
শেষ আপডেট: 11 November 2023 14:04
বিশ্বকাপে 'আন্ডারডগ' দল হিসেবে ভারতে এসেছিল আফগানিস্তান। শুক্রবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তারা এবারের মতো বিশ্বকাপের অভিযান শেষ করেছে। অভিযান শেষ করলেও তারা অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেল! আফগানিস্তানকে কি এখন আর আন্ডারডগ দল বলা যাবে?
বিশ্ব ক্রিকেটে আফগানিস্তান খুব একটা পুরনো দল নয়। ২০১০ সালের আগেও এই দলকে নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হত না। আফগানিস্তান বলতেই বিশ্বের মানুষের চোখে ভেসে উঠত কাবুলিওয়ালা, রুক্ষ পরিবেশ, তালিবান-আফগানিস্তান সরকারের মধ্যে লড়াই--- এইসব ছবি। কিন্তু রশিদ খান, মহম্মদ নবি, নবীন উল হক, রহমতুল্লাহ গুরবাজরা বিশ্বের কাছে নতুন করে আফগানিস্তানকে তুলে ধরেছেন।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান। মাঝেমধ্যেই ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এই দেশের একাধিক শহর। দেশের আকাশে বাতাসে স্বজনহারার কান্না। নানা কারণে দেশবাসীর মনে 'সুখ' নেই। জীবন যুদ্ধে রোজ তাঁরা লড়াই করছেন। কিন্তু এইসবের মধ্যে রশিদ খানরা দেশবাসীকে টিভির সামনে এনে বসিয়ে দিয়েছে। মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
এটাই তো ক্রিকেট। বিশ্বকাপের মাঝে এক সাক্ষাৎকারে রশিদ বলেছিলেন, 'হাজার দুঃখের মধ্যে ক্রিকেটই একমাত্র জিনিস, যা দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারবে!' খুব একটা ভুল বলেননি তিনি। ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারানোর পর রশিদদের নিয়ে বাঁধন ছাড়া উন্মাদনা দেখা গেছে ও দেশে।
শেষ ম্যাচ পর্যন্ত আফগানিস্তান ছিল সেমিফাইনালের দৌড়ে। শুরুটা ভাল না হলেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিরাট জয় আফগানিস্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। তারপর পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে হারায় তারা। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে বিপাকে ফেলেছিল আফগানরা। শুক্রবার দক্ষিণ আফ্রিকাও, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সহজে জয় পায়নি।
আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভাল। পাকিস্তানকে হারানোর পর মাঠের মধ্যে রশিদ খানদের সঙ্গে নাচতে দেখা গেছে প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার ইরফান পাঠানকে। এমনকী ভারতীয় পতাকা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নবিরা। আইপিএলে খেলার সুবাদে ভারত এখন রশিদদের দ্বিতীয় ঘর বলাই চলে।
তবে ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তান ক্রিকেটের সম্পর্ক শুধু এইটুকুই নয়। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক অজয় জাদেজা মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব নেয় রশিদদের। ভারতীয় ক্রিকেটে অজয় জাদেজার নাম কে না জানে। তাঁকে নিয়ে কম বিতর্ক নেই। ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে ভারতীয় ক্রিকেট থেকে এখন তিনি অনেক দূরে।
ভারতীয় ক্রিকেট থেকে দূরে থাকলেও ক্রিকেট থেকে অজয় কখনওই দূরে যাননি। কমেন্ট্রি করেছেন। এখন তিনি আফগানিস্তান দলের মেন্টর। রশিদদের কথায়, অজয় দলে মেন্টর হয়ে আসায় অনেক কিছু পাল্টে গেছে। তাঁর থেকে এমন কিছু টেকনিক শেখা গেছে যা মাঠে কাজে লেগেছে।
বিশ্বকাপে খেলার আগে পর্যন্তও আফগানিস্তানকে নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে রাজি ছিল না বিশ্ব ক্রিকেটের 'দাদা'রা। এখন এই আফগানিস্তানই সবচেয়ে প্রতিদ্বন্ধী বলা চলে। এবার হল না তো কী হয়েছে, রশিদরা বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের মানুষদের যে স্বপ্ন দেখিয়ে গেলেন, তা নেহাত কম নয়।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের একাংশের কথায়, অজয় জাদেজা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আফগানিস্তানের ড্রেসিংরুমের ছবি পাল্টে গেছে। জাদেজার টিপসে নিজেদের তৈরি করে নিচ্ছেন গুরবাজ, নবিরা। আর আছেন দলের কোচ প্রাক্তন ইংরেজ অধিনায়ক জোনাথন ট্রোট। তিনিও আফগানিস্তানের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।
অজয় জাদেজা, ১৯৯২ থেকে ২০০০ পর্যন্ত ভারতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি ১৫টি টেস্ট ম্যাচ ও ১৯৬টি একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন ভারতের হয়ে। ভারতীয় দলের অধিনায়কও হয়েছিলেন অজয়।
মেন্টর হিসেবে আফগানিস্তান দলে অজয়ের ভূমিকা অপরিসীম। কোচের থেকেও দলে মেন্টরের ভূমিকা অনেক বেশি। প্রতিটি খেলোয়াড়ের খুঁটিনাটির দিকে নজর থাকে মেন্টরের। শুধু তাই নয়, খেলোয়াড়দের মনঃস্তত্ত্ব দিকটা দেখতে হয় তাঁকে। আর এইসব ব্যাপারে অজয় জাদেজা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন আফগানিস্তান দলে।
আফগানিস্তানের শাসনভার এখন তালিবানদের হাতে। দ্বিতীয়বার তারা ক্ষমতায় এসেছে। তবে তালিবানরা দেশের সব কিছুর ভিতর ঢুকে পড়লেও বাদ রেখেছে ক্রিকেটকে। আফগানিস্তান ক্রিকেটের ব্যাপারে তারা কোনও মতামত দেয় না। তালিবান শাসিত আফগানিস্তানে 'মুক্ত' রশিদরা।