Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনের

গণশত্রুর গ্রাসে ‘চিরবিনিদ্র নগরী’ নিউ ইয়র্ক

সুস্মিতা রায়চৌধুরী শহরটা খুব চেষ্টা করছে, উঠে দাঁড়ানোর, কিন্তু পিঠ ঠেকে গেছে দেওয়ালে, দমবন্ধ হয়ে নিথর দাঁড়িয়ে আছে একসময়ের প্রাণচঞ্চলজীবনদায়ী টাইমস্ স্কয়ার। ৪ মার্চ মেক্সিকো ভ্রমণের আগের দিন সন্ধেবেলা থেকে রাত দশটা অবধি তোলপাড় করেছি নিউ

গণশত্রুর গ্রাসে ‘চিরবিনিদ্র নগরী’ নিউ ইয়র্ক

শেষ আপডেট: 2 April 2020 12:30

সুস্মিতা রায়চৌধুরী

শহরটা খুব চেষ্টা করছে, উঠে দাঁড়ানোর, কিন্তু পিঠ ঠেকে গেছে দেওয়ালে, দমবন্ধ হয়ে নিথর দাঁড়িয়ে আছে একসময়ের প্রাণচঞ্চলজীবনদায়ী টাইমস্ স্কয়ার। ৪ মার্চ মেক্সিকো ভ্রমণের আগের দিন সন্ধেবেলা থেকে রাত দশটা অবধি তোলপাড় করেছি নিউ জার্সির কিছু জায়গা শুধু একটা স্যানেটাইজারের আশায়, নিদেন পক্ষে একটা অ্যালকোহল ওয়াইপস্, কিচ্ছু নেই। বারবার বিভিন্ন সোশ্যাল গ্রুপে সবার এক প্রশ্ন, কোথাও কি কেউ পেয়েছে এগুলো। সমবেত উত্তর, না! আমরা বেরিয়ে পড়ি মেক্সিকোর উদ্দেশে। না তখনও ভয়টা গ্রাস করেনি। ভেবেছিলাম ওই সোয়াইন ফ্লুয়ের মতো কিছু। কিচ্ছু হবে না। ওই ভাবনাই কাল হল। শুধু এই ভাবনাটা ডুবিয়ে দিল গোটা পৃথিবীটাকে। আমেরিকায় এইমুহূর্তে সংখ্যাটা ২১৪৪৪৪, না এটা শেষ না। শুধুমাত্র নিউ ইয়র্কে সংখ্যাটা ৭৫৭৯৫। আতঙ্ক কোনটা বেশি, মৃত্যুর, না চাকরি চলে যাওয়ার?! আগন্তুকের মতন ধেয়ে এসেছে করোনাভাইরাস, গিলে নিচ্ছে বার্ধক্য, তারুণ্য সব। মাকড়সার জালের মতন বিস্তারিত হয়ে পড়ছে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর মননে-- যদি বেঁচেও যাই চাকরিটা থাকবে তো? ১০ মার্চ প্রথম টের পেয়েছিলাম ত্রাস শব্দটার মানে। এয়ারপোর্টে সবাই স্বতন্ত্র, এই ভিড়ে ছ’ফুট মানা হচ্ছে কি? যার কাছে স্যানেটাইজার, সেই রাজা। মেক্সিকো থেকে তুলতে পেরেছিলাম চারটে। প্লেনের সিট মুছে বসেও মনে হয়েছিল, পাশের জন আক্রান্ত না তো। ওই শেষ রাস্তা দেখা... ঘরবন্দি আজ একমাস। অশনি সংকেত ডিসেম্বরেই ছিল, কিন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশও সেই ভুলটা করল। ‘জাস্ট এ ফ্লু’ বলে ফুৎকারে ওড়ানো হল সতর্কবার্তা। যেদিন লাগাম টানার প্রথম চেষ্টা হল, তখন শ্বাসকষ্টে ভুগছে গোটা শহর, কখনও ভাইরাসের কখনও ঘরবন্দি দমবন্ধের। খালি সব কিছু। সারভাইভাল অব দি ফিটেস্টের পাকদণ্ডি আরও একবার নস্যাৎ করে দেয় মনুষ্যত্বের ব্যাখ্যা। টারগেট থেকে ওয়ালমার্ট, কস্টকো থেকে শপরাইট, হু-হু করে খালি হয়ে যায় খাবারের বা দৈনন্দিন সামগ্রীর তাক। পিছিয়ে পড়ে দুর্বলরা। একটু দুধ না কিনতে পারলে বাচ্চাটা খাবে কী? ভেঙে পড়ে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং। দেরি হলেও তখন রাশ ধরে প্রশাসন। সময় বেঁধে দেওয়া হয় বয়স মেনে। কিন্তু সংখ্যা তখন পঞ্চাশ হাজারের মাপকাঠি পেরিয়েছে। আস্তে আস্তে বন্ধ হচ্ছে তখন সহজ জীবনযাপন। প্রশ্ন হানে আতঙ্কিত সমাজ, এত দেরি কেন? অর্থনীতি বাঁচাতে গিয়ে কি তা হলে নরবলি দেওয়া হবে? কঠিন পরিস্থিতিকে সামাল দিতে এগিয়ে আসে সিডিসি এবং ‘হু’। পরীক্ষা শুরু হয় এই গণশত্রুর, ঘাড়ের পাশে নিশ্বাস নিচ্ছে তখন ভাইরাস। নির্দেশ জারি হয়, সব অফিস-কাছারি, স্কুল-ইউনিভার্সিটি বন্ধ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। খোলা শুধু খাবারের দোকান, তাও বসে খাওয়া নয় আর কিছু দৈনন্দিন দোকানপাট। আজকের তারিখে সেটিও বন্ধ। ভারতীয় দোকানগুলোয় আর আসছে না দেশের জিনিস, টান পড়ছে পকেটে। মার্কিন মুলুকে থাকা আমাদের মতো ‘না মার্কিনি না ভারতীয়’দের অবস্থা আরও শোচনীয় করে দেয় বাংলার সংখ্যাটা, বয়স্ক বাবা-মা একা ওখানে। ‘বিদেশি ভাইরাস, বড়লোকি রোগ’-এর নিষ্ঠুর তকমা হয়তো বোঝে না, আমাদের অসহায়তা। আমার নিউ জার্সিতে এইমুহূর্তে সংখ্যাটা ২২২৫৫। যতক্ষণে আমার কলম পৌঁছবে আপনাদের কাছে, তখন সংখ্যাটা বেড়ে যাবে আরও। একদিনে মারা যাচ্ছে আটশোর বেশি। তথ্য বলছে, মৃত্যু ছাড়িয়ে যেতে পারে সমস্ত পরিসংখ্যান। আক্রান্ত সবাইকে হাসপাতালে রাখার আর জায়গা নেই। বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্বল্প অসুস্থদের, ভরসা শুধুই ‘সম্পূর্ণ বাড়িতে থাকা’ আর নিউমোনিয়া চিকিৎসার সাধারণ ওষুধ, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। নতুবা সরগরম নিউ ইয়র্কের রাস্তায় খোলা হয়েছে সাদা চাদরে মোড়া মেডিক্যাল বেড। সারিসারি ট্রাক বহন করছে মৃতদেহ, গা গুলিয়ে উঠছে জানালার বাইরে তাকাতে। ফুড কন্টেনারের ট্রাকও এখন শববাহী গাড়ি। বুক কেঁপে ওঠে যখন খবর আসে খোদ নিউ জার্সিতে চারশোর বেশি পুলিশ অফিসার ‘টেস্টেড পজিটিভ’! রক্ষক আক্রান্ত হলে এই মহামারীতে শান্তি বজায় থাকবে তো! এর মধ্যে মৃত্যু হয় প্রথম বাঙালির, বয়স ৭২। প্লাস্টিকে মোড়ানো শরীরটার শেষকৃত্যের জন্য শেষ দেখাটুকুও পায় না পরিবার। যথার্থ আজ লাশ শব্দের অর্থ। প্রতিদিন প্রেসিডেন্টের আর্জি, ঘরে থাকুন। অনেকটা দেরি হয়ে গেছে না? তাও গোপনে চলছে মূর্খদের করোনা-পার্টি। এক একঘণ্টায় বাড়ছে ৫০০ আক্রান্ত। এ কেমন কালনাশী নেশা! বাড়িতে থাকা কি এতটাই অসুবিধা? এমন দুরবস্থায় হঠাৎ খবর আসে অমুক বান্ধবীর চাকরিটা আর নেই, ‘ইকনমি ক্রাইসিস’-এর কোপ, তমুক বন্ধুকে একদিনে ফায়ার করা হয়েছে, কারণ বলা হয়েছে ‘কস্ট কার্টেল’... আগের দিন দুপুরে বাড়ি থেকে কাজ করার পর আজ তারা ‘বেকার’। প্রশাসন কী বোঝে বেকারত্বের মানেটা। একটা মহামারী বুঝিয়ে দিয়ে গেল, রাস্তায় থাকা যে মানুষগুলো ভাবছে ‘কোন মরাটা সহজ, না খেতে পেয়ে, না করোনা-মৃত্যু’, তারা ব্যতীত সবাই বড়লোক। এখানে তারা ‘হোমলেস’ বা যারা ডেইলি ওয়েজার। খবর পেলাম আমারই আত্মীয়ের অফিসের ক্যান্টিনের ভদ্রলোক আজ সকালে মারা গেছেন কোভিড-১৯ এ। জানা নেই ওনার থেকে, এই মৃত্যুথাবা ঘরে ঢুকে এসেছে কিনা। একদিনে ১৩ জন মারা গেছে নিউ ইয়র্ক হাসপাতালে, বয়স ২৫-৩৩! ভেন্টিলেশনে এক একজন থাকছে ৮ ঘণ্টা। সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বন্ধ হয়েছে আমেরিকা থেকে যেকোনও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিষেবা, কিন্তু ডোমেস্টিক যে আরও ভয়াবহ। মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ছে সবচেয়ে কঠিন মনটাও। তথ্য বলছে ছোটবেলায় নেওয়া বিসিজি ভ্যাক্সিন বাড়াতে পারে প্রতিরোধক্ষমতা, সত্যতা যাচাই করার মতো সাহস নেই। জ্বর হলেও, ভয়ে অনেকেই যাচ্ছে না ক্লিনিকে... দ্বিধাগ্রস্ত আতঙ্কিত গোটা সমাজ। বন্ধ এখন মন্দির-গির্জা। ঈশ্বর অক্লান্ত কাজ করছেন রাতদিন, সফেদ অ্যাপ্রনে। ভরসা একটাই, চার দেওয়াল। অনেকটা ‘জোমবি ল্যান্ড’-এর মতো বাস করছি আমরা, দরজা খুললেই নৃশংস মৃত্যুর কবলে। বাজারে যদি কদাচিৎ যেতে হয়, যদি খোলা থাকে একটা আমেরিকান দোকান, সেখান থেকে ফিরেই সাবান-জলে পরিষ্কার করতে হচ্ছে সারা শরীর-- বাহক না হই এই মারণরোগের। এভাবেও বাঁচা যায় তা হলে। নিশ্বাস নিচ্ছি যখন, বেঁচে আছি এখনও। আমেরিকার সর্বোন্নত মেডিক্যাল স্ট্রাকচার এখনও অপারগ ‘ফ্লাটেনিং দি কার্ভ’ করতে। প্রয়াস চলছে, সুস্থ হচ্ছে অনেকে। কিন্তু তার সংখ্যা বড্ড নগণ্য। অপর্যাপ্ত খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী, অনিশ্চিত চাকরি, ক্রমবর্ধমান মূল্য, অসম্ভব মানসিক চাপ নিয়েও আমরা লড়ছি রোজ। ‘স্টে হোম’, খুব কম আসে এমন সময় যখন দেশের জন্য কিছু করা যায়, সব যুদ্ধ বর্ডারে হয় না, ঘরে থেকে দেশকে বাঁচান। প্যানডেমিকের কবলে চা না হয় একটু কমই খেলেন, চ্যালেঞ্জ ধরে নিন না, ঠিক পারবেন! সময়টা খারাপ হতে পারে, পরিণতিটা কক্ষনো না। একটাই অনুরোধ সবাইকে, নির্ভুল তথ্য ছাড়া গুজব ছড়াবেন না, এভাবে এখানে মানুষ আজ দ্বিধায় কী করণীয়। ভারতে তথা কলকাতায় আপনারা একটু বাড়িতে থাকুন, দেখুন দূষণ কত কম, আকাশটা আজ আরেকটু নীল... ওদিকটা ভাল থাকলে আমরা এখানে লড়ে নেব। বাইরে বসন্তের গোলাপি আভা, ‘গার্ডেন স্টেট’-এর নৈসর্গিক চেরি ব্লসম আজ মহামারীর কবলে। কিন্তু এখনও ওই কাচবিদ্ধ ফুসফুস প্রতিধ্বনি করে যায়, নিউ ইয়র্ক ‘আরেকবার ঘুরে দাঁড়াও, ধ্বজা ওড়াও জীবনীশক্তির...।’ (নিউ জার্সির বাসিন্দা সুস্মিতা রায়চৌধুরী একজন ব্লগার ও লেখিকা।)

```