
শেষ আপডেট: 22 November 2020 07:06
২০২০ সালের মে মাসের কোনও এক সকালে সৌমিত্রজেঠুর ফোন। অপু, তুমি যে কাজটা দিয়ে গিয়েছিলে ওটা আমার হয়ে গেছে। দেড়-দু’মাসের বন্দিদশায় আমার ভুলো মন সবটাই ভুলে গেছে তখন। আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, জেঠু কোন কাজটা? আরে তুমি যে ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র নতুন সংস্করণ প্রকাশ করবে বললে। আমি নতুন চারটি কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতা বাছাই করে রেখেছি। নিয়ে যেয়ো। জেঠু, এখন কী করে যাব! তাও চেষ্টা করছি, কয়েক দিনের মধ্যে যদি গাড়ি যোগাড় করতে পারি তাহলে চলে যাব। কিছুদিনের মধ্যে আমার এক পুলিশ-বন্ধুর গাড়ি পেয়েছিলাম। তার সাহায্যে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে একদিন চলে যাই সৌমিত্রজেঠুর বাড়ি। তোমার যাওয়ার তাড়া নেই তো? না, তাড়া নেই। তাহলে চলো তোমায় দেখিয়ে দিই। বুঝিয়ে দিলেন, দেখিয়ে দিলেন কোন কোন কবিতা সংযোজন হবে। বুঝে নেওয়ার পরে গল্প জুড়লেন। গৃহবন্দি জীবনে কী কী করেছেন তার বর্ণনা। এই অস্থির সময়ে আমি একটাও কবিতা লিখতে পারিনি। দুটো নাটক অনুবাদ করেছি আর অনেক ছবি এঁকেছি। নাটক দুটি দেখালেন। বসার ঘর থেকে উঠে গিয়ে ছবি আঁকার ছোট্ট খাতাটা নিয়ে এলেন। তিরিশ-বত্রিশটা ছবি। নতুন আঁকার খাতাটা হাতে নিয়ে উল্টোতে থাকি। পাতায় পাতায় রেখা ও রঙের খেলা।
ছবি যখন দেখছিলাম তার মধ্যেই তিনি বলছিলেন কোভিড পরিবেশের কঠিন পরিস্থিতির কথা। গত তিন মাসের মধ্যে তিনবার হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে পা ঠিকমতো পড়ছে না। তখন তিনি সিঁড়িতে ওঠার এক নতুন পদ্ধতি রপ্ত থাকেন। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা সাইকেল চালানোর মতো। সিঁড়ির ওপরের ধাপে পা রাখলেন পেছন থেকে ঘুরিয়ে। পঁচাশি বছরের একজন মানুষ নতুন এক পদ্ধতি আবিষ্কারে উৎফুল্ল। লড়াকু জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে লড়াই করেছেন। নিজেই উঠে দাঁড়িয়েছেন। সোজা করে রেখেছেন শিরদাঁড়া।সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি, সঙ্গে কবিতা


মনে পড়ে যায়, মাঠের মধ্যে দিয়ে একদল কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে চলেছেন উদয়ন পণ্ডিত। শূন্যে হাত ঘুরিয়ে চিৎকার করছেন ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান।’ সেলুলয়েডে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার সেই প্রথম পরিচয়। আমার ডাকনাম অপু। সেই কিশোর অপু তার সবচেয়ে প্রিয় নায়ককে দেখতে দেখতে বড় হয়ে উঠল। তখন কিশোর অপুর কল্পনাতেও ছিল না বড় হয়ে একদিন সে সামনাসামনি পেয়ে যাবে তার স্বপ্নের নায়ককে, কাজ করবে তাঁর সঙ্গে। মনে পড়ে, আরও পরে নাট্যোৎসবে রবীন্দ্রসদনে ‘কিং লিয়ার’ দেখানো হচ্ছে। লাইন দিয়ে ঢুকে পড়েছি। উনআশি বছরের এক যুবককে দেখেছি মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে দাপিয়ে অভিনয় করতে। থিয়েটারেও রয়ে গেছে আমার সেই মুগ্ধতার রেশ।
সম্পর্ক যত ঘন হতে লাগল স্মৃতির পাতায় জমতে থাকল গল্পকথা। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হবে। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে সেই অনুষ্ঠানের সূচনা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠ করলেন। ‘কাল মধুমাস’। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে শুনেছিলেন সেই কবিতা পাঠ। অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগে তিনি বইপাড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। একটু জিরিয়ে নিয়েছিলেন আমাদের দে’জ পাবলিশিংয়ের দপ্তরে। কফি হাউসের কফিতে ফিরে পেতে চেয়েছিলেন পুরনো গন্ধ, তাঁর কবিবন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার মুহূর্ত। প্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে কত ঘটনার কথা শুনেছি। তাঁর নতুন কোনও কবিতা পড়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় যদি ভাল লাগেনি বলতেন তাহলে তৎক্ষণাৎ তিনি তা ছিঁড়ে ফেলতেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সিটি কলেজে তাঁর এক ক্লাস ওপরে পড়লেও দু’জনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল দৃঢ়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থগুলো থেকে কবিতা বাছাই করে শ্রেষ্ঠ কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে, খুব সম্ভবত ১০ সেপ্টেম্বর, তিনি তাঁর নতুন কবিতার খাতা থেকে পড়ে শুনিয়েছিলেন বেশ কিছু অংশ। তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ভাঙা পথের রাঙা ধুলা’-র দ্বিতীয় তরঙ্গ লিখছিলেন তখন। অসম্পূর্ণ সেই খাতা থেকে গদ্যকবিতা পড়ার মাঝে মাঝে বলেছিলেন তাঁর উত্তর কলকাতার স্মৃতি ও কাহিনি।