
শেষ আপডেট: 9 July 2018 14:46
বস্তুত, যে কোনও খেলোয়াড়েরই বড় অসহায়তার জায়গা এই চোট। অথচ খেলার সঙ্গে চোটের সম্পর্ক যেন মেঘ আর বৃষ্টির মতোই। প্রথমটা থাকলে দ্বিতীয়টাও তার হাত ধরে আসবেই। প্রথমটা যত বাড়বে, দ্বিতীয়টার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। চোটহীন খেলা বোধ হয় সোনার পাথরবাটির মতোই অসম্ভব এবং অকল্পনীয় একটা ব্যাপার। বিশ্বের তাবড় খেলোয়াড়রা এই চোটের মাসুল দিতে গিয়ে প্রায়ই হারিয়ে গিয়েছেন খেলার জগৎ থেকে।
দীপাও ব্যতিক্রমী নন। বিশেষ করে জিমন্যাস্টিকসের মতো একটা স্পোর্টসে থেকে তো ননই। যদিও এই চোট ও চোট সারানোর অস্ত্রোপচার পরবর্তী সময়ের হতাশা কখনওই প্রকাশ করেননি দীপা। আগরতলার বাসিন্দা দীপা, অস্ত্রোপচারের পরে চলে গিয়েছিলেন দিল্লি। কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দীর অধীনে রিহ্যাব করেছেন সেখানেই। সংবাদমাধ্যমকে বারবার বলেছেন, “যে কোনও অ্যাথলিটই চোট পেতে পারেন, এতে কারও হাত নেই। হতাশ হওয়ারও কারণ নেই।”
কোচ বিশ্বেশ্বর বাবু বলছেন, “ওর খুবই মনের জোর, এ কথা ঠিক। কিন্তু হতাশ ও-ও হয়েছিল। যে কোনও মানুষই হবে। পড়াশোনায় মন দিয়েছিল দীপা।” দীপাও বলেন, “আমি এটাকে ধাক্কা হিসেবে দেখছিই না। তবে পরিস্থিতিটা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জের। আমি এখন পড়াশোনা করতে চাইছি। গত বছর একটা পরীক্ষা দিয়েছিলাম। এবার আরও একটা পরীক্ষা দিতে চাই।”
আস্তে আস্তে সেরে উঠেছেন দীপা, অনুশীলনের ছন্দেও ফিরেছেন গত বছরের শেষ দিকে। কিন্তু ফোকাস করেছেন শুধু অনুশীলনেই। কোনও প্রতিযোগিতায় নামেননি। বিশ্বেশ্বর বাবু বলেছেন, “দীপা শুধু যোগ দেওয়ার জন্য বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে যাক, সেটা আমি কখনও চাইনি। সদ্য অস্ত্রোপচার থেকে উঠে বড় প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হওয়া ওর পক্ষে সম্ভব হবে না। পুরোপুরি চোট সারিয়ে আগের মতোই ফ্লোরে ফিরে আসা বেশ চ্যালেঞ্জের।” তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, এমনিতেই জিমন্যাস্টিকস চোট-প্রবণ একটা খেলা। আর প্রতিযোগিতা চলাকালীন চোট পাওয়ার আশঙ্কাও আরও বেশি থাকে। তিনি বলেন “তাই আমি চাই আগামী বছরের কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসের জন্য তৈরি হোক দীপা।”
কিন্তু এই দু’টো প্রতিযোগিতাতেও সম্পূর্ণ সেরে উঠতে পারেননি দীপা। বাদ দিতে হয়েছে যোগ দেওয়ার চিন্তা। সময় নিয়েছেন, ধৈর্য্য ধরেছেন, আরও ঘষামাজা করেছেন দক্ষতা। মিডিয়ার আলো থেকে দূরে, একটানা লড়াই করে গিয়েছেন নিজেকে নিয়ে। সঙ্গ দিয়েছেন বিশ্বেশ্বরবাবু। ফিরতেই হবে দীপাকে, আর ফিরতে হবে সবটুকু পারদর্শিতা নিয়েই। কোনও জড়তা বা আপসের জায়গা নেই সেখানে।
এভাবে দেড় বছরেরও বেশি সময় নিঃশব্দে থাকার পরে অংশ নিয়েছিলেন তুরস্কে আয়োজিত জিমন্যাস্টিকস ওয়ার্ল্ড কাপে। অনেকের মনেই সংশয় ছিল, এত দিনের ব্যবধানের পরে কতটা কী করতে পারবেন তিনি। আদৌ ফিট থাকতে পারবেন কি না গোটা প্রতিযোগিতায়। সমালোচকেরা অস্ত্র শানাতেও ছাড়েননি। বলেছেন, এত দিন পরে, এত বড় বিশ্ব-চ্যাম্পিয়নশিপে না নামলেই পারতেন দীপা। ছোট মাপের কোনও প্রতিযোগিতায় নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়া দরকার ছিল বলে মনে করেছিলেন তাঁরা।
কিন্তু তাঁরা তো গত দেড় বছর ধরে অন্ধকারে চুপ করে থাকা দীপার খবর রাখেননি কেউই। তাই জানতেই পারেননি, কী অমানুষিক পরিশ্রম করে, রোজ কতটা করে সময় ফ্লোরে কাটিয়ে, কত বাধাকে গ্রাহ্য না করে, দীপা নিজেকে গড়েপিটে তুলেছেন নতুন করে। জানতে পারেননি, এই দীর্ঘ ব্যবধানকে তাঁর কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দীও কত সুন্দর ভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সেরা ছাত্রীর সেরা পারফরম্যান্সগুলো আরও মসৃণ করে তুলেছেন ধৈর্য্য ধরে।
তাই সকলের আশঙ্কা আর নেতিবাচকতাকে ভুল প্রমাণ করে, এই ওয়ার্ল্ড কাপের আসরে বিশ্বের তাবড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের পিছনে ফেলে দিয়ে মৃদুভাষী, শান্ত, নম্র দীপা বুঝিয়ে দিলেন দীর্ঘ দিন প্রতিযোগিতার বাইরে থাকলেও, বাইরে ছিলেন না অনুশীলনের। তাঁর পারফরম্যান্স রয়েছে আগের মতোই ক্ষুরধার ও নিখুঁত।
ওয়ার্ল্ড চ্যালেঞ্জ কাপে শনিবারের ফাইনাল ইভেন্টে ১৪.১৫ পয়েন্ট নিয়ে সোনা জিতে নেন দীপা। তাঁর পরে আছেন ১৩.৪০ পয়েন্ট নিয়ে রুপো জেতা ইন্দোনেশিয়ার প্রতিপক্ষ রিফদা ইরফানালুথফি। এবং ১৩.২০ পয়েন্ট নিয়ে ব্রোঞ্জ জেতা, তুরস্কের গোকসু উখতাস সানলি। অর্থাত দীপার সঙ্গে বাকিদের পয়েন্টের ব্যবধান অনেকটাই। বিশ্বেশ্বর বলেন, “ওর সেরা চেষ্টাটা উজাড় করে দিয়েছে এই ইভেন্টে। এতটাও আশা করিনি আমি।”
তাই এই গোটা প্রতিযোগিতাটাই দীপার জন্য বড্ড স্পেশ্যাল ছিল। তিনি যে শুধু ফাইনালে নজরকাড়া পারফর্মেন্স করে সোনা জিতে নিয়েছেন তাই নয়, এই প্রতিযোগিতার প্রথম থেকেই দারুণ ছন্দে পাওয়া গিয়েছে দীপাকে। বারবার যেন মনে করিয়ে দিয়েছেন সেই প্রবাদবাক্যটা—সাফল্যের কোনও শর্টকাট হয় না এবং পরিশ্রমের কোনও বিকল্প হয় না।