয়ে একটিও টি-২০ ম্যাচ খেলননি৷ রজত পাটিদারের নাম কয়েক বছর আগেও ভারতের দুঁদে ক্রিকেটভক্তদের বড় অংশ খুব একটা শুনেছেন বলে মনে হয় না। অথচ তাঁর হাতেই টিমের কর্তৃত্ব ন্যস্ত হয়েছে।
বাইরে থেকে মনে হতেই পারে, এটা এমন কোনও বড় বিষয় নয়৷ আরসিসিবির ক্রমবিবর্তিত স্ট্র্যাটেজিরই আরও একটি ফলিত রূপ। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যাবে, রজতের হাতে দলের রাশ তুলে দেওয়াটা আসলে আইপিএলের সার্বিক সংস্কৃতি বদলের চিহ্ন, যা বাকি টিমগুলিও ধীরে ধীরে অনুসরণ করতে শুরু করেছে৷
ঠিক কেন রজতকেই অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিল আরসিবি বোর্ড? এর কারণ দুটো। প্রথমত, তথ্য বলছে সাম্প্রতিক সময়ে, অন্তত ২০২২ সাল থেকে, রজত পাটিদার দলের সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যান৷ প্রায় উনচল্লিশের গড় নিয়ে গত তিন বছরে ৭২৮ রান। স্ট্রাইক রেটও চোখধাঁধানো—১৬৫.১। এই পর্বে সবচেয়ে বেশি রান কোহলির দখলে থাকলেও রজতের চেয়ে অনেক বেশি ইনিংস খেলেছেন৷ পাশাপাশি স্ট্রাইক রেটেও অনেক পিছিয়ে কোহলি। ধারাবাহিকভাবে রান তুলেছেন রজত৷ আর সেটাও বল নষ্ট না করে। টি-২০ ফরম্যাটে যে দুটো জিনিস সবসময় গুরুত্বপূর্ণ৷
পাশাপাশি স্পিনারদের বিরুদ্ধে বিশেষভাবে সাফল্য (গড় ৬৩.৫, স্ট্রাইক রেট ১৮৬.৮) পেয়েছেন পাটিদার। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট লিগে এই বিষয়ে রজতের উপরে রয়েছেন মাত্র একজন—দক্ষিণ আফ্রিকার হেনরিক ক্লাসেন৷ আর কেউ নন৷ খেলাটা যেহেতু ভারতের মাটিতে, অধিকাংশ দলই স্পিন-অস্ত্রে কিস্তিমাত করতে চায়, সেখানে রজতের মতো ব্যাটসম্যানকে দলে পাওয়াটাই বড় অ্যাডভান্টেজ৷ যা অধিনায়ক নির্বাচনে তাঁর পক্ষে গিয়েছে।
দ্বিতীয় বড় কারণ, ঘরোয়া ময়দানে রজতের নেতৃত্বদানের অভিজ্ঞতা। আরসিবির আগে মুস্তাক আলি ট্রফি, রঞ্জি ট্রফির মতো টুর্নামেন্টে মধ্যপ্রদেশের অধিনায়ক ছিলেন। যে কারণে মহা নিলামে শুধুমাত্র দলের নেতা হিসেবে আলাদা করে কাউকে কেনার পথে হাঁটেনি আরসিবি৷ নিলামে কেএল রাহুলের দর উঠেছিল ১৪ কোটি টাকা। বেঙ্গালুরু তাঁকে নিতে পারত। কিন্তু রজতের উপর আস্থা রাখার ফলে বাজেটের অর্থ বোলার কেনায় খরচ করা সম্ভব হয়েছে৷ আইপিএলের উদ্বোধনী মরশুম থেকেই বোলারদের কমতি, গুণগত ঘাটতি আরসিবির মাথাব্যথার কারণ। পরোক্ষে সেই যন্ত্রণা মিটিয়েছেন রজত পাটিদার৷
নামকরা মুখ নন৷ অধিনায়ক হিসেবে কখনও স্পটলাইটে থাকেন না। যে কারণে কৌশলগত সমস্ত সিদ্ধান্ত রজতকে নিতে হয় না। তুলনায় আনকোরা মুখ৷ ইগোর ঝামেলা নেই৷ তাই কোচ অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও তাঁর সহযোগী ব্যাকরুম স্টাফ স্বাধীনভাবে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করার সুযোগ পান৷ আগে মাঠের অধিনায়কই সমস্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন। এখন ডেটা অ্যানালিসিসের যুগে তা অস্তে গেছে। মাঠের যুদ্ধের রণকৌশল ডাগ আউটে বসা কোচিং স্টাফেরা নিরন্তর ছকে চলেন। তারকা অধিনায়ক পদে থাকলে এই কৌশলের প্রয়োগ হওয়া-না হওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব বেঁধে যেত৷ মৃদুভাষী, আনকোরা রজত নেতৃত্বে রয়েছেন বলে এই নিয়ে এখনও পর্যন্ত আরসিবি ক্যাম্পে কোনও সংঘাত লাগেনি৷ পর্দার আড়াল থেকে সুতো ধরে রেখেছেন কোচ অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার৷ নিয়ে চলেছেন দল বাছাই থেকে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার সংক্রান্ত একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত৷ যার ফল গতকাল মুম্বই ডেরায় গিয়ে তাদের পরাস্ত করে আসা।
একটু আগেই বলেছিলাম, রজত পাটিদারের কুর্সিতে বসা সার্বিকভাবে আইপিএলে ‘নয়া রাজ’, একটা সাংস্কৃতিক বদল এনেছে৷ যার আরও একটি প্রমাণ এবার বলছি। চলতি মরশুমে দশটি টিমের মধ্যে ন'টি টিমের দায়িত্বে রয়েছেন কোনও না কোনও ভারতীয় খেলোয়াড়। যাঁদের মধ্যে ছ'জন আপাতত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্রাত্য! রুতুরাজ গায়কোয়াড়, অজিঙ্ক রাহানে, শুভমান গিল, শ্রেয়স আইয়ার, ঋষভ পন্থ এবং রজত পাটিদার—এই মুহূর্তে টিম ইন্ডিয়ার হয়ে টি-২০ খেলেন না!
আসলে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিরা স্পষ্টত বুঝে গেছে, ক্রিকেট আর আগের মতো নেই৷ বদলে গেছে, বদলে যাচ্ছে৷ এখন মাঠের লড়াইয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ব্যাকরুমের রণকৌশল। প্রতিনিয়ত নির্দেশ পাঠানো হয় ডাগআউট থেকে। আড়াই মিনিটের স্ট্র্যাটেজিক টাইম আউট এসে অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছে। আমদানি হয়েছে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ারের নিয়মও। ‘মাঠের সিদ্ধান্ত’ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘ড্রেসিং রুমের সিদ্ধান্ত’ হয়ে উঠছে।
ফলে কেন অযথা ময়দান আর ময়দানের বাইরে দুটো আলাদা ভরকেন্দ্র থাকবে? থাকলেই সংঘাত আর বিবাদ অনিবার্য! বরং, দুটোকেই একসঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যাক৷ তাহলে কোচ বনাম অধিনায়ক, তারকা ক্রিকেটার বনাম কোচিং স্টাফের বিতর্ক এড়ানো যাবে৷
এরই উজ্জ্বল নজির গতবারের আইপিএল। কেকেআর ট্রফি জেতে। শ্রেয়স আইয়ার অধিনায়ক হিসেবে নজির গড়েন৷ কিন্তু ফোকাস কেড়ে নেয় গৌতম গম্ভীর ও চন্দ্রকান্ত পণ্ডিত জুটি। যেন অধিনায়কের অবদান তুচ্ছ! যেন দুই কোচের স্ট্র্যাটেজিতেই কলকাতা কিস্তিমাত করেছে!
রজত পাটিদার নট হতে পারেন৷ নায়ক নন৷ সচেতনভাবেই একজন পার্শ্বচরিত্রকে অধিনায়কের ব্যাটন ধরিয়ে কেকেআরের দেখানো পন্থায় এবার যুদ্ধ জিততে চাইছে আরসিবি। যে যুদ্ধের আসল সূত্রধরেরা বসে রয়েছেন পর্দার আড়ালে… ডাগ আউটে।