আইনে একটা কথা আছে, 'জাস্টিস ডিলেড, জাস্টিস ডিনায়েড'। অর্থাৎ, বিচার করতে যদি দেরি হয়, তাহলে মানুষকে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। আমাদের দেশে কোনও কোনও ভিআইপি বন্দির ক্ষেত্রে বিচারের প্রক্রিয়া কাজ করে খুব দ্রুত। কিন্তু বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই তা করে না। এটাই দুঃখের ব্যাপার।
রিপাবলিক টিভির এডিটর ইন চিফ অর্ণব গোস্বামী গ্রেফতার হয়েছিলেন ৪ নভেম্বর। এই গ্রেফতারির সঙ্গে সাংবাদিকতার কোনও সম্পর্ক নেই। বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ বা কুলদীপ নায়ারের মতো সাংবাদিক যেমন এমার্জেন্সির সময় ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে লেখালিখি করে বন্দি হয়েছিলেন, অর্ণবের বেলায় তা হয়নি। অভিযোগ, রিপাবলিক টিভির কর্ণধার এক ইন্টিরিয়ার ডিজাইনারের প্রাপ্য টাকা ফাঁকি দিয়েছিলেন। তাতে সেই ডিজাইনারের ব্যবসা নষ্ট হয়ে যায়। হতাশায় তিনি ও তাঁর মা আত্মহত্যা করেন। সুইসাইড নোটে অর্ণবের নাম ছিল।
অর্ণব গ্রেফতার হওয়ার পরদিনই তাঁকে জেল হেফাজতে পাঠান আলিবাগ কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট। এই ধরনের মামলায় সাধারণত বন্দিকে ১৪ দিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাতে পুলিশের তদন্তে সুবিধা হয়। কিন্তু অর্ণবের বেলায় তা হয়নি।
১১ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট অর্ণবের জামিনের আবেদন শোনে। তাঁকে ৫০ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে জামিন দেওয়া হয়। সেদিনই রিপাবলিক টিভির কর্তা জেল থেকে মুক্তি পান।
অন্যান্য বন্দি কিন্তু এত তাড়াতাড়ি মুক্তি পায় না।
একটি সর্বভারতীয় দৈনিকের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ভারতের জেলা ও তালুক কোর্টগুলিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬০ লক্ষ। ২০১৯ সালের শেষে ভারতে ১ লক্ষ বিচারাধীন বন্দি এক বছরের বেশি জেল খাটছিলেন। আইনের ভাষায়, যতক্ষণ না পর্যন্ত কারও অপরাধ প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ সে নির্দোষ। বিচারাধীন বন্দি মানে সে অপরাধী নয়। তাদের অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যাবে, তারা নির্দোষ ছিল।
একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে বন্দিদের ৬৮ শতাংশই বিচারাধীন। তাঁদের অনেকের বিচার শুরুই হয়নি। অথচ তাঁরা বছরের পর বছর বন্দি হয়ে আছেন। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বিনা বিচারে বন্দিদের ৬৫ শতাংশ তফসিলী জাতি, উপজাতি এবং অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণিভুক্ত মানুষ। তাঁদের অনেকেই অত্যন্ত দরিদ্র। লেখাপড়া বেশিদূর করতে পারেননি। জামিন নেওয়ার মতো টাকাও তাঁদের নেই।
এছাড়া আরও একদল বন্দি আছেন যাঁদের সরকার বলেছে দেশদ্রোহী। তাঁদের অন্যতম হলেন কেরলের সিদ্দিক কাপ্পান। তিনি ৪০ দিনের বেশি জেলে আছেন। তাঁরও পেশা সাংবাদিকতা। তবে তিনি অর্ণবের মতো বিখ্যাত নন। ভিআইপি তো ননই। তিনি হাথরাসে গণধর্ষণের ঘটনা কভার করতে যাচ্ছিলেন। পথে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা আছে। অভিযোগ, তিনি এমন একটি সংগঠনের সমর্থক যারা নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেছিল।
কেউ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেই তাকে দেশদ্রোহী বলা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে বহুকাল ধরে এমনটা বলা হয়ে থাকে। জরুরি অবস্থার সময় সমাজতন্ত্রী নেতা জর্জ ফার্নান্ডেজকে জঙ্গি বলে ইন্দিরা সরকার গ্রেফতার করেছিল। জর্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সাংঘাতিক। তিনি নাকি ডিনামাইট দিয়ে সরকারি অফিস ও রেললাইন উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
গত শতকের ছ'য়ের দশকে যুদ্ধ বাধলেই কমিউনিস্ট নেতাদের দেশদ্রোহী বলে জেলে পোরা হত। "৬২ সালের চিনযুদ্ধ বা '৬৫ সালের পাকিস্তান যুদ্ধের সময় জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত ও আরও অনেককে বন্দি করা হয়েছিল।
কাউকে দেশদ্রোহিতার মামলা দিলে তাকে দীর্ঘকাল জেলে পুরে রাখতে সুবিধা হয়। তার নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যায়। সেজন্য সরকার যত্রতত্র প্রতিবাদীদের দেশদ্রোহী বলে বন্দি করে। এমনটা আগেও হত, এখনও হচ্ছে।
বর্তমানে ভীমা কোরেগাঁও মামলায় বেশ কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তি বন্দি আছেন। তাঁদের বিরুদ্ধেও দেওয়া হয়েছে ইউএপিএ। বন্দিদের মধ্যে জেসুইট পাদরি স্ট্যান স্বামীর বয়স ৮৩। তিনি পারকিনসনস রোগে ভুগছেন। তিনি হাতে গ্লাস, মগ বা কাপ ধরতে পারেন না। গত ৬ নভেম্বর আদালতে আবেদন করেছিলেন, তাঁকে জল ও অন্যান্য তরল গ্রহণ করার জন্য স্ট্র বা সিপার দেওয়া হোক। ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি তাঁকে গ্রেফতার করার সময় স্ট্র ও সিপার কেড়ে নিয়েছিল। কোর্ট স্ট্যান স্বামীর আবেদনের ওপরে বক্তব্য জানানোর জন্য এনআইএ-কে সময় দিয়েছে ২০ দিন।
কোনও বন্দির মুক্তির জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সুদ্ধু উতলা হয়ে উঠবেন, আবার কোনও বন্দির প্রতি ন্যূনতম মানবিকতাও দেখানো হবে না, এটা কেমন কথা? অর্ণব রোজ সন্ধ্যায় প্রাইম টাইমে মোদী সরকারের হয়ে গলা ফাটান বলেই কি তাঁকে মুক্ত করার জন্য এত তৎপরতা? তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর বিজেপি নেতারা হইচই জুড়েছিলেন, গণতন্ত্র বিপন্ন। শুধু ধনী আর প্রভাবশালীরা গ্রেফতার হলেই কি গণতন্ত্র বিপন্ন হয়? আইন কি কাউকে ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দিতে পারে?
অর্ণব গোস্বামী মুক্তি পেয়েছেন ভাল কথা, কিন্তু আর কেউ যাতে বিনা বিচারে দীর্ঘকাল বন্দি না হয়ে থাকেন, তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সেজন্য দরকারে অতুন আইন করা হোক। প্রচলিত আইন সংস্কার করা হোক। যেসব দেশে একনায়কত্ব চলে, সেখানে গরিব মানুষ বা প্রতিবাদীদের দীর্ঘকাল বিনা বিচারে বন্দি রাখা হয়। কিন্তু ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে এমন হওয়া উচিত নয়।