আপনার ভাগ্য কি সত্যিই গ্রহের হাতে? জানুন জ্যোতিষশাস্ত্র কীভাবে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে।

শেষ আপডেট: 12 August 2025 15:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো : প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত এই বিশ্বাস আধুনিক সমাজেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা— অনেকেই এখনো মনে করেন, গ্রহের অবস্থান জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক বিরল গ্রহ-যোগ নিয়ে জ্যোতিষীরা দাবি করছেন, এটি মানুষের সম্পর্ক, কর্মজীবন, অর্থনীতি এবং ভাগ্যে বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে, আবারও প্রশ্ন উঠেছে— বিজ্ঞান ও যুক্তির এই যুগে জ্যোতিষশাস্ত্রের (Horoscope) দাবিগুলো কতটা বাস্তবসম্মত? নাকি এগুলো কেবলই বিশ্বাস ও কল্পনার ফসল?
জ্যোতিষশাস্ত্রের জন্ম ও বিস্তার
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি লক্ষ্য করেছে। এ থেকেই জ্যোতিষশাস্ত্রের (Zodiac Sings) জন্ম, যা প্রথম দিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গেই যুক্ত ছিল। মেসোপটেমিয়া, ভারত, চীন, মায়া সভ্যতা, মিশর, গ্রীস ও রোমান সাম্রাজ্যের মতো বহু প্রাচীন সভ্যতায় জ্যোতিষচর্চা প্রচলিত ছিল।মানুষ তখন চাঁদ ও তারার অবস্থান ব্যবহার করে কৃষিকাজের সময় নির্ধারণ, বন্যা বা বৃষ্টির পূর্বাভাস দিত।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ সালের পর মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের মিশ্রণে রাশিচক্র-ভিত্তিক জ্যোতিষ বিদ্যা তৈরি হয়। পরে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের এশিয়া বিজয়ের মাধ্যমে এটি গ্রীস ও রোমে ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তম শতকে ইসলামিক পণ্ডিতরা হেলেনীয় গ্রন্থ আরবি ও ফারসিতে অনুবাদ করেন, যা দ্বাদশ শতকে ইউরোপে পৌঁছায় এবং ল্যাটিনে রূপান্তরিত হয়।
এক সময় জ্যোতিষশাস্ত্রকে (Astrology) বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হতো। জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, আবহাওয়াবিদ্যা এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল। টাইকো ব্রাহে, জোহানেস কেপলার এবং গ্যালিলিও— এরা সবাই জ্যোতিষচর্চা করতেন। তবে সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব ও নিউটনের আবিষ্কারের পর জ্যোতিষের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
জ্যোতিষশাস্ত্রের মূল ধারণা ও প্রভাব
জ্যোতিষশাস্ত্র আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান দেখে মানুষের ভাগ্য ও জীবনের ঘটনা ব্যাখ্যা করে। জন্মসময়, জন্মতারিখ ও জন্মস্থানের ভিত্তিতে একটি জন্মছক বা কুণ্ডলী তৈরি হয়। জ্যোতিষীরা বিশ্বাস করেন, এর মাধ্যমে ব্যক্তির স্বভাব, ব্যক্তিত্ব, ভবিষ্যৎ এবং এমনকি প্রাকৃতিক ঘটনার সম্ভাবনাও জানা যায়।
প্রধান শাখা ও বৈশিষ্ট্য:
| ধরন | মূল ভিত্তি |
|---|---|
| বৈদিক জ্যোতিষ (ভারত) | রাশি, গ্রহ, ২৭টি নক্ষত্র, লগ্ন ও দশা প্রণালী; জন্মকুণ্ডলী বিশ্লেষণ। |
| পাশ্চাত্য জ্যোতিষ | সূর্যচক্রভিত্তিক ১২টি রাশি; গ্রহ ও হাউস বিশ্লেষণ। |
| চীনা জ্যোতিষ | চন্দ্র পঞ্জিকা, ১২ প্রাণী রাশি, পঞ্চতত্ত্ব ও ফেং শুই। |
বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিতর্ক
আধুনিক বিজ্ঞান জ্যোতিষকে ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে দেখে। কারণ, নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় এর ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক প্রমাণিত হয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, একই জন্মছক দেখে ২৮ জন জ্যোতিষী ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন— যা ভবিষ্যৎ বলার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অনেক আধুনিক জ্যোতিষীও এখন আর নিজেদের বিজ্ঞানী দাবি করেন না; বরং এটি আধ্যাত্মিক বা সাংস্কৃতিক বিশ্বাস হিসেবে দেখেন।
সংস্কৃতি ও সমাজে প্রভাব
আধুনিক যুগেও কোটি মানুষের জীবনে জ্যোতিষের গভীর প্রভাব রয়েছে। বিয়ে, সন্তানের নামকরণ, নতুন ব্যবসা, বাড়ি কেনা বা শুভ সময় নির্ধারণ— বহু ক্ষেত্রে মানুষ জ্যোতিষীর পরামর্শ নেয়। এটি অনেকের কাছে মানসিক শান্তি ও আত্মবিশ্বাসের উৎস। যেমন, চন্দ্রকে জ্যোতিষে মনের কারক গ্রহ বলা হয়, যা আবেগ ও মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলে। জ্যোতিষ নিয়ে মতভেদ তীব্র। কেউ সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে, কেউ বিজ্ঞানসম্মত নয় বলে মনে করে। মনোবিজ্ঞানী কার্ল জং একে আত্ম-উপলব্ধির উপায় হিসেবে দেখেছিলেন।
সমর্থকদের মতে, জ্যোতিষ নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়— সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। মানুষ প্রচেষ্টা ও প্রার্থনার মাধ্যমে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম।
('দ্য ওয়াল' এই বিষয়বস্তুর প্রচারক নয়; এটি কেবল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।)