বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা কালীসাধক পাব অগুন্তি। তবে তাঁদের মধ্যে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হলেন আধুনিকতম। তিনি আধুনিকতম, কেবল কালের পরিপ্রেক্ষিতেই নয়, আধুনিকতম তিনি তাঁর 'ভাব সাধনায়'।

প্রতীকী ছবি।
শেষ আপডেট: 19 October 2025 13:30
বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা কালীসাধক পাব অগুন্তি। তবে তাঁদের মধ্যে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হলেন আধুনিকতম। তিনি আধুনিকতম, কেবল কালের পরিপ্রেক্ষিতেই নয়, আধুনিকতম তিনি তাঁর 'ভাব সাধনায়'।
তরুণ গদাধর যেদিন দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি মন্দিরে মা ভবতারিণীর সেবায় নিযুক্ত হলেন, সেদিন থেকেই জীবনের আসল উদ্দেশ্য পথে একাকী তাঁর পথ চলা হল শুরু। এই তরুণ পুরোহিত প্রথম যেদিন মন্দিরে মা ভবতারিণীর বিগ্রহের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলেন সেদিন কিন্তু তিনি সাধক ছিলেন না। এমনকী এই উপাস্য দেবীর আসল রূপটি কী, তা খুঁজে বের করতে হবে অথবা দেবী নিরাকার না সাকার এসকল তাত্ত্বিক ভাবনাও তাঁর মনে সেদিন একবারও জাগেনি। কেবল জেগেছিল একটি মধুর শব্দ -"মা"। ঈশ্বরের এক মানবিক রূপ গদাধর খুঁজে পেলেন কালী বিগ্রহের মধ্যে। হৃদয়ের গভীর বিশ্বাস নিয়ে তিনি তাঁকে ডাকলেন মা বলে, মা-শিশুর কাছে জগতে সবচেয়ে প্রিয়, আপন, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, যার কাছে সব কথা খুলে বলা যায়, যা খুশি আবদার করা যায় -সেই মা।

• কেমন ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের কালী পূজা?
নবীন পুরোহিতের দেবী পূজায় ছিল না কোন পরিমিতিবোধ। সময়ের ব্যাপারে নিতান্তই উদাসীন। উচিত অনুচিতের সীমাও পার হয়ে যেতেন অনায়াসে। বড় বিচিত্র ছিল তাঁর এই মায়ের পূজা। সকালে ফুল তুলে মালা গেঁথে দেবীকে সাজাতেই অনেকটা সময় চলে যেত। পুজোয় বসে বিধি মতো নিজের মাথায় একটা ফুল দিয়েই হয়তো ধ্যানস্থ হয়ে রইলেন দুই ঘন্টা। আবার অন্ন নিবেদন করে মা গ্রহণ করছেন ভেবে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিলেন। মাকে আনন্দ দিতে কখনো পুজোর মাঝখানে অথবা পুজোর শেষে গান গেয়ে চললেন ঘন্টার পর ঘন্টা। আবার কখনো আকুল হয়ে মা কে বলছেন "মা তুই রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস, আমায় কেন তবে দিবি না? আমি ধন, জন, সুখভোগ কিছুই চাই না, আমায় দেখা দে'। প্রার্থনা করতে করতে চোখের জলে তাঁর বুক যেত ভেসে, মুখ লাল হয়ে উঠত। দেখা যেত সন্ধ্যায় তন্ময় হয়ে পূজারী মাকে গান শোনাচ্ছেন কিন্তু সময়ের কোনো হিসেব নেই। বিচিত্র রকম এই সৃষ্টিছাড়া পুজো একান্তই শ্রীরামকৃষ্ণের নিজস্ব সাধন পদ্ধতি। সাংসারিক গণ্ডিবদ্ধ ব্যক্তিদের কারও কাছে গদাধর হলেন বিদ্রুপভাজন আবার কারও কাছে হয়ে উঠলেন শ্রদ্ধেয়।

মথুরানাথ বিশ্বাস বা মথুরামোহন বিশ্বাস, সেজোবাবু নামে পরিচিত রাণী রাসমণির তৃতীয় ও কনিষ্ঠ জামাতা ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। ডাকসাইটে জমিদার মথুরের মধ্যে যে ভক্তি ছিল তার দ্বারা ঠাকুরের আধ্যাত্বিক ভাবরাশি বুঝতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। সব দেখেশুনে তিনি বললেন, "অদ্ভুত পূজক পাওয়া গেছে দেবী বোধহয় শীঘ্রই জেগে উঠবেন।"
মথুরামোহনের এই ভাবনা সত্য হল।
শ্রীরামকৃষ্ণ ভবতারিণী মায়ের দর্শন তখনও পাননি সত্য, কিন্তু মায়ের উপস্থিতি সকল ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন। তাই মাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মনে আরও তীব্রতর হয়ে উঠল। উন্মত্তের মতো মাঝ রাত্রে মন্দির সংলগ্ন জঙ্গলে গিয়ে পরনের কাপড়, উপবিত খুলে রেখে পাশ মুক্ত হয়ে পঞ্চবটিতে বসে দিনের পর দিন নিবিষ্ট হয়ে ধ্যান করলেন, কত প্রার্থনা করলেন, কাঁদলেন। কিন্তু তবু পাষাণ গলল না। তখন দেখা দিল সংশয়, মা কি সত্যই আছেন?
তারপর হঠাৎ একদিন প্রত্যক্ষ করলেন এক অনির্বচনীয় আলোর উদ্ভাস। মা আর ছেলের মধ্যে শেষ অদৃশ্য আবরণটা নিমেষে গেল সরে। শ্রীরামকৃষ্ণ দেখলেন, 'ঘর, দ্বার, মন্দির সব যেন কোথায় লুপ্ত হইল - কোথাও যেন আর কিছুই নাই! আর দেখিতেছি কি, এক অসীম অনন্ত চেতন জ্যোতি: সমুদ্র! - যেদিকে যতদূর দেখি, চারিদিক হইতে তার উজ্জ্বল উর্মি11মালা তর্জন গর্জন করিয়া গ্রাস করিবার জন্য মহাবেগে অগ্রসর হইতেছে! দেখিতে দেখিতে উহারা আমার উপর নিপতিত হইল এবং আমাকে এককালে কোথায় তলাইয়া দিল! হাঁপাইয়া হাবুডুবু খাইয়া সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়িয়া গেলাম!.. অন্তরে কিন্তু একটা অননুভূত জমাট বাঁধা আনন্দের স্রোত প্রবাহিত ছিল এবং মার সাক্ষাৎ প্রকাশ উপলব্ধি করিয়াছিলাম।"

যে কালীর সঙ্গে যে মায়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণের এত সংগ্রাম এক ঝলক তার দর্শন পেয়ে তিনি তৃপ্ত হবেন কি করে! ওই এক মুহূর্ত দেখবার পর থেকেই জগন্মাতার অবাধ অবিরাম দর্শনের আকাঙ্ক্ষায় শ্রীরামকৃষ্ণের প্রাণে তীব্র কান্নার রোল উঠত, তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় তাঁর শরীর গেল শুকিয়ে, দেহের প্রতিটি রোমকূপ থেকে রক্তক্ষরণ হতে লাগল। সেই সঙ্গে গাত্রদাহ। অব্যক্ত যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে গড়াগড়ি দিয়েছেন, মাটিতে মুখ ঘষে ঘষে রক্তাক্ত করে ফেলেছেন নিজেকে, অদ্ভুত এই ঘটনা দেখতে চারপাশের লোক জমে যেত কিন্তু তাঁর কোনও হুঁশ থাকত না। আর এইরকম দুঃসহ পরিস্থিতিতে যখনই তিনি বাহ্য সংজ্ঞা হারাতেন, অনুভব করতেন জগন্মাতার অভয় মূর্তি সামনে এসে তাঁকে আশ্বাস দিচ্ছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ধ্যানে এখন শুধু মায়ের অনিন্দ্য সুন্দর হাত-পা মুখ নয়। পরিপূর্ণ চিন্ময় মূর্তির নিত্য আবির্ভাব দর্শন হতে লাগল। শুধু চোখ বন্ধ করলে নয় চোখ খুললেও মা! সকালে ফুলতোলা থেকে রাতে শয়ন দেওয়া পর্যন্ত শ্রীরামকৃষ্ণের সব কাজেই মা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ফিরতে লাগলেন। সকলের অলক্ষে চলে মায়ে পোয়ে কত কথা। চলে হাস্যপরিহাস আদর আবদার। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের মৃন্ময়ী মা এখন শ্রীরামকৃষ্ণের চিন্ময়ী মা রূপে বিরাজ করছেন। মা গঙ্গা দর্শন করতে দোতালায় চলেছেন আর ঠাকুর জগন্মাতার নূপুরের শব্দ শুনছেন, অনুভব করছেন মায়ের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস।
• বৈধীপূজা নয়, গণ্ডিভাঙা তাঁর সমর্পণ
বৈধীপূজা কোনওদিনই তিনি করতেন না; কিন্তু যেটুকু করতেন, তখন সেটুকুও অসম্ভব হয়ে উঠল। দেখা যেত পূজায় বসে কখনও প্রেমাভক্তির প্রাবল্যে ফুল-বেলপাতার অর্ঘ্য নিজের পায়ে ঠেকিয়ে দেবীকে নিবেদন করছেন; পূজাসন ছেড়ে মা-র কাছে গিয়ে তাঁর চিবুক ধরে আদর করছেন, পরিহাস করছেন, হাত ধরে নাচছেন; পূজা না করে ভোগ নিবেদন করে দিচ্ছেন কিংবা নিবেদিত ভোগ নিজহাতে দেবীকে খাওয়াতে ব্যস্ত হচ্ছেন অথবা নৈবেদ্যের খানিকটা নিজেই খেয়ে উচ্ছিষ্টটা দেবীকে খেতে অনুনয় বিনয় করছেন; মায়ের ভোগ মাতৃজ্ঞানে বিড়ালকে খাওয়াচ্ছেন আবার মাতৃ আদেশ ভেবে মা-র খাটে খানিকক্ষণ নিজেই শুয়ে থাকছেন। তিনি নিজের সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। জগন্মাতার কথা চিন্তা করে জগৎ তাঁর একেবারে ভুল হয়ে গিয়েছে। তাই ঠাকুর সেইসময় দেহবোধ হারিয়েছিলেন সম্পূর্ণভাবে।

দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মন্দিরের পূজারি শ্রীরামকৃষ্ণের চিরাচরিত বিধি ছাড়া এই গণ্ডিভাঙা পূজা - সাধনাতেই জগন্মাতা হয়েছিলেন জীবন্ত। এই জন্যই শ্রীরামকৃষ্ণ আধুনিকতম সাধক এবং তাঁর এই অপূর্ব কালী সাধনার ফলও চমৎকার! মন্দিরেই কেবল নয় জগন্মাতা জগতের সর্বত্র সকল রূপে ধরা দিলেন তাঁকে। সকল বস্তু হল চিন্ময়, সকল ব্যক্তিই হলেন মা কালী। বারাঙ্গনার মধ্যে খুঁজে পেলেন সীতা, ত্রিভঙ্গ হয়ে দাঁড়ানো একটি ইংরেজ যুবকের মধ্যে প্রত্যক্ষ করলেন কৃষ্ণ, সিংহ দেখে ঈশ্বরীয় উদ্দীপনায় হলেন বিহ্বল। এমনকী তাঁর নিজের মধ্যেও তিনি কালীর দুর্বার উপস্থিতি অনুভব করলেন; তিনি স্বয়ং হয়ে উঠলেন মা কালী। জগতের সকলের উপরে তাঁর এলো মাতৃভাব।
• একদিকে পাষাণপ্রতিমায় প্রাণসঞ্চার,অন্যদিকে মানবীর অন্তরে দেবীভাব জাগরণ
শ্রীরামকৃষ্ণের কালীসাধনা এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু হল না। শ্রীশ্রীসারদা মা একদিন ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমাকে তোমার কি বলে মনে হয়?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘যে মা মন্দিরে আছেন, তিনিই এ শরীরের জন্ম দিয়েছেন ও এখন নহবতে বাস করছেন, আর তিনিই এখন আমার পদসেবা করছেন। সাক্ষাৎ আনন্দময়ীরূপ বলে তোমায় সর্বদা সত্য সত্য দেখতে পাই।’ এটা কোনও কথার কথা নয়। একদিন তাঁর পূজায় তিনি পাষাণপ্রতিমায় প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন এখন তিনি এক মানবীর অন্তরের সুপ্ত দেবীভাবকে জাগিয়ে তুললেন আশ্চর্য এবং অভিনব পূজায়! ষোড়শীপূজা সেই আত্মনিবেদন ও জাগরণের পূজা। এই পূজার মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীমাকে বিশ্বমাতৃত্বের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন। মাতৃশক্তি জাগরণের এই পূজা সমাপন করে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মাতৃসাধনা সাঙ্গ করলেন আর সেই সঙ্গে বিশ্বের ধর্ম-ইতিহাসে সূচনা করে দিয়ে গেলেন এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

• লেখক পরিচিতি- অধ্যক্ষ ,শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, দিনাজপুর , বাংলাদেশ।