.webp)
শেষ আপডেট: 17 December 2023 15:36
গোটা পৃথিবীকে এক সূত্রে গাঁথার অনুষঙ্গ অনেক। তবে কোনওটাই নিরাপত্তা, সুরক্ষা নিয়ে আতঙ্ক, ভয়ের থেকে বেশি নয়। গোটা পৃথিবীই এখন ভীত, সন্ত্রস্ত। বিচ্ছিন্নতা, জঙ্গিবাদের আতঙ্কের বাস্তব পরিস্থিতি যেমন আছে, তেমনই এই সুযোগে নিরাপত্তার আতঙ্ক ছড়ানো এবং তা থেকে মুক্তির আশ্বাস প্রদানের রাজনীতির এখন ভূবনায়ন হয়েছে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব দেশের কর্তারাই দেশের সুরক্ষা নিয়ে ভাবিত। যে শাসক আতঙ্ক ছড়ানো এবং তা থেকে মুক্তির আশ্বাস গেলাতে যত পারদর্শী তাঁর গদি তত মজবুত।
সংসদে দুই তরুণের ঢুকে পড়ার ঘটনা নিরাপত্তা নিয়ে সরকারকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে, সন্দেহ নেই। সংবাদমাধ্যম সূ্ত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারত বিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা সরকারি পরিভাষায় শহুরে নকশালদের সঙ্গে কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। বরং আজকের ভারতে নিজেকে খাঁটি দেশপ্রেমিক প্রমাণে যে স্লোগানটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়ে থাকে সেই ‘ভারত মাতা কি জয়’ শোনা গিয়েছে সংসদে ঢুকে ধোঁয়া ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী দুই তরুণের মুখে। তাতে অবশ্য ইউএপিএ অর্থাৎ জঙ্গি দমন আইনে মামলার খাঁড়া থেকে রেহাই মেলেনি তাঁদের।

সংসদের অধিবেশন কক্ষে দাঁড়িয়ে ওই তরুণেরা বারে বারে তীব্র বেকারি, জিনিসপত্রে মাত্রাছাড়া দাম, মণিপুর পরিস্থিতির মতো বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল। বুধবার লোকসভায় যিনি প্রথম ঢুকে পড়েছিলেন সেই সাগর শর্মা লখনউয়ের বাসিন্দা। ২৭ বছরের সাগর মহিশূরে একটি গমকলে কাজ করতেন। কোভিডের সময় কাজ হারিয়ে লখনউয়ের বাড়িতে ফিরে যান।
দিল্লি অভিযানে যাওয়ার আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় সে লেখে, ‘জিতে ইয়া হারে, পর কোশিশ তো জরুরি হ্যায়।’ একটা চাকরির জন্যও সে অনেক কোশিশ বা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। চাকরি পায়নি আর এক ধৃত হরিয়ানার নীলম বার্মা, এমএ, বিএম, এমএড করলেও প্রাইমারি স্কুলের চাকরিও জোটেনি যাঁর। বেঙ্গালুরুর ডি মনোরঞ্জন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বাবার সঙ্গে চাষআবাদের কাজ করতেন। চাকরি তাঁরও অধরা। আর এক ধৃত অমল শিন্দে সেনাবাহিনীর চাকরিতে যোগ দিতে চেয়েও পায়নি।

এই তরুণেরা কেউ ছোটবেলাকার বন্ধু নয়, নয় সহপাঠী, নয় এক শহর, এক রাজ্যের বাসিন্দাও। আলাপ ফেসবুকে। সামাজিক মাধ্যমই তাঁদের কাছাকাছি এনে দেয় বটে, আসল যোগসূ্ত্র ক্ষোভ, অসন্তোষ, প্রতিবাদ। আলাপ হলেও তাঁরা আন্দোলনের যে কৌশল নিয়েছিল তা আইনের চোখে অপরাধ, নিন্দনীয়। কিন্তু সরকার ও বিরোধী দলগুলির এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। এই তরুণদের সাজা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের কর্তা, শাসক ও বিরোধী দলের রাজনীতিকদের আত্মসমীক্ষা দরকার কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাণ্ড করতে গেলেন তাঁরা।
ফিরে যাই শুরুর কথায়। যে কথা বলছিলাম, নিরাপত্তা, সুরক্ষা এখন সব দেশেই টপ প্রায়রিটি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার নামে কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে সুরক্ষিত রাখাই অগ্রাধিকার। দুই তরুণের অভিনব প্রতিবাদ সেই সব সদা সুরক্ষিত ব্যক্তিদের দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে তোলা স্বাভাবিক। প্রথমসারির সিংহভাগ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও নিরাপত্তা নিয়েই যত উদ্বেগ।
![]()
ঘটনাচক্রে ক’দিন আগেই জাতীয় অপরাধপঞ্জির ২০২২-এর রিপোর্ট বলছে, ভারতে নাগরিক জীবন কী পরিমাণ বিপন্ন। নারীর উপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা কীভাবে করোনা সংক্রমণের গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অধিকাংশ মিডিয়া সে দিকটি পাশ কাটিয়ে খানিক প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশের মতো করে তুলে ধরে আইন-শৃঙ্খলায় কোন শহর, কোন রাজ্য ভাল, খারাপ কোনগুলি এবং সেখানে শাসন ক্ষমতা কোন দলের হাতে।
সংসদে বহিরাগতের প্রতিবাদের অভিনব ঘটনাটি নিয়েও প্রথমসারির সিংহভাগ সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তার বিপন্নতা নিয়ে চিলচিৎকারে চাপা পড়ে গিয়েছে ওই যুবকদের তোলা বিষয়সমুহ যেগুলি নির্বাচন এলে জ্বলন্ত সমস্যা বলে বিবেচিত হয়। রাহুল গান্ধী শনিবার বলেছেন, সংসদের ১৩ ডিসেম্বরের ওই ঘটনায় নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের, তবে বেকার সমস্যাকেও উপেক্ষা করার নয়।

বাস্তব হল, রাহুল নিজে এবং তাঁর দলই শুধু নয়, গোটা বিরোধী শিবির বেকারদের ক্ষোভ, হতাশা অনুধাবনে ব্যর্থ। শুধু মোদী জমানা নয়, বিগত কয়েক দশক ধরেই ভারতে চাকরির বাজার মন্দা। সরকারি নিয়োগ বলতে গেলে শূন্যে এসে ঠেকেছে। দৃষ্টি ঘোরাতে প্রধানমন্ত্রী ছিঁটেফোটা, রুটিন কিছু নিয়োগকে একত্রিত করে নিয়োগপত্র প্রদানের রোজগার মেলার আয়োজন করছেন। বাস্তবে সরকারি অফিসগুলি ভয়াবহ রকমের তারুণ্যের অভাবে ভুগছে। মোদী জমানার বৈশিষ্ট্য হল, এই সরকারের মতো পাহাড় প্রমাণ প্রতিশ্রুতি দিয়ে অচ্ছে ভারতের বড়ি গেলানোর নজির নেই। মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে, তরুণ-যুব সমাজের মধ্যে যে কারণে হতাশা বাড়ছে। আমি যদিও নিশ্চিত নই, এই তরুণেরা তেমন অবসাদে ভুগছে কিনা।
বছর দুই আগে একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয় দেশের কোটি কোটি শিক্ষিত বেকার ধরেই নিয়েছে তাদের কিছু হবে না। হতাশাগ্রস্থ এই যুবকদের ব্যবসা, ছোট শিল্প করার পুঁজিও নেই।

এ বছরই আমরা চিনকে হারিয়ে জনসংখ্যায় এক নম্বর দেশ হয়েছি। বিপুল জনসংখ্যা আমাদের বোঝা, আবার সম্পদও বটে। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশই ১৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সি। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনশক্তি, যা চিন কেন, অধিকাংশ দেশেরই নেই। এই শ্রম শক্তিকে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা গেলে অর্থনীতিতে যে কোনও অর্থ শক্তিকে আমরা ছাপিয়ে যেতে পারি।
কিন্তু হচ্ছেটা কী? প্রতি বছর গড়ে ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ দেশের শ্রম বাজারে কাজের সন্ধানে প্রবেশ করে। তাদের হাতে হাতে কাজ দেওয়া গেলে ভারত সব ক্ষেত্রেই জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, চিন কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার বোঝা বয়েই আজ অর্থনীতিতে শীর্ষাসন দখলের পথে। চিন এত বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারলে আমরা পারছি না কেন?

পারছি না, কারণ, এক. দেশে সাম্প্রদায়িক এবং জাতিগত বিদ্বেষমুক্ত সম্প্রীতির পরিবেশ নেই। ধর্ম, জাতপাতের দ্বন্দ্বে বিভাজিত জনশক্তি উৎপাদন, বিকাশের পরিপন্থী। দুই. আর্থিক বিকাশের সঠিক পরিকল্পনা, উদ্যোগের অভাব। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, ভারতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে গড়ে ছিল ১০.৫ শতাংশ। ২০১১ থেকে ২০২১-এর মধ্যে তা কমে ৫.৭ শতাংশ হয়েছে। কারণ দেশে শিল্পের পরিকাঠামোর আশানরূপ বিকাশ হয়নি। ফলে বেকারি অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে।
ঘটনা হল এই সবই আমাদের নেতাদেরও জানা। পরিস্থিতি বদলে সরকারকে বাধ্য করার মতো আন্দোলন নেই। মাঠে-ময়দানের রাজনীতি বলতে গেলে মিডিয়ার আর্কাইভসের অংশ হতে চলেছে। যত বিপ্লব সোশ্যাল মিডিয়ায়। অথচ, বেশিদিন আগের কথা নয়, ২০১২-১৩ সালে বর্তমান শাসকেরা সেদিনের শাসক দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে যে জনজাগরণ গড়ে তুলতে পেরেছিলেন, আজকের বিরোধীরা তা করতে ব্যর্থ। সেটাও সংসদে প্রতিবাদের হটকারী পথ বেছে নেওয়ার একটা কারণ হওয়া অসম্ভব নয়।

সাগর, মনোরঞ্জনেরা হয়তো বুঝেছে, তাদের কথা বলার কেউ নেই। ফেসবুক নয়, চলতি পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় ময়দানে ফেস টু ফেস মোকাবিলা। চাই প্রতিবাদের কলরব। সেটার অনুপস্থিতিই তাদের প্রতিবাদের এমন অভিনব, সাহসী এবং ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য করে থাকতে পারে।
শুধু তরুণ সমাজের সমস্যাই নয়, তিন কৃষি বিলের বিরোধিতায় কৃষকদের সফল আন্দোলনও সব দলের জন্যই ছিল চোখ মেলার বার্তা। তা হল, মানুষের অভাব-অভিযোগ, সমস্যার নিরসনে বিরোধী দল উপযুক্ত ভূমিকা নিতে পারছে না। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন, কৃষি বিল থেকে সংরক্ষণের কোটা বৃদ্ধির আন্দোলন থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রতিবাদের মঞ্চ হিসাবে রাজনৈতিক দল বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। কারণ, নেতাদের ভোটের আগে ঘুম ভাঙে। অন্যদিকে, মানুষ নির্যাতন ভোগ করে গোটা পাঁচ বছর।
সাম্প্রতিক অতীতের নাগরিক আন্দোলনগুলি ছিল তেজি, জেদি সংগ্রামের দৃষ্টান্ত। তবে একথাও মনে রাখা জরুরি, উদীয়মান নাগরিক আন্দোলনের চরিত্র অনেকটাই আমফান, ইয়াসের মতো। আচমকাই মুখ ঘুরিয়ে উৎস মুখে ধাওয়া করে। কারণ, আন্দোলনগুলি জনস্বার্থবাহী ইস্যুভিত্তিক। ফলে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগানে গলা মেলানো মানুষের কথা আগামী দিনে কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ ইস্যুতে বিরোধীদের কাছেও বেসুরো ঠেকবে না হলফ করে বলা মুশকিল। কারণ, এখানে কোনও দল বা জোটের নীতি, আদর্শ, নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষার দায় নেই। সেই কারণেই শাসক-বিরোধী নির্বিশেষে সব দলই তলে তলে নাগরিক আন্দোলন নিয়ে শঙ্কিত। কারণ, দুটি। এক, জনস্বার্থ সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলের অপরিহার্যতা দিন দিন কমছে। অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে তাদের গুরুত্ব। দুই, দুর্নীতি, স্বজনপোষন, নীতিহীনতা, দলবাজি, দল ভাঙানোর রাজনীতি, পরিবারতন্ত্র, ইত্যাদি ঘিরে বেশিরভাগ মানুষ রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি বীতশ্রদ্ধ।

মনে পড়ছে, প্রধানমন্ত্রী একবার কথায় কথায় জানিয়েছিলেন, এই বয়সেও তাঁর ডিপ স্লিপ হয়। বালিশে মাথা রাখা মাত্র ঘুমিয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রীর আরও সৌভাগ্য হল, বিরোধী দলগুলি এমন কোনও আন্দোলনের মুখে তাঁকে দাঁড় করাতে পারছে না যাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।