বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, 'এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই।' এর অর্থ হল, যখনই কোনও দুর্যোগ আসে, একদল লোক তা থেকে ফয়দা তোলে। ঘুর্ণিঝড় উমফানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গত ২০ মে বিকালে সুপার সাইক্লোন উমফান আছড়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের দীঘা ও বাংলাদেশের হাতিয়া দ্বীপপুঞ্জের মাঝামাঝি। সাইক্লোন যে পথ দিয়ে গিয়েছে, সেখানে কয়েক কোটি মানুষ বাস করেন। ঝড় আসার আগে অন্তত ৫০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছিল। তাও দুর্যোগে মারা গিয়েছেন ৮৬ জন। গৃহহীন হয়েছেন ১ কোটি মানুষ। পাঁচ-ছ'ঘণ্টার ঝড়ে যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ হওয়া কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকে, নিশ্চয় দুর্গতরা জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাবেন। প্রশ্ন হল, যাঁরা প্রশাসনের নানা পদ আলো করে বসে আছেন, তাঁদের কি আদৌ সদিচ্ছা আছে? নাকি ত্রাণের টাকা চোরাপথে নিজের পকেটে ভরতেই তাঁরা বেশি আগ্রহী।
উমফান ধাক্কা দেওয়ার পরে কেটে গিয়েছে একমাসের বেশি। কিন্তু রোজই দক্ষিণবঙ্গের নানা জায়গা থেকে উঠছে দুর্নীতির অভিযোগ। ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফুটছে গ্রাম বাংলা। করোনা অতিমহামারীর মধ্যেও রোজ খবরের শিরোনামে উঠে আসছে ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি।
উমফানে যাঁরা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাঁদের অনেকে এখনও আছেন ত্রিপল বা প্লাস্টিকের তাঁবুতে। একটু দমকা হাওয়া দিলেই সেই তাঁবু উড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। ত্রাণের জন্য কোটি কোটি টাকা এলেও তাঁদের ভাগ্যে জোটেনি কিছু। এদিকে গ্রামে যে নেতারা দোতলা বাড়ি হাঁকিয়েছেন, তাঁদের পকেটে ঢুকেছে লক্ষ লক্ষ টাকা। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ঝড়ে তাঁদের বাড়ির একটি ইটও খসেনি।
শুধু টাকা নয়, গরিবদের জন্য পাঠানো খাদ্যসামগ্রীও চুরির কথা শোনা যাচ্ছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের চাল-ডাল দেওয়ার জন্য সরকার থেকে যে কুপন দেওয়া হচ্ছে, অভিযোগ উঠেছে তাও ঘুরপথে চলে যাচ্ছে অনেক তৃণমূল নেতার পকেটে। সেই চাল-ডাল বাজারে বেচে টাকা আত্মসাৎ করার ফন্দি তাঁদের।
ত্রাণ বিলিতে অনিয়ম নিয়ে একাধিকবার সতর্ক করে দিয়েছেন রাজ্যপাল। চিন্তায় পড়েছে তৃণমূলও। সামনের বছরেই ভোট। মানুষ দুর্নীতি নিয়ে শাসক দলের একাংশের ওপরে যেভাবে ক্ষেপে উঠছে, তার প্রভাব ভোটের বাক্সে পড়তেও পারে। তাই দলের মধ্যে শুরু হয়েছে শুদ্ধকরণ। নানা স্তরের নেতাকে শো-কজ করা হচ্ছে। অনেক নেতা বলছেন, তাঁরা ভুল করে ত্রাণের টাকা নিজেদের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন, ভুল বুঝতে পেরে ফেরত দিচ্ছেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর ২ ব্লক থেকেই ১০৩ জন ফেরত দিয়েছেন ২০ লক্ষ টাকা। রাজ্যপাল টুইট করে এই ঘটনাকে বলেছেন 'টিপ অব দ্য আইসবার্গ'। অর্থাৎ হিমশৈলের চূড়া মাত্র। অর্থাৎ যে পরিমাণ টাকা চুরি হয়েছে, তার ভগ্নাংশ মাত্র ফেরত আসছে।
টাকা ফেরত দিয়ে অনেকে সাধু সাজতে চাইছেন। চোর যদি চুরির জিনিস ফেরত দেয়, তাহলেই কি সব দোষ মাপ হয়? দুর্গত মানুষ ভাবছেন, এসবই ভণ্ডামি। আই ওয়াশ। চুরি করার পর সাধু সাজার চেষ্টা।
আমাদের রাজ্যের মানুষ জানে, রিলিফের টাকা একটু-আধটু চুরি হয়ই। সব আমলেই হয়। অতীতে কংগ্রেসের আমলে হত। বামফ্রন্ট আমলেও হয়েছে। কিন্তু এখন একাংশ নেতা যেমন বেপরোয়া হয়ে চুরি করছেন, তা আগে কখনও দেখা যায়নি। কেন নেতারা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠলেন? তাঁরা কি আশঙ্কা করছেন, আগামী ভোটের পর ক্ষমতায় নাও থাকতে পারেন? তাই আগেভাগে যত পারেন গুছিয়ে নিচ্ছেন?
এই বেপরোয়া মনোভাবে দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ২০১৭ সালে তৃণমূলের কোর কমিটির বৈঠকে এক বিধায়ক এ ব্যাপারে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন দলকে। তিনি বৈঠকে নেত্রীর সামনেই বলেছিলেন, পঞ্চায়েত স্তরের কিছু নেতাকে দেখে মনে হচ্ছে। কালই সরকার চলে যাবে। তাই আজ রাতের মধ্যেই লুটেপুটে নিতে হবে। দলের কর্তাব্যক্তিরা সেকথা শুনে খুব আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন ওই বিধায়ক।
তারপরে কেটে গিয়েছে তিনটি বছর। মনে হয়, সেদিন যে নেতারা প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁরাও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, এমন লাগামছাড়া দুর্নীতি আগে কেউ দেখেনি।
একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। এযুগে দেশসেবার মনোভাব নিয়ে রাজনীতি করতে আসেন খুব কম মানুষ। বেশিরভাগের কাছেই রাজনীতি একটা পেশা। লাভজনক পেশা। অনেকের কাছেই রাজনীতি মানে এখন সরকারি টাকা হাতানো এবং তোলাবাজির মাধ্যম। সুতরাং ক্ষমতায় থাকলে তাঁরা চুরি করেন। যদি ভাবেন আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবেন না, তাহলে আরও বেশি করে চুরি করেন। দলনেতা বা নেত্রীর ধমক বা শো-কজ তাঁদের থামাতে ব্যর্থ হয়।
ভোটে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা করে নেতারা যত চুরি করবেন, তত মানুষ তাঁদের ওপরে ক্ষেপে উঠবে। ভোটে শাসক দলের গোহারা হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। মনে হয় একথা নেত্রীও বুঝছেন। কিন্তু ব্যাপারটা তাঁরও আর নিয়ন্ত্রণে নেই।