কী খবর? কী বলছে অক্সফোর্ড?
সোমবার এই প্রশ্নটা ঘোরাফেরা করছিল সবার মুখে মুখে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা করোনার ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছেন বছরের গোড়া থেকে। মানুষের শরীরে তার কী প্রভাব পড়ে, তা জানার জন্যই ছিল প্রতীক্ষা। আগেই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, সোমবার 'দ্য ল্যানসেট' পত্রিকা জানাবে, কী ফল হল অক্সফোর্ডের পরীক্ষায়। সেজন্যই সবাই অপেক্ষা করছিল। দিনের শেষে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ জানা গেল খবর। পরীক্ষার রেজাল্ট সন্তোষজনক। বিজ্ঞানীরা যেমন ভেবেছিলেন, তেমনটিই হচ্ছে। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে অ্যান্টিবডি আর টি সেল তৈরি হচ্ছে মানুষের শরীরে। শরীরে করোনাভাইরাস ঢুকলে প্রথমে অ্যান্টিবডি তার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। টি সেল দীর্ঘমেয়াদে সাহায্য করবে শরীরের প্রতিরোধ শক্তিকে। তার কাজ অনেকটা পাহারাদারের মতো। শরীরে করোনাভাইরাস ঢুকলেই সে সতর্ক করে দেবে ইমিউন সিস্টেমকে।
এখনও পরীক্ষা শেষ হয়নি। আরও হাজার হাজার মানুষের শরীরে ওই প্রতিষেধক প্রয়োগ করা হবে। আগে নিশ্চিন্ত হতে হবে, ওষুধটি ঠিকঠাক কাজ করছে। মারাত্মক কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। তবে সাধারণ মানুষের দেহে প্রয়োগ করার ছাড়পত্র মিলবে।
আমেরিকার জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী ২১ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বে ১ কোটি ৪৮ লক্ষ ৮৮ হাজার ৫২৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা ৬ লক্ষ ১৪ হাজার ৯৮।
অনেকে আশা করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিস্তেজ হয়ে আসবে এই ভাইরাস। কেউ ভেবেছিলেন প্রখর গ্রীষ্মে হ্রাস পাবে সংক্রমণ। বাস্তবে তা হয়নি। এদিকে প্যানডেমিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে আছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি। আইএমএফ বলছে, ভ্যাকসিন না বেরোলে অর্থনীতিকে পুরোমাত্রায় চালু করা যাবে না। সোশ্যাল ডিসট্যান্স বজায় রেখে, মনে আতঙ্ক নিয়ে কি কলকারখানা চালানো যায়?
আপাতত ভ্যাকসিন তৈরির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে সারা দুনিয়া। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে গবেষণার পিছনে। অক্সফোর্ড বাদে আরও কয়েকটি সংস্থা প্রতিষেধক তৈরিতে অগ্রগতি দেখিয়েছে। তাদের মধ্যে আছে চিনের উহান ইনস্টিটিউট, রাশিয়ার সেচনেভ ইউনিভার্সিটি, আমেরিকার কোম্পানি মডার্না, নোভাভ্যাক্স, জার্মানির বায়োএনটেক, ভারতের জাইদাস ক্যাডিলা ও ভারত বায়োটেক।
চেষ্টা তো অনেকে করছে, কিন্তু কবে বাজারে আসবে ভ্যাকসিন?
এইটা লাখ টাকার প্রশ্ন। কেউ সদুত্তর দিতে পারছে না। যতদূর আভাস পাওয়া যাচ্ছে, এবছরের শেষে অথবা আগামী বছরের গোড়ায় আসতে পারে প্রতিষেধক। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা যে ভ্যাকসিন তৈরি করবেন, তা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করবে অ্যাস্ট্রোজেনেকা নামে এক সংস্থা। তার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ১০০ কোটি ডোজ বানাবে ভারতের সংস্থা সেরাম ইনস্টিটিউট। হয়তো অক্সফোর্ডের প্রতিষেধকই বাজারে আসবে প্রথমে। কিন্তু তার কিছুদিনের মধ্যেই এসে পড়বে আরও একাধিক কোম্পানির তৈরি ভ্যাকসিন।
বাজারে ভ্যাকসিন এলেই সমস্যা শেষ হয়ে যাবে না। অতিমহামারীকে পরাস্ত করতে হলে সকলের কাছে ঠিকমতো সেই প্রতিষেধক পৌঁছানো জরুরি। করোনাভাইরাস ধনীদরিদ্র বাছবিচার করে না। ধনীরা তাই দ্রুত প্রতিষেধক পাওয়ার জন্য মোটা টাকা দিতে রাজি হবে। রাজনীতিক, বড় আমলা ও অন্যান্য প্রভাবশালী লোকজনও যে কোনও মূল্যে ওই ওষুধ পেতে চাইবে সকলের আগে। তাদের প্রচেষ্টা যদি সফল হয়, তাহলে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভ্যাকসিন পেতে লাগবে অনেক সময়।
এমনটা যাতে না হয়, সেজন্য উদ্যোগী হতে হবে প্রশাসনকে। ঠিক সময়ে যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যাদের কো-মরবিডিটি আছে, অর্থাৎ যারা আগেই কোনও প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় করোনাভাইরাস। সুতরাং এই শ্রেণির মানুষকে যাতে আগে টিকা দেওয়া হয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নির্দিষ্ট মনিটরিং সিস্টেম দরকার। সরকারকে সেই নজরদারির ব্যবস্থা বানাতে হবে।
সবকিছু বাজার অর্থনীতির ওপরে ছেড়ে দিলে ফল ভাল হয় না। করোনাভ্যাকসিনের বিপণন যদি বাজারের নিয়মে হয়, তাহলে যে বেশি টাকা খরচ করতে পারবে, তাকে আগে দেওয়া হবে টিকা। এই অমানবিক ব্যাপারটা যাতে না ঘটে সেজন্য সরকারকে আগে থেকেই সক্রিয় হতে হবে।