কথায় আছে, কারও সর্বনাশ, কারও পৌষমাস। সর্বনাশ এখন সারা বিশ্বের। অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজ্ঞানীরা নাস্তানাবুদ। প্রাণ যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের। এই অবস্থায় যদি কেউ মানুষের জীবনের বিনিময়ে ফয়দা তোলার চেষ্টায় থাকে, তার কী শাস্তি হওয়া উচিত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, করোনাকে ঠেকাতে গেলে উপায় একটাই। টেস্ট টেস্ট টেস্ট। যত বেশি সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করা যায়, ততই ভাল। কারও মধ্যে কোভিড ১৯ এর লক্ষণ দেখা গেলেই তাকে পাঠাতে হবে আইসোলেশনে। তবে ভাঙবে সংক্রমণের শৃঙ্খল। যতদিন না ভ্যাকসিন আবিষ্কার হচ্ছে, ততদিন অতিমহামারী থেকে বাঁচার অন্য কোনও উপায় নেই।
হু-এর পরামর্শ মেনে চিন থেকে করোনাভাইরাস টেস্ট কিট আনতে দিয়েছিল ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ। ধরে নেওয়া হয়েছিল, চিনের যেহেতু ওই রোগ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা আছে, তাই তাদের তৈরি কিটগুলি হবে উঁচুমানের। গুয়াংঝাউ ওন্ডফো বায়োটেক ও ঝুহাই লিভজন ডায়গনিস্টিক নামে দু'টি চিনা সংস্থার তৈরি করা কিট আমদানি করা হয়েছিল।
কিছুদিনের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান ও তামিলনাড়ু থেকে অভিযোগ ওঠে, টেস্ট কিটগুলোতে গণ্ডগোল আছে। মাত্র ৫.৪ শতাংশ ক্ষেত্রে কিটগুলি সঠিক ফল দেখাচ্ছে। আইসিএমআর জানায়, তারা অভিযোগ খতিয়ে দেখবে। দেখা যায়, অভিযোগ সত্যি। চিনা কিট ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এমনিতেই কিটগুলো গোলমেলে, তার ওপরে অভিযোগ ওঠে, সেগুলি অত্যধিক বেশি দামে সরকারকে বিক্রি করা হয়েছে। রাহুল গান্ধী এই প্রসঙ্গে টুইট করেন। তাতে বলা হয়, ম্যাট্রিক্স নামে এক আমদানিকারী সংস্থা চিন থেকে প্রতিটি কিট কিনেছে ২৪৫ টাকা দরে। কিন্তু দুই ডিস্ট্রিবিউটর সংস্থা রিয়েল মেটাবলিকস এবং আর্ক ফার্মাসিউটিক্যালস সরকারকে প্রতিটি কিট বিক্রি করেছে ৬০০ টাকা দরে। অর্থাৎ ডবলেরও বেশি দামে। তার মানে ডিস্ট্রিবিউটররা চড়া মুনাফা করেছেন।
আইসিএমআর অবশ্য জানিয়েছে, এখনও ওই কিটের টাকা দেওয়া হয়নি। ত্রুটিযুক্ত কিটগুলি ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তা সত্ত্বেও একটা কথা বলা যায়। কিছু লোক যে ওই কিট বিক্রি করে চড়া মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করেছিল সেকথা তো মিথ্যা নয়।
সমাজে সবসময়ই এমন কিছু লোক থাকে যারা মানুষের বিপদের সুযোগে ফয়দা লোটে। তাদের নীতি হল, এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই। ১৯৪৩ সালে যখন বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়, তখন একদল ব্যবসায়ী চাল মজুত করে চড়া মুনাফা করেছিল। সেই দুর্ভিক্ষে ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। তাও তাদের দয়া হয়নি। উল্টে দুর্ভিক্ষের সময়ে তাদের বাড়িগুলো ছিল আলোকোজ্জ্বল। উৎসবমুখর। সেই ছবি ধরা আছে 'নবান্ন' নাটকে। এমন উদাহরণ আরও আছে। দেশভাগের সময় একশ্রেণির লোক উদ্বাস্তুদের সম্পত্তি গ্রাস করে বড়লোক হয়ে গিয়েছিল। দু'দশক আগে কারগিল যুদ্ধের সময় শোনা গিয়েছিল কফিন কেলেংকারির কথা।
মহামারী নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসটির নাম 'প্লেগ'। আলজেরিয়ার ওরান নামে এক শহরে মহামারীর বর্ণনা দিয়েছিলেন লেখক আলবেয়ার কামু। সেখানে কোটার্ড নামে এক চরিত্র আছে। সে অপরাধপ্রবণ। সহজে কারও সঙ্গে মিশতে চায় না। কিন্তু প্লেগ মহামারী শুরু হতেই বদলে গেল তার ধরন ধারণ। সে হয়ে উঠল উৎফুল্ল। সিগারেট ও সস্তা মদের চোরাকারবার করে মুনাফা লুটল। যখন মহামারী উপশম হচ্ছে, শহরের মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচছে, সে পুনরায় হয়ে উঠল বিষণ্ণ। একাকী।
কামু যে চরিত্রটির বর্ণনা দিয়েছেন, সেই জাতীয় লোকই করোনা মহামারী থেকে ফয়দা লোটার চেষ্টা করেছিল। তাদের খুঁজে বার করে কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত। না হলে তারা ফের সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে। যখনই দেশে সংকট দেখা দেবে, তখনই তারা হয়ে উঠবে তৎপর। চেষ্টা করবে যাতে মানুষের প্রাণের বিনিময়ে নিজেদের পকেট ভারী করা যায়।