
শেষ আপডেট: 4 May 2020 15:58
করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবসভ্যতার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। করোনার করাল গ্রাসে বিশ্বের স্বাস্থ্য পরিষেবা ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো এখন প্রবল সংকটের মুখে। বিশ্বব্যাপী করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ লক্ষ ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ২ লক্ষেরও বেশি। চিনের উৎসস্থল থেকে শুরু করে মাত্র চার মাসে ২১০টির বেশি দেশে সুপারওয়েভের মতো ছড়িয়ে পড়ছে করোনা মহামারী।
কোনও ওষুধ বা ভ্যাকসিন না থাকায় সারা পৃথিবী আতঙ্কিত। হাজার হাজার মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে প্রতিদিন, সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুমিছিল। নতুন রোগের বিরুদ্ধে মোকাবিলার উপযুক্ত উপায় ওষুধ অথবা ভ্যাকসিন আবিষ্কার। বিশ্বের তাবড় বিজ্ঞানী, গবেষকরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সন্ধান করে চলেছেন নতুন ভ্যাকসিনের।
‘সুরক্ষা’ এবং ‘কার্যকারিতা’ ভ্যাকসিন প্রস্তুতির দু’টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। সুরক্ষা বলতে বোঝায়, ভ্যাকসিনটি মানবদেহে কতটা নিরাপদ এবং কার্যকারিতা হল রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা। যেকোনও ভ্যাকসিনের সুরক্ষা এবং কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে:
প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষায় মূলত ভ্যাকসিনটি মানবদেহে কতটা সুরক্ষিত তার মূল্যায়ন করা হয়। প্রাথমিকভাবে ৪০-৫০ জন সুস্থ-সবল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করে ডোজ নির্ধারণ এবং সুরক্ষা বিবেচনা করা হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় কয়েক শতাধিক মানুষের দেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করে তার কার্যকারিতার মূল্যায়ন করা হয়। এই গোষ্ঠীতে বিভিন্ন বয়সের এবং স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মানুষ ছাড়াও রোগাক্রান্ত ইচ্ছুক ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাটি সবচেয়ে দীর্ঘতম পর্যায়, যেখানে কয়েক হাজার মানুষের দেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয়। এই গোষ্ঠীতে মূলত সংক্রমিত মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ভ্যাকসিনটি রোগ সারাতে কতটা সক্ষম বা আদৌও কার্যকরী কিনা তার মূল্যায়ন করা হয়। এই সমস্ত পরীক্ষামূলক পর্যায়গুলি সাফল্য লাভ করার পরেই ভ্যাকসিনটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে আসতে পারে এবং মানবদেহে ব্যবহার করা সম্ভব।
ভ্যাকসিন পরীক্ষায় প্রথম স্বেচ্ছাসেবক ৪৩ বছর বয়সী মহিলা জেনিফার হালের।[/caption]
করোনাভাইরাসের প্রথম ভ্যাকসিনের মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করে মার্কিন বায়োটেক সংস্থা মডার্না থেরাপিউটিকস, যার নাম mRNA-1273 ভ্যাকসিন। করোনাভাইরাসের একটি বিশেষ অংশ নিয়ে তৈরি করা এই ভ্যাকসিনটি মানবদেহে প্রয়োগের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলবে এবং নভেল করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করবে। গত মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভ্যাকসিনটির মানবদেহে প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হয় সিয়াটেলের এক পরীক্ষাকেন্দ্রে। এই ভ্যাকসিন পরীক্ষায় প্রথম স্বেচ্ছাসেবক ৪৩ বছর বয়সী এক মহিলা, নাম জেনিফার হালের। এই ভ্যাকসিন তৈরিতে বিশেষভাবে আর্থিক সহায়তা করেছে ‘মার্কিন স্বাস্থ্য পরিষদ’ এবং নরওয়ের সংস্থা 'কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক অ্যান্ড ইনোভেসন’। মে মাসের মাঝামাঝি দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হবে বলে দাবি মার্কিন সংস্থাটির। সমস্ত পরীক্ষা সফল হলে আগামী ১২-১৫ মাসের মধ্যেই বাজারে আসতে পারে এই ভ্যাকসিনটি।
২. ক্যানসিনো বায়োলজিকস, চিন (Ad5-nCoV)
চিনের বায়োটেক সংস্থা ক্যানসিনো বায়োলজিকস এবং পিপলস লিবারেশান আর্মির একটি বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি Ad5-nCoV নামক করোনা ভ্যাকসিনটির মানবদেহে প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হয় মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। Ad5-nCoV হল করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ভ্যাকসিন, যার মানবদেহে পরীক্ষা শুরু হয়। বর্তমানে এটি দ্বিতীয় পর্যায়ে পরীক্ষাধীন এবং অন্যান্য ভ্যাকসিনের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে। প্রথম পর্যায়ে মোট ১০৮ জনের দেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা ৫০০ জন। আগামী বছর জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ফলাফল আশা করছে এই সংস্থা।
৩. ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালস, আমেরিকা (INO-4800)
করোনাভাইরাসের তৃতীয় ভ্যাকসিনের মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করে ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালস নামক একটি মার্কিন সংস্থা। INO-4800 নামক ভ্যাকসিনটির প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষা শুরু হয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া এবং কানসাস শহরের মোট ৪০ জন সুস্থ মানুষের দেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হবে। প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা সফল হলে আগামী জুন মাসেই শুরু হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা। নরওয়ের সংস্থা 'কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক অ্যান্ড ইনোভেসন’ ছাড়াও বিল এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন নামক সংস্থার আর্থিক সাহায্য পেয়েছে ইনোভিও। গত ১০ সপ্তাহের মধ্যে, সংস্থাটি প্রথম পর্যায় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার জন্য কয়েক হাজার ভ্যাকসিন ডোজ ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছে। পরবর্তী পর্যায়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা ও জরুরি ব্যবহারের জন্য বছরের শেষের দিকে আরও ১০ লক্ষ ভ্যাকসিন ডোজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
৪. অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ব্রিটেন (ChAdOx1 nCoV-19)
[caption id="attachment_217204" align="aligncenter" width="600"]
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের তৈরি ChAdOx1 nCoV-19 নামক ভ্যাকসিন।[/caption]
করোনা ভ্যাকসিন লিস্টে আরও একটি বিশেষ সংযোজন ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের তৈরি ChAdOx1 nCoV-19 নামক ভ্যাকসিনটি। মানবদেহে ভ্যাকসিনটির পরীক্ষা শুরু হয় এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহে এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিরই একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট এলিসা গ্রানাটো। ১৮-৫৫ বছর বয়সের মোট ১১১০ মানুষের দেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করে দেখা হবে। ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বে আলোড়ন ফেলেছে এই ভ্যাকসিন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অন্যতম ভ্যাকসিনোলজিস্ট সারা গিলবার্ট ভ্যাকসিনটি নিয়ে খুবই আশাবাদী এবং সব ঠিকঠাক চললে আগামী সেপ্টেম্বর মাসেই এর সাফল্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন। প্রসঙ্গত, গবেষকরা এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে, তাঁরা ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক ভ্যাকসিন ডোজ উৎপাদনের ঝুঁকি নিয়েছেন, যার সিংহভাগটাই উৎপাদন করবে সেরাম ইন্সটিটিউট নামক একটি ভারতীয় সংস্থা, যা পৃথিবীর বৃহত্তম ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী সংস্থা হিসেবে পরিচিত। পরীক্ষা সফল হলে সেপ্টেম্বর মাসের কিছু পরেই ভ্যাকসিনটি বাজারে আসতে পারে।
৫. ইনঅ্যাক্টিভেটেড চায়না ভ্যাকসিন, চিন
এটি একটি প্রচলিত ভ্যাকসিন, যা ইনঅ্যাক্টিভেটেড বা মৃত করোনা ভাইরাস নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ভ্যাকসিন তৈরির এই পদ্ধতিটা খুবই প্রাচীন। চিন সরকার পরিচালিত একটি সংস্থার তৈরি এই ভ্যাকসিনটি এপ্রিলের শেষের দিকে মানবদেহে দ্বিতীয় পর্যায়ে পরীক্ষা শুরু করেছে। ভ্যাকসিনটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেটাবেসে তালিকাভুক্ত থাকলেও চিনের বাইরে তেমনভাবে প্রচার দেখা যায়নি। তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা খুব তাড়াতাড়ি শুরু হবে বলে জানা যাচ্ছে। পুরো পদ্ধতি সম্পন্ন হতে প্রায় একবছর সময় লাগতে পারে বলে সংস্থার দাবি।
৬. সিনোভ্যাক বায়োটেক, চিন (PiCoVacc)
চিনের সিনোভ্যাক বায়োটেক নামক আরও একটি সংস্থা একই ধরনের ইনঅ্যাক্টিভেটেড বা মৃত করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনের মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করেছে, যা বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে পরীক্ষাধীন। এই পর্যায়ের পরীক্ষা আগামী চার মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার পর, পরবর্তী পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করা হবে।
৭. বায়োনটেক, জার্মানি ও ফাইজার, আমেরিকা (BNT162)
জার্মান সংস্থা বায়োনটেক এবং মার্কিন সংস্থা ফাইজারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি BNT162 ভ্যাকসিনের মানবদেহে প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হয় এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে। প্রাথমিকভাবে জার্মানিতে পরীক্ষা শুরু হলেও, খুব শীঘ্রই আমেরিকাতেও পরীক্ষা শুরু হবে বলে জানা গিয়েছে। এই ভ্যাকসিন তৈরিতে মডার্নার মতোই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। BNT162 ছাড়াও আরও তিনটি ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে বলে সংস্থা সূত্রে খবর। আগামী ১২-১৮ মাসের মধ্যে ভ্যাকসিনটি বাজারে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
হিউম্যান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হওয়ার পরই একটা ভ্যাকসিন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহারের ছাড়পত্র পায়। মাঝখানে কিছু সময় লাগে বৃহত্তর মাত্রায় প্রস্তুতি, বৈধতা বিচার আর গুণগত মান নির্ধারণে। তারপরেই মানুষের হাতে পৌঁছে যাবে জীবনদায়ী করোনা ভ্যাকসিন।
এই সাতটি করোনা ভ্যাকসিন ছাড়াও পৃথিবীর আরও অনেক নামী-দামি সংস্থা তাদের নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভ্যাকসিন আবিষ্কারে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আরও বেশকিছু ভ্যাকসিনের পরীক্ষা শুরু হবে মানবদেহে।
যেকোনও ভ্যাকসিন তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের দ্রুত প্রসার এবং বিশ্বের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব, বিজ্ঞানীদের একত্রিত করে ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করতে বাধ্য করেছে। করোনা ভ্যাকসিন তৈরি হতে চলছে রেকর্ড সময়ে, যা ভ্যাকসিনের ইতিহাসে প্রথম। ত্বরান্বিত প্রক্রিয়া কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ হলেও ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাসকে রোখার জন্য অন্য কোনও পথ নেই।
(ড. দীপঙ্কর মান্না জীব-রসায়নের গবেষক। বর্তমানে নরওয়ের ওসলো শহরের বাসিন্দা।)