
শিবরাত্রি হল দেশের অন্যতম একটি হিন্দু উৎসব।
শেষ আপডেট: 24 February 2025 14:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিবরাত্রি হল দেশের অন্যতম একটি হিন্দু উৎসব। শুধু শৈবরাই নন, হিন্দু ধর্মবিশ্বাসী যে কোনও মানুষই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই দিনটি বিশেষ পুজোপাঠ, উপবাসের মাধ্যমে পালন। দেশের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরেও দিনটি খুবই জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। স্থানীয়রা তো বটেই ভিনরাজ্য থেকে ভক্তপ্রাণ মানুষও এই তীর্থস্থানগুলিতে আসেন পুজো দিতে। মহা শিবরাত্রি পালিত হয় হিন্দু পঞ্জিকামতে ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে। শিবরাত্রিতে বিভিন্ন মন্দিরে 'জাগরণ' বা পুজোর অঙ্গ হিসেবে রুদ্রাভিষেক, জলাভিষেক, ভস্ম আরতির আয়োজন করা হয়। যার সাক্ষী হতে হাজার হাজার পুণ্যার্থী রাত জেগে অপেক্ষা করে থাকেন।
মহাকুম্ভ মেলায় এবছর মাঘ মেলা উপলক্ষে শিবরাত্রির দিন হবে শেষ শাহি স্নান। প্রয়াগরাজে ওই বিশেষ স্নান উপলক্ষে লাখো মানুষ ত্রিবেণী সঙ্গমে ডুব দেবেন। শুধু প্রয়াগরাজেই নয়, দেশের বিভিন্ন জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরে ওইদিন হবে বিশেষ পুজোপাঠ। এছাড়াও বিখ্যাত কিছু শিবমন্দিরে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমাবেন শিবরাত্রির পুজো দিতে। যেমন- উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারের নীলকণ্ঠ মহাদেব মন্দির, অসমের গুয়াহাটির উমানন্দ মন্দির, গুজরাতের জুনাগড়ের কাছে ভবনাথ তলাঠি, মধ্যপ্রদেশের উজ্জ্বয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দির, মধ্যপ্রদেশেরই খাজুরাহোর মাতঙ্গেশ্বর মন্দির, অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈল মল্লিকার্জুন মন্দির, হিমাচল প্রদেশের মান্ডির ভূতনাথ মন্দির, উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর তিলভাণ্ডেশ্বর মন্দির, কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির, গুজরাতের দেবভূমি দ্বারকার নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির, ওড়িশার পুরীর লোকনাথ মন্দির, গুজরাতের বিখ্যাত সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির এবং তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাতুরের ইশা যোগ কেন্দ্র।
নীলকণ্ঠ মহাদেব মন্দির, হরিদ্বার
মহাশিবরাত্রিতে এই মন্দিরে প্রতিবছর হাজার হাজার ভক্ত এসে ভিড় করেন। উত্তরাখণ্ডের পৌরি গাড়োয়াল জেলার হৃষিকেশ থেকে ৩২ কিমি দূরে অবস্থিত এই মন্দির। হরিদ্বার ভ্রমণে এই মন্দির অনেকেই দর্শন করেন। মণিকূট, ব্রহ্মকূট ও বিষ্ণকূটের মাঝে জঙ্গলে ঘেরা এই মন্দিরের চারপাশটিও দেখার মতো স্থান। পঙ্কজা ও মধুমতী নদীর সঙ্গমে অবস্থিত। সমুদ্র থেকে উত্থিত কালকূট বা গরল এখানে বসেই পান করেন শিব। সেই বিষের জ্বালা থেকে নিষ্কৃতি পেতে শিব এখানে পঞ্চপানি গাছের তলায় ৬০ হাজার বছর ধরে সাধনা করেন। বর্তমান মন্দিরটির গর্ভগৃহ সেখানেই নির্মিত হয়েছে। শিব এখানে কণ্ঠ-স্বরূপ।
উমানন্দ মন্দির, গুয়াহাটি
মহা শিবরাত্রিতে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর পিকক দ্বীপে অবস্থিত এই মন্দির। বহু ভক্ত শিবরাত্রি উপলক্ষেই এখানে এসে ভিড় জমান। এই দ্বীপটি বিশ্বের ক্ষুদ্রতম নদীদ্বীপ, যেখানে লোকবসতি নেই। রাজা গদাধর সিংহ ১৬৯৪ সালে এই মন্দির নির্মাণ করেন। কিন্তু ১৮৬৭ সালের ভূমিকম্পে তা ধ্বংস হয়ে যায়। কালিকা পুরাণ অনুযায়ী শিব এখানে ভয়ানন্দ রূপে বিরাজমান। কথিত যে, শিব এখানে যখন ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তখন কামদেব তাঁকে বারবার বিরক্ত করছিলেন। রাগে শিব কামদেবকে ভস্ম করে দেন। আরও কথিত যে, এখানে রয়েছে উর্বশীকুণ্ড। স্বর্গের নর্তকী উর্বশী কামাখ্যার জন্য এখানেই অমৃতভাণ্ড বয়ে নিয়ে এসেছিলেন।
ভবনাথ তলেঠি, জুনাগড়
জুনাগড় কেবলমাত্র গির অরণ্যের জন্যই বিখ্যাত নয়। গিরনার পর্বত ও তাকে ঘিরে ওঠা জঙ্গলে রয়েছে অসংখ্য সাধুসন্তদের সাধনস্থল। তার মধ্যেই একটি বিখ্যাত জায়গা হল ভবনাথ তলেঠি। মহা শিবরাত্রিতে জুনাগড়ে বসে শিবরাত্রি মেলা। শিবরাত্রির পাঁচদিন আগেই শুরু হয়ে যায় এই মেলা।
মাতঙ্গেশ্বর মন্দির, খাজুরাহো
ভ্রমণপিপাসুদের কাছে মন্দির নগরী খাজুরাহো অত্যন্ত আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল। প্রতিবছর দেশের তো বটেই বিদেশের বহু পর্যটক আসেন খাজুরাহো দেখতে। এখানকার প্রতিটি মন্দিরে রয়েছে অসামান্য শিল্পকলার নির্দশন। খাজুরাহোর পবিত্র সাগর বাঁধে স্নান করে মাতঙ্গেশ্বর মন্দিরে পুজো দেওয়ার বিধি। শিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে ১০ দিন ব্যাপী মেলা বসে।
মহাকালেশ্বর মন্দির, উজ্জ্বয়িনী
দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম মহাকালেশ্বর মন্দির হল ক্ষীরপা নদীর তীরে। এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য কাহিনি। তার মধ্যে একটি লোককথায় আছে, অবন্তী নগরের বাসিন্দাদের অত্যন্ত জ্বালাতন করছিল এক দৈত্য, নাম দুষণ। সেই সময় ভক্তদের আকুতিতে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসেন শিব এবং দমন করেন দুষণকে। কিন্তু তারপর অবন্তীর বাসিন্দাদের অনুরোধে শিব এখানে চিরকালের জন্য বাঁধা পড়েন তাঁদের ভক্তি-ভালবাসার টানে।
শ্রীশৈল মল্লিকার্জুন মন্দির, অন্ধ্রপ্রদেশ
শ্রীমল্লিকার্জুন স্বামী মন্দিরও দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের একটি। শিব-পার্বতীর বিয়ে ছাড়াও এখানে শিবরাত্রিতে শিবের তাণ্ডব দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই একটি মন্দিরেই শক্তিপীঠ রয়েছে। পুরাণে কথিত শিব-পার্বতী যখন কার্তিক-গণেশের বিয়ের জন্য মেয়ে বাছাই করছেন তখন কার্তিক বিয়ে করবেন না বলে ক্রৌঞ্চ পর্বতে পালিয়ে যান। নাম নেন কুমার ব্রহ্মচারী। কিন্তু দেবতাদের অনুরোধে তিনি দূরে কোথাও না গিয়ে কাছাকাছিই ছিলেন। শিব-পার্বতী কার্তিককে খুঁজে বের করতে যেখানে ছিলেন, সেই জায়গাটিই শ্রীশৈলম নামে খ্যাতি পায়। এখানে শিবলিঙ্গকে মল্লিকা ফুল দিয়ে পুজো করা হয় বলে নাম মল্লিকার্জুন স্বামী।
ভূতনাথ মন্দির, মান্ডি
ছোট শহর হলেও মান্ডির ভূতনাথ মন্দির ভারত বিখ্যাত। লোককথা অনুযায়ী পাঁচ শতাব্দী পূর্বে মান্ডির রাজ পরিবার সপ্তাহব্যাপী মহা শিবরাত্রি মেলা উদযাপন করেন। সেই থেকে এই মেলা কেবলমাত্র দেশের নয়, বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয়।
তিলভাণ্ডেশ্বর মন্দির, বারাণসী
দক্ষিণ বারাণসীর এই মন্দিরেও প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে শিবরাত্রি পালিত হয়। এখানকার বিশেষত্ব হচ্ছে, ভাঙ ও ঠান্ডাই খেয়ে বাসিন্দারা বিশাল শোভাযাত্রা বের করেন শিব সেজে।
নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ, দ্বারকা
শিবরাত্রি উপলক্ষে দিনরাত ব্যাপী ভজন কীর্তনের আয়োজন করা হয়। শিবলিঙ্গকে দুধ, ঘি, মধু, চিনি, দই, জল দিয়ে পবিত্র স্নান করানো হয়।
লোকনাথ মন্দির, পুরী
কথায় আছে, রামচন্দ্র নিজের হাতে এই লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই শিব এবং রামভক্ত উভয়ের মধ্যে এই মন্দিরকে ঘিরে অনন্ত উদ্দীপনা রয়েছে। সারাবছর শিবলিঙ্গকে জলের তলায় রাখা হয়। মহা শিবরাত্রির মাত্র ৩ দিন আগে জল সরিয়ে ভক্তদের স্পর্শের জন্য রাখা হয়।
সোমনাথ মন্দির ও কোয়েম্বাটুতের ইশা যোগ সেন্টারেও মহা উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভক্তিতে পালিত হয় শিবরাত্রির পুজোপাঠ। এই সেন্টারে রয়েছে ১১২ ফুট উচ্চতা আদিযোগী রূপে ইস্পাতে তৈরি শিবের মূর্তি।