
শেষ আপডেট: 5 May 2020 11:51
অন্তরিন সময়ে জীবন যতই অবরুদ্ধ হোক না কেন, খাদ্য ও ওষুধের খোঁজে বেরোতেই হয়। মনুষ্য জন্ম বলে কথা। যেমন সেদিন হল। সব কিছু সংগ্রহ করার পর এবং চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ফেরার পথে সূর্যের মাত্রাতিরিক্ত ঔজ্জ্বল্যের কারণে ধরতে হল রিকশা। একথা-সেকথা বলার পর শীর্ণদেহ শুকনো মুখের রিকশাচালক বললেন, ‘সকাল সাতটা থেকে ডাক্তারবাবুর নার্সিংহোমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি ভাড়ার জন্য। অন্য জায়গায় তো পুলিশ দাঁড়াতে দিচ্ছে না। তাছাড়া লোকও নেই। তাই নার্সিংহোমের সামনে এসেছিলাম। এখানেও ভাড়া নেই। এই দুপুর বারোটার সময় আপনিই প্রথম উঠলেন।’ তারপর একথা, সেকথা, করোনা, জিনিসপত্রের চড়া দাম ইত্যাদি। কথার পরে কথা যেমন চলে আর কী।
—‘কবে যে সব আবার স্বাভাবিক হবে! কবে যে রোগ দূর হবে। যা অবস্থা।’ আমার স্বগতোক্তি।
—‘আর করোনা করোনা! এভাবে আর ক’দিন চললে পরিবার নিয়ে না খেয়েই মারা পড়তে হবে। করোনা তো দূরের ব্যাপার।’ মাঝবয়সী চালকের হতাশ উত্তর।
রিকশা থেকে নেমে চালকের ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বিত্তমধ্য শিকড় কেমন যেন নড়ে উঠল। সত্যি তো কী হবে!
চোখের সামনে ভেসে এল হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের মুখ। ভেসে উঠল ১২ বছরের জামলো মদকামির নিষ্পাপ মুখ। যে বয়সে শিশুরা স্কুলে যায়, সেই স্বপ্ন-দেখা বয়সে মেয়েটি মায়ের কোল থেকে নেমে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল, লঙ্কা খেতে কাজ করতে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে। লকডাউন হলে পা বাড়ায় বাড়ির পথে। কিন্তু মায়ের কোল থেকে গেল অধরা। পথেই মারা গেল। মুম্বাইতে একজন কাজ না থাকা শ্রমিক তার সেলফোন বিক্রি করে ১২০০ টাকা পেয়ে স্ত্রী ও তিন শিশুসন্তানের জন্য খাবার কিনে আনেন। বাকি টাকা স্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
তারপর?
তারপর চোখের আড়ালে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার সামনে ছিল না কোনও আলো।
রমযানে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন তাবরেক আনসারি। বাড়ি উত্তরপ্রদেশের মহারাজগঞ্জ। ১৩ জন মিলে সাইকেলে রওনা দিয়েছিলেন মুম্বাই শহরতলির ভিওয়ান্ডি থেকে। ৩৫০ কিলোমিটারের দূরত্ব। পথেই মৃত্যু হল পাওয়ার লুম কারখানা–কর্মীর।
এরকম দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এদিক-সেদিক ঘটছে। এটাই এই মুহূর্তের বাস্তব।
সেদিন একটি মেয়ে এলেন পাড়ায় সাইকেলে করে। ফল নিয়ে। আগে কখনও দেখিনি। পাড়ায় যে ক’জন সবজি ও মাছবিক্রেতা আসেন তাঁদের তো চিনি।
—‘আঙুর লম্বা দেখে এনো। কী সব মোটা মোটা ছোট আঙুর এনেছ।’ এক ক্রেতার ভুরু কোঁচকানো মন্তব্য।
—‘দেখুন, আমি ফলটল চিনি না। আগে কোনওদিন এ কাজ করিনি। স্বামী গাড়ি চালায়। কাজে যেতে পারছে না। রোজগার বন্ধ। ফলে সামান্য যা টাকা হাতে ছিল তা দিয়ে কবরডাঙা থেকে ফল কিনে বেচতে বেরিয়েছি। বিক্রি হলে রাতে খাওয়া জুটবে।’ কাঁদো কাঁদো গলায় জানালেন মেয়েটি।
ধীরে ধীরে আরও আরও বিক্রেতার ভিড়। যে ভিড় বেড়েই চলেছে।
লকডাউনে জীবন বিপর্যস্ত। এলোমেলো। থমথমে। অসংগঠিত স্তরের শ্রমিক ও দৈনিক মজুরিতে খাটা শ্রমিকদের রোজকার বেঁচে থাকার লড়াই যেন সিসিফাসের পাথর ঠেলার মতো। অত্যন্ত কঠিন পর্বে পৌঁছে গেছে। রিকশাচালক, অটোচালক, রঙের মিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ানদের মতো শ্রমজীবীরা তাঁদের জমানো যৎসামান্য পুঁজি নিয়ে মরিয়া হয়ে নেমে পড়েছেন সবজি, মাছ, ফল বিক্রি করতে। অর্থাৎ হাতের সামনে যা পাচ্ছেন তাই করছেন দুটো পয়সা রোজগারের জন্য। বাঁচার জন্য।
এই হতাশ, ম্লান থেকে ম্লানতর পরিসরে যখন ভিন্ন সমাজমাধ্যমে নিত্যনতুন খাওয়ার ছবি, দামি পোশাক পরে নির্লজ্জ দেখনদারি দেখলে মাথা হেঁট হয়ে আসে। চার দেওয়ালের নিশ্চিত নিরাপত্তার মধ্যে আনন্দময় আমোদে গা ভাসাতে থাকা বিত্তমধ্য এবং বিত্তউচ্চ বাবু–বিবিদের প্রদর্শনীর ফেনিল উচ্ছ্বাসে গা গুলিয়ে ওঠে।
অক্সফ্যামের একটি হিসেব বলছে, দেশের ৭৩ শতাংশ সম্পদ কুক্ষিগত মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে। আমাদের পড়া আছে ২০১৮–র রঙ্গরাজন কমিটির রিপোর্টও। যে রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে দারিদ্রসীমার নীচে বাস করেন দেশের ২৯.৫ শতাংশ মানুষ। তাদের দৈনিক রোজগার ১৪০ টাকারও কম। এটা তো গড় হিসেব। কোনও কোনও অঞ্চলে এর চেয়েও কম। করোনার জাঁতাকলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন দিন–আনা দিন–খাওয়া লোকজন। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্লাবনে কত লোক কাজ হারাবেন তার ইয়ত্তা নেই। অর্থনীতিবিদরা যে হিসেব দিচ্ছেন তাতে চোখ বোলালে হৃদকম্প হয়।
মারণ ভাইরাস জাঁকিয়ে বসার আগে জানুয়ারি মাসে একটি খবর ভাইরাল হয়েছিল। তিন সন্তানের মা তামিলনাড়ুর সালেমের প্রেমা অন্নসংস্থানের জন্য নিজের মাথার চুল বিক্রি করে দিয়েছিলেন দেড়শো টাকায়। তার স্বামী সেলভম হয়েছিলেন আত্মঘাতী। মহিলা অবশ্য আত্মহত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। দু’জনেই ইটভাটার শ্রমিক।
করোনার ছুটি কাটাতে কাটাতে ‘ইন্ডিয়ার’র বাসিন্দা বিত্তমধ্য এবং বিত্তউচ্চরা এসব জেনেও থাকেন উদাসীন। পাশ ফিরে শোন। নিশ্চিত আরামে নিদ্রা যান। থাকেন নিজস্ব মৌতাতে মগ্ন।
আর ‘ইন্ডিয়া’র পাসপোর্ট যোগাড়ে ব্যর্থ ভারত হেঁটে চলে রাস্তায়। পেটে খিদের জ্বালা নিয়ে। অস্থির অন্ধকারে।
চূড়ান্ত বৈপরীত্যের ছবিটা অবশ্য নতুন নয়। শিল্পী সোমনাথ হোড়ের স্মৃতিচারণে আছে, ১৯৪৩–এর দুর্ভিক্ষের সময় কলকাতার রাস্তা যখন গ্রাম থেকে আসা খেতে না পাওয়া লোকদের ফ্যান দাও ফ্যান দাও হাহা রবে ভারাক্রান্ত, না খেতে পেয়ে লোক মারা যাচ্ছে তখন এক রাতের জন্যও গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে বাবু–বিবিদের ফুর্তির ফোয়ারা বন্ধ হয়নি।
স্বাধীনতার এত বছর পরেও অবস্থা খুব একটা পাল্টেছে কি?
উন্নয়ন মানে তো কেবলই রাষ্ট্রের বিকাশের পরিসংখ্যান নয়। নাগরিকরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা পাওয়ার জন্য দাবি করার উপযুক্ত পরিসর পেলেই উন্নয়ন ঘটা সম্ভব। উন্নয়ন হচ্ছে নাগরিকদের জীবনধারণের অধিকার এবং সচেতনতা। এটাই আসল উন্নয়ন। —এই হচ্ছে অমর্ত্য সেনের উন্নয়নতত্ত্বের ভাবনা। যে ‘উন্নয়ন’ এখনও আমজনতার ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোনও প্রত্যন্ত গ্রামে গেল দেখা যায় রেশনে তাদের কী কী প্রাপ্য তাই বেশিরভাগ গ্রামবাসী জানেন না। পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার আদিবাসী গ্রামে এ তো নিজের চোখে দেখা।
করোনার দাপটে নতুন করে ভেসে উঠেছে স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টি। এর প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করছে না। কিন্তু যাদের থাকা–খাওয়ারই ঠিক নেই তাদের কাছে ‘স্বাস্থ্য সচেতনতার’ বিষয়টি বিলাসিতা নয় কী? ফ্রানজ ফানোনের ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’ ও নর্মান বেথুনের কর্মজীবন নিয়ে লেখা ‘দ্য স্কালপেল দ্য সোর্ড’–- বই দু’টির বক্তব্য তো জটিল পরিস্থিতিতে বেশি মানুষের চিকিৎসা ও জীবনধারণের কঠোর লড়াইকে মান্যতা দেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্র কি তা দিতে পারছে— এই মুহূর্তে লাখ টাকার প্রশ্ন। জীবনধারণের জন্য যে ন্যূনতম সুবিধা প্রয়োজন সেসব থেকে এখনও আমাদের দেশের আমজনতা বঞ্চিত।
এত বঞ্চনা এত অবিচারের পরেও কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্যের মতো বিশ্বাস রাখি ‘সুদে আসলে একদিন সব শেষ হয়ে যাবে’। একদল চার দেওয়ালের নিজস্ব নির্মিত সুরক্ষিত বন্দিশালায় আনন্দে থাকবে, ফুর্তির ঘুড়ি ওড়াবে, আরেকদল বছরের পর বছর পেটে খিদে নিয়ে হেঁটে যাবে রাস্তায়-- এ তো চলতে পারে না অনন্তকাল।
আগামী পৃথিবীর ভারত সমস্ত কাঁটাতার উপড়ে পাসপোর্ট ছাড়াই ঢুকে পড়বে ‘ইন্ডিয়া’তে। ঢুকবেই।
(কবি ও শিল্পকলা–লেখক দেবাশিস চন্দ পেশায় সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত।)