
Sheikh Mujibur Rahman, Bangladesh
শেষ আপডেট: 17 March 2024 16:57

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসাধারণ একটি কাব্যনাটকের নাম ‘বিসর্জন’। নাটকটির প্রেক্ষাপট ত্রিপুরা রাজপরিবারের মহাসংকট। ত্রিপুরার রাজা চন্দ্রমানিক্য। তাঁর ভাই নক্ষত্ররায়। রঘুপতি নামের এক ব্রাহ্মণ আছেন নাটকে, যিনি আদতে একজন প্রাসাদ ষড়যন্ত্রী। দেবি-পূজাচ্ছলে গোপনে পশুবলি দিতে চান যিনি। রাজা চন্দ্রমাণিক্য মন্দিরে পশুবলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে রাজহত্যার লক্ষ্যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে লোভী পুরোহিত রঘুপতি। তার পরের কাহিনি সকলের জানা। নক্ষত্ররায়কে তিনি প্ররোচিত করেন ভ্রাতৃহত্যায়। নিজের খায়েশকে দেবীর আদেশ বলে প্ররোচিত করেন রঘুপতি। কিন্তু নক্ষত্ররায় ভ্রাতৃহত্যায় প্ররোচিত হতে চায় না। লোভী রঘুপতি তাঁর শিষ্য জয়সিংহকে নির্দেশ দেন এই বলে যে-শ্রাবণের বর্ষাসিক্ত মেঘাচ্ছন্ন শেষ রাতের অন্ধকার রাজাকে হত্যার পক্ষে অনুকূল। দেবীর আদেশে রাজাকে বধ করে রাজরক্ত দেবীর চরণে নিবেদন করতে। কাব্যনাটকে-‘বুঝেছ কি? শোনো তবে,—গোপনে তাঁহারে বধ করে আনিবে সে তপ্ত রাজরক্ত দেবীর চরণে। বুঝেছ নক্ষত্ররায়, দেবীর আদেশ রাজরক্ত চাই— শ্রাবণের শেষ রাত্রে।’
নাটকে জয়সিংহ আগাগোড়াই শিশুসুলভ চরিত্র। সংশয়ী-নিষ্পাপ সে। রঘুপতির প্রলোভনে কোনভাবেই রাজি হয় না। রাজদরবারে ক্ষমতার এই টানাপড়েনের নাটকে আমরা একপর্যায়ে দেখি, রঘুপতির চক্রান্তে জয়সিংহ বলতে বাধ্য হচ্ছে– ‘আমি এনে দিব রাজরক্ত, শ্রাবণের শেষ রাত্রে দেবীর চরণে’। কাব্যনাটকটির শেষদৃশ্যে দেখা যায় শ্রাবণের শেষরাত্রে মন্দিরে বয়ে যাচ্ছে রক্তস্রোতধারা! শেষ পর্যন্ত জয়সিংহই আত্মবলিদান দিলেন!
প্রতিবছর শ্রাবণের শেষ রাত্রে বাঙালির ভাগ্যাকাশেও হাজির হয় এক শোকার্ত রজনী। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার রাত এটি। ‘বঙ্গবন্ধু তাঁর খেতাব’, নাম শেখ মুজিবুর রহমান (Sheikh Mujibur Rahman), যাঁর তপ্ত রক্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূমিতে জুগিয়েছে উর্বরতার সার। শেখ মুজিব ছিলেন বাহান্ন থেকে ছেষট্টি, একাত্তর হয়ে পঁচাত্তর অব্দি বাঙালি জাতীয়তাবাদী মুক্তিকামী মানুষের নেতা। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নসাধকে শয়নে-স্বপনে ধারণ করে তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালির নয়নের মণি।
ভারতের সহযোগিতা, বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীর আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনার মরণপন লড়াই শেষে স্বাধীন দেশ পেলাম আমরা। কিন্তু স্বাধীনতার স্থপতি মুজিবকে আমরা বেশিদিন বাঁচতে দিইনি। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রয়াত হাবিবুর রহমান লিখেছেন- ‘১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি তারিখের অস্ত্রসমর্পনের দিন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মুজিব বলছেন- ‘আমি তোমাদের তিন বছর কিছু দিতে পারব না। আরও তিন বছর যুদ্ধ চললে তোমরা যুদ্ধ করতে না?’ উত্তর আসে ‘করতাম-করতাম’। মুজিব তখন বলছেন- ‘তাহলে মনে করো যুদ্ধ চলছে, তিন বছর যুদ্ধ চলবে। সেই যুদ্ধ দেশ গড়ার যুদ্ধ। অস্ত্র হবে লাঙ্গল আর কোদাল’।
’৭২ সালের সেই সমাবেশে দাঁড়িয়ে মুজিব কেবল তিন বছর সময় চেয়েছিলেন। কী আশ্চর্য! ঘাতকরা তাঁকে ঠিক তিন বছরের মাথাতেই হত্যা করল। মুজিবকে হত্যা করা হল ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট। মধ্য অগাস্ট মানেই শ্রাবণের শেষ সপ্তাহ। আবহাওয়া প্রতিবেদন মতে শ্রাবণের শেষদিকে এই সময়ে বারিধারা ঝরে অঝোরে।
প্রতিবছর শ্রাবণের শেষ রাত্রে বাঙলির ভাগ্যাকাশে হাজির করে এই শোকার্ত রজনী। শেখ মুজিবকে হারানোর রাত। শেখ মুজিব, যাঁর তপ্ত রক্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূমিতে জুগিয়েছে উর্বরতার সার। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নসাধকে যিনি শয়নে স্বপনে ধারণ করেছিলেন। তাই তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন বাঙালির নয়নের মণি। যিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলায় নেতা ছিলেন বহু, কিন্তু মুজিব ছিলেন একজন। ওই সময় বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বের দিকটি বুঝতে হলে প্রথাবিরোধী পণ্ডিত ও অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের স্মরণ না নিয়ে উপায় নেই। তিনি লিখছেন ‘ওই রাজনীতিক আকাশে একটিই নক্ষত্র ছিল, তাঁর নাম সূর্য ছিল না, ছিল শেখ মুজিব।’
প্রশ্ন হল কেন মুজিব হত্যার জন্য বেছে নেওয়া হল এই ১৫ অগাস্ট তারিখকে? বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক জাকির হোসেন লিখেছেন-চক্রান্তকারীদের আশঙ্কা ছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গে ভারত বঙ্গবন্ধু ও আক্রান্ত পরিবারকে রক্ষা করতে (ভারত-বাংলাদেশ শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি অনুযায়ী ভারত এ ব্যাপারে সামরিক অভিযান চালাতে পারে) এগিয়ে আসতে পারে। আর ভারত যদি সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট ছিল শুক্রবার। ওই দিন ভারতের স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের সরকার, ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনী ব্যস্ত থাকবে কুচকাওয়াজ ও রাষ্ট্রীয় আয়োজনে। এমন একটি দিনে তারা প্রতিবেশী একটি দেশে সামরিক অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেয়ার আগেই মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করার ব্লপ্রিন্ট করা হয়। এই দিনটি তাই চক্রান্তকারীদের কাছে বঙ্গবন্ধু হত্যার দিন হিসেবে সুযোগ হিসাবে হাজির হয়।
বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক শেখ আদনান ফাহাদ। তাঁর গবেষণার ও প্রকাশনা ‘বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও গণমাধ্যম ভাবনা’। তিনি জানান, ‘ভারতের স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশের জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পেছনে সুদূরপ্রসারী কারণ আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে দুই অংশীদার তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত। ভারতের স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশের মানুষ যেন শোকে নিমজ্জিত থাকে এবং দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের জনগণ যেন শুভেচ্ছা বিনিময় না করতে পারে সে জন্য ১৫ অগাস্টকে হত্যার তারিখ হিসেবে বেছে নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের মদদপুষ্ট হত্যাকারীরা’। অর্থাৎ, ভারতের যেদিন স্বাধীনতা দিবস সেদিন বাংলাদেশে শোক দিবস।
ভারতের আনন্দের দিনে আমরা যখন শোক প্রকাশ করি তখন ১৯১৪ সালের অগাস্ট মাসে শান্তিনিকেতনে বসে কবিগুরু রচিত একটি গানের ইঙ্গিত করা যায়। সুখ ও শোকের গানে কবিগুরু লিখছেন- ‘সুখে আমায় রাখবে কেন, রাখো তোমার কোলে। যাক-না গো সুখ জ্বলে’। সত্যিই তো, প্রতিবেশী দুই দেশের শোক ও সুখের চিরবৈরিতার সূচনা ঘটাতেই যেন এই দিনটি বেছে নেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে মার্কিন দলিলপত্রে সংরক্ষিত অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ হয়েছে। প্রথমা প্রকাশনের ‘মার্কিন দলিলে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতা হত্যাকাণ্ড’ শিরোনামের বইতে প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান লিখছেন- ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’কে হত্যার পরে বাংলাদেশে ভারতের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে শঙ্কিত ছিল খন্দকার মোশতাক আহমদ ও পাকিস্তানের জুলফিকর আলী ভুট্টোর সরকার। সে কারণে ভারতের মনোভাব বুঝতে পঁচাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক জেনারেল জেএফআর জ্যাকবের উপর বিশেষ নজর রাখছিলেন কলকাতায় নিযুক্ত তৎকালীন কনসাল জেনারেল ডেভিড এ কর্ন। কিসিঞ্জারের প্রশাসন তাঁকে এ কাজে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিল।
ফিরে যাই রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকে। নাটকের একেবারে শেষে দেবীর চরণে নিবেদিত রক্তের স্রোতধারা নাটকের পরিণতিকে করে তোলে বিয়োগান্তক। কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগে- কবিগুরু কি জানতেন, বিসর্জন কাব্যনাট্যের মতোই বিয়োগান্তক পরিণতির দিকে ধাবিত হবে বাংলাদেশের রাজনীতি? বিসর্জন নাটকটির রচনাকাল ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দ, কিন্তু ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের শ্রাবণের শেষরাত্রেও ‘রাজরক্ত চাই’ বলে একদল রক্ষপিপাসু খুনীর দলের হাতে মুজিব হত্যার বিয়োগান্তক ঘটনা কীভাবে এতটা মিলে যায়? আবার ফিরে এসেছে সেই বিসর্জন-এ বর্ণিত শ্রাবণের শেষ রাত্রি!
মতামত ব্যক্তিগত
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
ইমেইল: rajibnandy@cu.ac.bd