
বৈভব সূর্যবংশী
শেষ আপডেট: 1 May 2025 07:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০০০ সালে ঝাড়খণ্ডকে (Jharkhand) যখন বিহার (Bihar) থেকে আলাদা করা হল সেই সময় একটি চটুল গান নয়া রাজ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। সেই গানের প্রথম বুলি ছিল: ‘অলগ ভেইল ঝাড়খণ্ড, খাও সকরকন্দ’। বাংলায় তরজমা করলে দাঁড়ায়: ‘ঝাড়খণ্ড এবার আলাদা হল, তোমরা রাঙালু খাও।’
‘তোমরা’ বলতে বিহারবাসী। যাবতীয় কলকারখানা, শিল্পকেন্দ্র, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়—মোট কথা শিল্প, বাণিজ্য ও শিক্ষার প্রায় সমস্ত প্রাণকেন্দ্র ঝুলিতে পুরে ঝাড়খণ্ড আলাদা হয়ে যায়। বিহার পড়ে থাকে অতলে, ডুবে যায় আঁধারে। সেই ‘পিছিয়ে পড়া’কে বিঁধেই ঝাড়খণ্ডবাসী ব্যঙ্গের সুরে গান বেঁধেছিলেন। যার মাশুল এখনও গুনছে বিহার।
মাশুল গুনেছিলেন আশুতোষ অমন-ও (Ashutosh Aman)। বিহারের রঞ্জি দলের (Ranji Trophy) অধিনায়ক। স্বপ্ন ক্রিকেটার হওয়ার। ট্রেনিং পরিকাঠামো, উন্নত সুযোগসুবিধা তো অনেক দূরের কথা। রাজ্যে ক্রিকেট বিষয়টাই স্রেফ উবে গিয়েছে! অন্য অনেকের মতো অমনও পাড়ি দেন ঝাড়খণ্ড।
কিন্তু এক জেদি ছেলে আর তাঁর পরিবার জন্মভিটে ছাড়েনি। অমনের মতো সেই বাচ্চা ছেলেটিও ক্রিকেটার হতে চেয়েছিল। সমস্তিপুরের (Samastipur) তাজপুরে বেড়ে ওঠা। খেলাধুলোর চল সেভাবে নেই। তবু শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাননি বৈভব। বৈভব সূর্যবংশী (Vaibhav Suryavanshi)। আইপিএলে (IPL) কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে শতরান, টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে আপাতত দেশের আমজনতার চায়ের কাপে তুফান তুলেছেন বছর চোদ্দোর কিশোর।
সোমবার চলতি টুর্নামেন্টের অন্যতম ছন্দে থাকা দল গুজরাত টাইনটানসের (Gujrat Titans) ফর্মে থাকা বোলারদের সামান্যতম ‘সম্মান’ দেখাননি বৈভব৷ মাঠের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছেন।
এক সময় তাঁর সঙ্গেই বিহারের হয়ে মাঠে নামতেন আশুতোষ। সোমবারের বিধ্বংসী শতরান টিভির পর্দায় দেখে আবেগাপ্লুত অমন বেশ জোরালো ভবিষ্যদ্বাণী করে দিলেন: ‘ধোনি ঝাড়খণ্ডের জন্য যা, বৈভব বিহারের জন্য তেমনটাই হয়ে উঠবে! ও একা হাতে বিহারকে ক্রিকেটীয় মানচিত্রে তুলে এনেছে। আগে কেউই সেভাবে সমস্তিপুরকে চিনত না! তবে আমরা, যারা বিহারি, তাদের ডিএনএ-তে একটি বিষয় রয়েছে: আমাদের হারানোর কিছু নেই। এই কারণে বৈভব তার আইপিএল কেরিয়ারের শুরুয়াত করেছে শার্দূল ঠাকুরকে ছক্কা মেরে। শতরানও সেরেছে রশিদ খানকে ছক্কা হাঁকিয়ে।’
বিহার থেকে ছিন্নমূল ক্রিকেটারদের সংখ্যা অবশ্য খুব কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে চর্চিত মুখ ঈশান কিষান (Isahn Kishan)। আদতে পাটনার (Patna) বাসিন্দা। বাবার ব্যাবসার সূত্রে চলে যান রাঁচি (Ranchi)।
পেসার মুকেশ কুমার (Mukesh Kumar)৷ ২০১২-তে তিনি কলকাতা (Kolkata) পাড়ি দেন। বাবা ট্যাক্সিচালক। ক্রিকেটে নিজের কেরিয়ার গড়ার পাশাপাশি তাঁকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন মনোজ৷ ময়দানে খেপ খেলতেন। কুড়িয়ে-বাড়িয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হাতে আসত। তারপরই রণদেব বসুর (Randev Bose) নজরে পড়েন আর মনোজের জীবন বদলে যায়৷
আকাশ দীপ (Akash Deep)। আরেক ফাস্ট বোলার। তাঁর জীবনের গল্প আরও রোমাঞ্চকর। কলকাতা এসেছিলেন নিজে ট্রাক ড্রাইভার হবেন বলে। ভাগ্যচক্রে ক্রিকেটার বনে যান। আপাতত নিজে ক্রিকেট অ্যাকাডেমি খুলেছেন সাসারামে। তাঁর মতো সংঘাত, বিপর্যয় যাতে বিহারের কাউকে ভোগ করতে না হয়, সেই কারণে এই উদ্যোগ।
বৈভব সেই অ্যাকাডেমির ছাত্র ছিলেন না ঠিকই। কিন্তু আগামী দিনের বৈভবদের তুলে আনতে যে এমন আন্তর্জাতিক মানের সেন্টার তৈরি আশু প্রয়োজন, একটি শতরানে তা বিলক্ষণ বুঝেছে বিহারের ক্রিকেট অ্যাসোশিয়েশন (BCA)। বিসিএ-র প্রেসিডেন্ট রাকেশ তিওয়ারির উপলব্ধি, ‘দর্শকদের থেকে যখন বৈভবের নামে জয়ধ্বনি ভেসে আসছিল, সত্যি বলছি, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। তবে এবার আপনারা আগামী দিনে অনেক বেশি করে প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের উঠে আসতে দেখবেন। আমরা পরিকাঠামো নিয়ে কাজ করছি। সরকারের সঙ্গে মউ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যার সুবাদে মঈন-উল-হক স্টেডিয়াম ৩০ বছর ব্যবহারের অনুমোদন জুটেছে। তাকেই সংস্কার করে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টিং কমপ্লেক্স বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া রাজগিরে আরও একটি স্টেডিয়াম তৈরির চিন্তাভাবনা চালাচ্ছি।’