
শেষ আপডেট: 16 May 2023 11:12
ইট-পাথরের স্তূপের মধ্যে পড়েছিল একটি প্ল্যাস্টিকের বস্তা। তা দেখে সন্দেহ হয় এক মহিলার। পরে পুলিশ এসে বস্তার মধ্যে থেকে হবে উদ্ধার করে একজনের দেহ। মৃতের বয়স ১২। মধ্যপ্রদেশের এক গ্রামে সে খুন হয়।
পুলিশ প্রথমে ভেবেছিল, এটা পেশাদার অপরাধীদের কাজ। পরে জানা যায়, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তিন নাবালক। তাদের একজনের বয়স মাত্র ১১। পরিকল্পনা করে তারা ছেলেটিকে ফাঁকা জায়গায় ডেকে আনে। তিনজন প্রথমে সাইকেলের চেন দিয়ে ছেলেটির শ্বাসরোধ করে। তারপর পাথর দিয়ে থেঁতলে দেয় মাথা। শেষে মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য গলার নলি কেটে দেয়।

বাচ্চাদের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি চিরকালই হয়। কিন্তু এমন খুনখারাপি আগে হত না (Juvenile Crime)। ইদানীং এই ধরনের অপরাধ বাড়ছে। ন্যাশনাল ক্রাইমস রেকর্ডস ব্যুরোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে নাবালকরা ১ লক্ষ ৪৯ হাজার অপরাধ করেছে। ২০২০ সালে ওই সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ২৮ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে শিশুদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে ১৬.২ শতাংশ। ২০২১ সালে প্রতি ১ লক্ষ নাবালকের মধ্যে ৩৩.৬ জনের বিরুদ্ধে নানা অপরাধজনক কাজের অভিযোগে মামলা হয়েছিল। ২০২০ সালে ওই সংখ্যা ছিল ২৮.৯।
এনসিআরবি-র তথ্য বলছে, নাবালকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপহরণ ও যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধে যুক্ত (Juvenile Crime)। কাউকে অপহরণ করতে গেলে আগে থেকে ছক কষতে হয়। সুতরাং নাবালকরা যে সবসময় রাগের মাথায় অপরাধ করে তা নয়। বহু ক্ষেত্রে তারা পেশাদার অপরাধীদের মতো ঠান্ডা মাথায় অপরাধ করে।
শুধু ভারতে নয়, বিশ্ব জুড়েই নাবালক অপরাধীরা বাড়ছে। গত বছর আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় এক হাইস্কুলে বন্দুকবাজরা হানা দেয়। গুলিতে অনেকে হতাহত হয়। বন্দুকবাজদের মধ্যে তিনজন ছিল নাবালক। গত বছরেই লস এঞ্জেলিসে এক নাবালক অপরাধী তার বাবার সঙ্গে ডাকাতি করতে গিয়েছিল। তখন তার গুলিতে এক জনপ্রিয় গায়ক নিহত হন। ২০২০ সালে আমেরিকায় মোট ৪ লক্ষ ২৪ হাজার ৩০০ নাবালক অপরাধী গ্রেফতার হয়। তাদের মধ্যে আট শতাংশ হিংসাত্মক ঘটনায় যুক্ত ছিল। ওই বছর খুন হয় ১৭৮০ জন নাবালক।
পুলিশের কাছে পেশাদার অপরাধীদের তালিকা থাকে। কোনও অপরাধ ঘটলে পুলিশ প্রথমে তাদের সন্দেহ করে। দাগী অপরাধীদের জেরা করে অনেক অপরাধের কিনারা করা যায়। কিন্তু ছোট ছেলেরা যখন অপরাধ করে, পুলিশের পক্ষে তাদের ধরা মুশকিল হয়ে ওঠে। শিশু অপরাধীদের ক্ষেত্রে সাধারণত অতীতে কোনও অপরাধের রেকর্ড থাকে না (Juvenile Crime)। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা পাড়ায় শান্তশিষ্ট ছেলে বলে পরিচিত, তারা অপহরণ, খুনজখম বা যৌন নির্যাতনের মতো মারাত্মক অপরাধে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু সহজে কেউ তাদের সন্দেহ করতে পারে না।
নাবালক অপরাধীদের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সারা বিশ্বেই সমাজতাত্ত্বিকরা মাথা ঘামাচ্ছেন। সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, অসুখী পরিবারের শিশুদের মধ্যে অপরাধ করার ঝোঁক বেশি। সামাজিক অবক্ষয়ও শিশুদের খারাপ পথে ঠেলে দিতে পারে। যে সমাজে মানুষে-মানুষে সহমর্মিতা নেই, কেউ বিপদে পড়লে প্রতিবেশীরা তার পাশে দাঁড়ায় না, সেখানে শিশুরা হিংস্র, বিচার-বিবেচনাবোধহীন হয়ে ওঠে। অপরাধপ্রবণ এলাকায় যে শিশুরা বাস করে, তাদের মধ্যে অনেক সময় অপরাধের প্রতি ঝোঁক দেখা যায়। খারাপ বন্ধুবান্ধবও নাবালকদের অপরাধের পথে টেনে নিয়ে যেতে পারে।
এখানে মিডিয়ারও বড় ভূমিকা আছে। সিনেমায় অনেক সময় অপরাধীদের হিরো হিসাবে দেখানো হয়। অপরাধজনক কাজকে দেখানো হয় বীরত্ব হিসাবে। শিশুদের বিচারবুদ্ধি কম। তারা প্রায়শই সিনেমার সঙ্গে বাস্তবকে গুলিয়ে ফেলে। ক্রাইম থ্রিলার দেখে তারা অনেক সময় ভাবে, অপরাধীদের জীবন রোমাঞ্চকর। কোনও দুঃসাহসিক অপরাধ করলে সমাজে হিরো হওয়া যাবে।
দীর্ঘদিন ধরেই দাবি উঠছে, নাবালক অপরাধীদের (Juvenile Crime) বিরুদ্ধে আইন আরও কড়া হোক। বিশেষত দিল্লিতে নির্ভয়ার ঘটনার পরে দেশ জুড়ে অনেকেই ওই দাবি তুলতে শুরু করেছিলেন। কারণ, জানা গিয়েছিল, নির্ভয়াকে ধর্ষণ ও নৃশংস খুনের ঘটনায় এক নাবালক জড়িত। কিন্তু বয়স কম হওয়ার দরুণ সে খুব বেশি শাস্তি পাবে না।
কড়া আইন নিশ্চয় দরকার কিন্তু শুধু তা দিয়ে নাবালকদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা কমানো যাবে না। যে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য যত বেশি, সেখানে অপরাধপ্রবণতাও তত ব্যাপক। নাবালকরা অধিকাংশ সময় দারিদ্রের কারণেই চুরি-ডাকাতিতে যুক্ত হয়। নাগরিকদের মধ্যে যদি আর্থিক স্বচ্ছলতা আসে, তাহলে সবরকম অপরাধই খানিকটা কমবে। নাবালক অপরাধীর সংখ্যাও কমবে। দ্বিতীয়ত, সরকারকে লক্ষ রাখতে হবে, কোনও শিশু সমাজে বা পরিবারে অবহেলার শিকার হচ্ছে কিনা। কারণ এই ধরনের শিশুরা অনেক সময় হিংস্র হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, যে সমাজে জাতপাত বা সাম্প্রদায়িক বিভেদ বেশি, সেখানেও শিশুরা বেশি অপরাধপ্রবণ হয়।
সুতরাং শিশুরা যাতে সুকুমার প্রবৃত্তিগুলি হারিয়ে না ফেলে সেজন্য সমাজে সহনশীলতা, বহুত্ববাদ ইত্যাদি গুণগুলির চর্চা হওয়া প্রয়োজন। আর প্রয়োজন খেলাধুলোর পর্যাপ্ত আয়োজন। ফুটবল, ক্রিকেট তো আছেই দলবদ্ধ হয়ে মাঠে গিয়ে খেলার ব্যবস্থা ফেরাতেই হবে। খেলাধুলো ছোটদের মনকে গঠনমূলক ও ইতিবাচক করে।
আমূলের বাচ্চা মেয়েটির বয়স ৫৭, তার কথায় মাখনের সঙ্গে মিশে যায় রাজনীতি, সিনেমা থেকে খেলা