আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের ওপরে অত্যাচারের কথা শুনলেই ছোটখাটো চেহারার এক মহিলার কথা মনে পড়ে। তিনি হলেন হ্যারিয়েট বিচার স্টো। তাঁর কলমে যেমন ছিল জোর তেমন মন ছিল কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের প্রতি দয়ায় পরিপূর্ণ। তিনি লিখেছিলেন ‘আঙ্কল টমস কেবিন’, যা বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত উপন্যাসগুলির অন্যতম। তাতে আছে টম চাচা নামে এক মধ্যবয়সী ভালমানুষ কৃষ্ণাঙ্গ দাসের কথা। তিনি শ্বেতাঙ্গ দাস ব্যবসায়ীদের হাতে অবর্ণনীয় দুঃখ ভোগ করেছিলেন। সেই উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরে কেটে গিয়েছে দেড়শ বছরের বেশি। এখনও কি কৃষ্ণাঙ্গদের দুর্দশা খুব একটা কমেছে? জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর খবর শুনলে তেমন মনে হয় না।
জর্জ পেরি ফ্লয়েড ছিলেন টম চাচার মতোই মধ্যবয়স্ক। মিনিয়াপোলিসে থাকতেন। ২৫ মে সন্ধ্যায় দোকান থেকে ২০ ডলার দিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কিনেছিলেন। দোকানের দুই কর্মচারীর মনে হয়েছিল নোটটা জাল। তাঁরা পুলিশে খবর দেন। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ উপস্থিত হয়। ফ্লয়েডকে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। অভিযোগ, ফ্লয়েড তাদের হাত ছাড়িয়ে পালাতে চেষ্টা করেন। যদিও সিসিটিভির ফুটেজে এই অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ডেরেক শভিন নামে এক পুলিশ অফিসার তাঁকে মাটিতে ফেলে হাঁটু দিয়ে ঘাড়ের ওপর চাপ দিয়েছিলেন প্রায় ন’মিনিট। ভিডিও ফুটেজে শোনা গিয়েছে, ফ্লয়েড চিৎকার করছেন, ‘আই কান্ট ব্রিদ’, ‘প্লিজ’, ‘ডোন্ট কিল মি’, ‘মাম্মা’...। শভিনের মুখ ভাবলেশহীন। একটা মানুষ মৃত্যুযন্ত্রণায় চিৎকার করছে, তাতে কোনও ভাবান্তর নেই তাঁর।
ফ্লয়েডের মৃত্যুর পরে মিনিয়াপোলিসে শুরু হয় বিক্ষোভ। তারপর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকার অন্যান্য শহরে। অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চলতে থাকে। আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল লাঠিসোঁটা, রড। কয়েকটি জায়গায় অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকবাজরা আড়াল থেকে বিক্ষোভ মিছিলের ওপরে গুলি চালায়। কয়েকজন হতাহত হন।
তিন দিন ধরে এই অশান্তি চলার পরে মুখ খোলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৯ মে তিনি টুইটারে আন্দোলনকারীদের গুন্ডা বলে চিহ্নিত করেন। মিনিয়াপোলিসের মেয়রের নিন্দা করে বলেন, তিনি হাঙ্গামার সময় কড়া ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর এইসব মন্তব্যে আগুনে ঘৃতাহুতি হয়। বিক্ষোভ বাড়তে বাড়তে চলে আসে হোয়াইট হাউসের সামনে। ট্রাম্প বাঙ্কারে লুকিয়ে পড়েন। সেখান থেকে হুমকি দিতে থাকেন, যারা রাস্তায় হুজ্জতি করছে, কেউ ছাড় পাবে না। আমি মিলিটারি নামাব। তারা সবাইকে ঠান্ডা করে দেবে।
প্রেসিডেন্ট আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসলে এতদিনে ব্যাপারটা হয়তো মিটে যেত। কিন্তু তিনি গোঁয়ারের মতো হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুললেন।
মার্কিন প্রশাসন প্রথম থেকেই গণবিক্ষোভের মোকাবিলায় খুব বাজে অবস্থান নিয়েছে। অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারকে ফ্লয়েডের মৃত্যুর পরেই গ্রেফতার করা উচিত ছিল। তাহলে এত হাঙ্গামা হত না।
অপরাধী পুলিশ অফিসারকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে ২৯ মে। ফ্লয়েডের মৃত্যুর তিন দিন পরে। ততদিনে দেশ জুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। বড় বড় শহরগুলিতে জারি হয়েছে কার্ফু। শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের পুলিশ বলছে, ঘরের ভেতরে থাকুন। বাইরে বেরোলেই বিপদে পড়বেন।
কী এমন অপরাধ করেছিলেন ফ্লয়েড? তিনি যদি জাল নোট দিয়েই থাকেন, তার জন্য কয়েকমাস কারাদণ্ড হত। কিন্তু সেই অপরাধে তাঁকে মেরে ফেলা হল কেন? বিনা বিচারে মানুষ খুনের অধিকারই বা পুলিশ পেল কোথা থেকে?
ফ্লয়েড কৃষ্ণাঙ্গ বলেই পুলিশ অত সাহস পেয়েছে। আমেরিকার পুলিশ-প্রশাসন বরাবরই কৃষ্ণাঙ্গদের সন্দেহের চোখে দেখে। ভাবে, তারা অপরাধপ্রবণ। তারা মরলে কিছু যায় আসে না। এজন্যই কয়েক বছর আগে ব্ল্যাক আমেরিকানরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। তাঁদের স্লোগান ছিল, ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’। কৃষ্ণাঙ্গদেরও জীবনের দাম আছে।
আমেরিকার সাধারণ শ্বেতাঙ্গ জনতার এক বড় অংশের মধ্যেও আছে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ঘৃণার মনোভাব। প্রায় দু’দশক আগে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক মাইকেল মুর। ওই সময় তাঁর ‘স্টুপিড হোয়াইটমেন’ নামে একটি বই খুব জনপ্রিয় হয়। তাতে মাইকেল মুর লিখেছিলেন, আমেরিকার শ্বেতাঙ্গরা যখনই কোনও অপরাধের কথা শোনে, ধরে নেয় কৃষ্ণাঙ্গরাই তার পিছনে আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণেও একজন সাধারণ শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানের মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে। করোনা সংকট সামলাতে এমনিতেই তিনি নাজেহাল। তার ওপরে দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে হিংস্র বিক্ষোভ। তিনি মাথা ঠিক রাখতে পারছেন না।
আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ দাসেরা মুক্তি পাওয়ার পরে কেটে গিয়েছে প্রায় দেড়শ বছর। এখনও তাদের বেশিরভাগ বাস করে বস্তিতে। সেগুলোকে বলে ঘেটো। শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গরাই থাকে সেখানে। তাদের জীবনে লেখাপড়া শেখার সুযোগ কম। অনেক শ্বেতাঙ্গ ব্যবসায়ী তাদের চাকরি দিতে চায় না। পেটের দায়ে অনেকে নানা অসামাজিক কাজকর্মে লিপ্ত হয়। একজন কৃষ্ণাঙ্গ দেশের প্রেসিডেন্ট হলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতিটা বদলায় না।
ব্ল্যাক আমেরিকানদের অবস্থার উন্নতির জন্য অতীতে বড় বড় আন্দোলন হয়েছে। তাদের মধ্যে থেকে মার্টিন লুথার কিং এবং ম্যালকম এক্সের মতো বড় বড় নেতার জন্ম হয়েছে। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা প্রতিটি আন্দোলনকে দমন করেছে নিষ্ঠুরভাবে। নেতাদের খুন করেছে।
সমাজের সব ব্যাপারে পিছিয়ে থাকতে থাকতে কৃষ্ণাঙ্গদের মনে জন্ম নিয়েছে ক্ষোভ, অভিমান। মাঝে মাঝে এক একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যেমন এখন হচ্ছে।
আমেরিকা বিশ্ব জুড়ে সবাইকে গণতন্ত্র শিখিয়ে বেড়ায়। কিন্তু তার নিজের সমাজের একাংশেই জমে আছে বঞ্চনার অন্ধকার। সেই অন্ধকার যতদিন না দূর হবে, ততদিন মাঝে মাঝেই কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠবে সারা দেশ।