
শেষ আপডেট: 11 July 2023 11:05
একটা ভোটে যতরকম অনাচার হওয়া সম্ভব, সবই এবারের পঞ্চায়েত ভোটে (WB Panchayat Election 2023) হয়েছে। বুথ জ্যাম, ছাপ্পা, ব্যালট ছিনতাই, ব্যালট বাক্স পুকুরে ফেলে দেওয়া, বোমাবাজি, কিছুই বাদ যায়নি। যে যেখানে পেরেছে গা জোয়ারি করেছে। তার পরিণামে ভোটপর্বে প্রায় ৪৭-৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মঙ্গলবার গণনা শুরু হওয়ার পরেও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাও বিশেষ স্বস্তিদায়ক নয়। বিরোধী এজেন্টদের মারধর, শাসানি, অপহরণ, পথ অবরোধ, থানা ঘেরাও, অবস্থান, বোমাবাজি ইত্যাদি সকাল থেকেই শুরু হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধেও ভুরি ভুরি অভিযোগ উঠছে। সাধারণ মানুষ এই সন্ত্রাস চান না। তাঁরা চান, এই হিংসার অবসান হোক। আর কোনও মায়ের কোল যেন খালি না হয়।

পঞ্চায়েত নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল ৮ জুন। তার পর থেকেই শুরু হয় হানাহানি। ৮ জুন থেকে ৭ জুলাইয়ের মধ্যে ১৯ জন প্রাণ হারান। ৮ জুলাই, ভোটের দিন ১৮ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১০ জন তৃণমূল সমর্থক ছিলেন। সিপিএম ও বিজেপির দু'জন করে কর্মী খুন হয়েছেন। কংগ্রেসের তিন সমর্থকের প্রাণ গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা সেদিনই বলেছিলেন, 'আমার দায়িত্ব ভোটের ব্যবস্থা করা। সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার পরেও কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারবে না কে কাকে গুলি করে দেবে, কাকে মেরে দেবে।' অর্থাৎ হিংসা যে হবে না, এমন কোনও গ্যারান্টি দিতে পারছেন না নির্বাচন কমিশনার।
ভোটের পরে রাজ্যের মানুষ সত্যিই খুব অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। সোমবার ৬৯৬টি বুথে পুনর্নির্বাচন হয়। তাতেও সব দল সাধ্যমতো গোলমাল করেছে। বুথ দখল, ছাপ্পা, বোমাবাজি, সবই হয়েছে। শনিবার আহত হয়ে কলকাতার এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ধমানের এক বাসিন্দা। তিনি সোমবার মারা গিয়েছেন। সিপিএম ও তৃণমূল উভয়েই দাবি করেছে মৃত ব্যক্তি তাদের সমর্থক। মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তিও ভোটের সংঘর্ষে আহত হয়ে কলকাতার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তিনি মারা গিয়েছেন রবিবার রাতে।
অনেকে আশা করেছিলেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকলে কেউ গোলমাল করতে পারবে না। মোট ৮২২ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী চাওয়া হয়েছিল। ভোটের দিন পর্যন্ত এসেছে ৬৭৮ কোম্পানি। রাজ্যে ভোট হয়েছে মোট ৬১ হাজার ৬৩৬ টি বুথে। তার এক চতুর্থাংশ বুথেও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা যায়নি।
মঙ্গলবার মোট ৩৩৯টি গণনা কেন্দ্রে গণনা চলছে। প্রতি গণনা কেন্দ্রে ৭২ থেকে ৮০ জন কেন্দ্রীয় নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন। ক্লোজড সার্কিট টিভির নজরদারিও আছে। কিন্তু তাতেও হিংসা আটকানো যাচ্ছে না।
আসলে শুধু পুলিশ বা কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে শান্তিরক্ষা করা যায় না। জওয়ানরা না হয় বুথে বা গণনাকেন্দ্রে নিরাপত্তা দিলেন, কিন্তু তার বাইরে গোলমাল হলে কে ঠেকাবে। গণতন্ত্রে জনতার রায়ই শেষ কথা বলে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উচিত জনাদেশকে মাথা পেতে নেওয়া। কিন্তু আমাদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব আছে। তাঁরা জনাদেশ নয়, পেশীশক্তির জোরে জিততে চান। প্রত্যেক দলই যদি গন্ডগোল করার সুযোগ খোঁজে তাহলে হাজার পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়েও হিংসা ঠেকানো যাবে না।
রাজনীতিকদের শুভবুদ্ধিই একমাত্র হিংসা ঠেকাতে পারে। যদিও এই শুভবুদ্ধির উদয় তাঁদের মধ্যে কবে হবে বলা শক্ত। এবারের ভোটে অনেক জায়গায় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুষ্কৃতীদের প্রতিরোধ করেছেন। হিংসা যদি না থামে, তাহলে ওই ধরনের প্রতিরোধও বাড়বে।