
শেষ আপডেট: 11 October 2023 19:41
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে ……
গড়ফা বয়েজের সুমন স্যার যাচ্ছেন গড়ফা গার্লসে ফিজিক্স পড়াতে। সেখানে ফিজিক্স-এর কোনও শিক্ষিকা নেই। আবার গড়ফা গার্লসের দেবযানী ম্যাডাম বাংলা পড়াতে যাচ্ছেন সন্তোষপুর শিক্ষায়তনে। কারণ সেখানে বাংলার শিক্ষকের ঘাটতি। এখন এই ভাবেই একটি স্কুলের খামতি মিটিয়ে নিতে সাহায্য করবে তার পড়শি স্কুল। এই বিনিময় প্রথার মাধ্যমে সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলিকে বাঁচিয়ে তুলতে রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দফতর ইতিমধ্যেই ৬ টি জেলায় ৬০ টি ‘লার্নিং হাব’ বা ‘স্কুল ক্লাস্টার’ তৈরি করেছে। ক্লাস্টারগুলি প্রাথমিক পর্যায়ে কাজও শুরু করেছে।
দেশজুড়ে বিতর্কের মধ্যেই চালু হয়েছে ‘নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি’। সাড়ে তিন দশক পর নতুন চেহারায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। যার খসড়া প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। বুনিয়াদি স্কুল শিক্ষা থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় সব স্তরে পরিকাঠামোগত পরিবর্তন করে সারা দেশে অভিন্ন শিক্ষানীতি চালু করাই এর উদ্দেশ্য। রাজ্য সরকার এই শিক্ষানীতি মানবে না, তাঁরা আলাদা করে রাজ্য শিক্ষানীতি তৈরি করেছে। তবে তাঁদের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি অনেকাংশেই জাতীয় শিক্ষানীতিকেই নতুন মোড়কে প্রয়োগের পরিকল্পনা। ইতিমধ্যেই রাজ্যের কলেজগুলিতে ৪ বছরের স্নাতক কোর্স চালু হয়েছে। 'লার্নিং হাব' বা ‘স্কুল ক্লাস্টার’কেও মান্যতা দেওয়া হয়েছে। এগুলি সবই জাতীয় শিক্ষা নীতির অংশ। স্কুল ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ক্লাস্টারের কাজ ত্বরান্বিত করতে আগামী ১৩ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী, জেলাশাসকদের সঙ্গে সভা করবে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর। এই মর্মে নির্দেশও পাঠানো হয়েছে।
আমাদের দেশে মূলতঃ স্কুলে ক্লাস্টারের ব্যবহার দেখা গেছে। যেই স্কুলগুলিতে ছাত্র সংখ্যা একদম তলানিতে, সেগুলিকে একত্রীকরণ করে বাঁচানোর চেষ্টায়। তবে স্কুল ক্লাস্টারিং এর ইতিহাসে চোখ বোলালে এর প্রয়োজনীয়তা বোঝা যাবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে যেখানে শিক্ষার উপকরণের অভাব রয়েছে।
স্কুল হাব বা ক্লাস্টার আসলে কী?
ইউনেস্কোর সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি বড় 'কোর' স্কুলের চারপাশে থাকা স্কুলগুলিকে নিয়ে তৈরি গ্রুপই হল 'স্কুল ক্লাস্টার'। সুস্থভাবে স্কুল পরিচালনা করতেই ভৌগলিকভাবে কাছাকাছি থাকা স্কুলগুলিকে নিয়ে তৈরি হয় এই গ্রুপ। এই স্কুলগুলির শিক্ষক থেকে শিক্ষার সব উপকরণকে একত্রিত করে সবার মধ্যে ভাগ করা হয়। এর মূল কাজ সম্পদের অভাব মেটানো। তবে সব সময় এই উদ্দেশে স্কুল ক্লাস্টারিং হয়েছে তেমনটা নয়। স্কুল ক্লাস্টারিং এর ইতিহাস বলছে, ৭০ ও ৮০ র দশকে বিশ্ব-মন্দার সময় মূলতঃ শিক্ষার ব্যয় কমাতেই অনেক দেশ স্কুল ক্লাস্টার চালু করে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার দেশগুলো মৌলিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে 'নিউক্লিওস' নামে ক্লাস্টারকে কাজে লাগিয়েছে। আবার ৯০ এর দশকে আসে স্কুল ক্লাস্টারিং এর দ্বিতীয় তরঙ্গ। কম্বোডিয়া, লাওস এবং আলবেনিয়ার মতো কিছু দেশের শিক্ষা- প্রশাসন এই সময় ভীষণভাবে ভেঙে পড়ে। তখন স্কুলগুলিকে ক্লাস্টারের আওতায় এনে বাইরে থেকে সাহায্য দিয়ে বাঁচাতে হয়।
ভারতে, ৭০ এর দশকের প্রথম দিকে, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, তামিলনাড়ুতে কিছু স্কুলের ছাত্র সংখ্যা একদম তলানিতে ঠেকে। ওই স্কুলগুলিকে বাঁচাতে স্কুল ক্লাস্টার চালু হয়। যদিও সুপারিশ আগেই হয়েছিল। বর্তমানে, দেশের সব প্রায় রাজ্যই এই ক্লাস্টারের শরণাপন্ন। বিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষার উপকরণের খামতি মেটাতে এবার পশ্চিমবঙ্গও স্কুল ক্লাস্টারিং এর পথে। কোনও এলাকার ৮ থেকে ১০টি স্কুলকে নিয়ে একটি 'ক্লাস্টার' তৈরি করা হয়েছে। তার মধ্যে যে স্কুলের পরিকাঠামো সব চেয়ে উন্নত, সেটি হয়েছে প্রধান স্কুল ।
আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
আমাদের রাজ্যের লার্নিং হাব বা স্কুল ক্লাস্টারগুলির বয়স মাত্র ৬ মাস। এখনই আহামরি কিছু সাফল্য আশা করা অনুচিত। ইতিমধ্যে ক্লাস্টারের স্কুলগুলি নিজেদের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা করেছে। কী করতে হবে তার পরিকল্পনা চলছে। কাজের মধ্যেই কেউ কেউ পরিবেশ বাঁচাতে বৃক্ষরোপণের আয়োজন করেছে। হাব স্কুল থেকে সবাই গাছ নিয়ে গেছে, স্কুলে গাছ লাগিয়ে তার ছবি আপলোড করেছেন- এটাই বা কম কী!! কোনও কোনও ক্লাস্টার বাংলা, ইংরাজি পাঠের কর্মশালা আয়োজন করেছে। ফলাও করে সেই খবর বেরিয়েছে। আবার কোনও কোনও ক্লাস্টার বিজ্ঞান বিষয়ক প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেছে। একই প্রশ্নে সব স্কুল পরীক্ষা নেবে এমন সিদ্ধান্তও কোনও কোনও ক্লাস্টার নিয়েছে। সেখানে প্রশ্ন উঠেছে, সহযোগী স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের হাব স্কুলের মানে উন্নীত না করে এই সিদ্বান্ত কতটা যুক্তি সম্মত? তবে এ পর্যন্ত উপকরণ ভাগের সেরকম দৃষ্টান্ত নজরে পড়েনি। শিক্ষক বিনিময়ের কাজও একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে।
শিক্ষার উপকরণ বলতে যদি শুধু শিক্ষক হয়, তার বিনিময়ই হাব বা ক্লাস্টারের একমাত্র উদ্দেশ্য, তাহলে অন্য কথা।এটা বাদে অন্যান্য উপকরণ যেগুলি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সামগ্রিক বিকাশে সাহায্য করে, যেমন খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, বই, ল্যাব, স্মার্ট ক্লাস, কম্পিউটার, অডিটোরিয়াম –এগুলিকে বিবেচনায় আনলে অনেক কিছু প্রকট হয়ে উঠবে। কারণ শিক্ষার এই উপকরণের সবগুলি কোনও বিদ্যালয়েই নেই। ধরা যাক খেলার মাঠ। অভিজ্ঞতা বলছে, কলকাতার অনেক স্কুল ক্লাস্টারের নিজস্ব খেলার মাঠই নেই। সেক্ষেত্রে কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের খেলাকেন্দ্রিক প্রতিভার বিকাশ ঘটবে! আবার এমনও দেখা গেছে ক্লাস্টারের কোনও একটি স্কুলে খেলার মাঠ আছে, কিন্তু বাকি স্কুলগুলি থেকে তার দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার - সেই মাঠ বাকিরা কেমন করে কাজে লাগাবে!! ইনডোর গেমের কথা না হয় বাদই দিলাম। বেশিরভাগ ক্লাস্টারেই স্মার্ট ক্লাস নেই। নিজস্ব বিষয় শিক্ষক-সহ কম্পিউটার ল্যাব নেই প্রায় ৯০ শতাংশ ক্লাস্টারে। বিজ্ঞান বা ভূগোল ল্যাবের ক্ষেত্রেও ছবিটা খুব একটা সুখকর নয়। অনেক স্কুলেই ল্যাবের ঘর আছে কিন্তু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় ইনস্ট্রুমেন্ট নেই, থাকলেও অব্যবহারে তা বিকল। ফলে কীভাবে তা সবার কাজে লাগবে? লাইব্রেরি ও বইয়ের ক্ষেত্রেও একই গল্প। ক্লাস্টারের অনেক স্কুলেই লাইব্রেরি হয়ত আছে, কিন্তু দীর্ঘদিন বুক গ্র্যান্ট না থাকায় লাইব্রেরিগুলিতে পড়ার মতো বই নেই। ক্লাস্টারগুলিতে আনন্দ পাঠের কোনও ব্যবস্থা নেই। নেই নাচ, গান ছবি আঁকার ব্যবস্থা। অডিটোরিয়াম হাতে গোনা। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চাদের জন্য স্পেশাল এডুকেটরের ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু আর্থিক কারণে কোনও ক্লাস্টার-ই তার ব্যবস্থা করতে পারেনি। এ জন্য সরকারি বরাদ্দও নেই। শুধুই নেই নেই আর নেই! পরিকাঠামোর উন্নতি না করে এই ভাবে বিনিময় প্রথার মাধ্যমে স্কুলের খামতি মেটানো কতটা সম্ভব? সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষক থেকে শিক্ষামহলের সর্বত্র। ক্লাস্টারের মধ্যে এগুলোর ব্যবস্থা করতে না পারলে ওই– হাতে রইল পেনসিল ।
কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবনা
ক্লাস্টারভিত্তিক সমস্ত স্কুলে ৯ থেকে ১২ ক্লাস পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কেরিয়ার কাউন্সেলিং চালু হচ্ছে। কেরিয়ার কাউন্সেলর প্রতি ১৫ দিনে একবার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত পছন্দ সম্পর্কে গাইড করবেন। এই কাজে সমগ্র শিক্ষা অভিযান বা এসএসএ - প্রতি বছর ৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা- সহ একজন অ্যাকাডেমিক রিসোর্স পার্সনের ব্যবস্থা করবে। যিনি ছাত্রদের ক্ষমতা, আগ্রহ এবং সম্পর্কিত ভ্যারিয়েবল মূল্যায়ন করার পর উপযুক্ত কেরিয়ার বেছে নিতে সাহায্য করবে। এ ছাড়াও গ্রুপ-লেভেল কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা থাকবে। এটা কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের 'স্কুল শিক্ষা ও সাক্ষরতা' বিভাগের প্রকল্প। শিক্ষা দফতরের আমলাদের অনেকেই চিন্তিত, কেন্দ্র-রাজ্য দড়ি টানাটানিতে শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে না পড়ে!
শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা কী ভাবছেন
এই 'লার্নিং হাব' সরকারি স্কুলের আর সরকার পোষিত স্কুলের শিক্ষকদের মিলিয়ে দিয়েছে। 'লার্নিং হাব' এর প্রকাশিত তালিকায় সরকার পোষিত স্কুলের সঙ্গে হিন্দু, হেয়ার, বেথুন, বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট স্কুলও রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি স্কুল ও সরকার পোষিত স্কুলের মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয় সম্পদ ভাগ করা যাবে। ভাগ করা যাবে শিক্ষকও। এরপরও কি সরকারি স্কুল আর সরকার পোষিত স্কুলের শিক্ষক আলাদা - এই যুক্তিতে সরকার পোষিত স্কুলের শিক্ষকদের ‘ক্যাস’ বা কেরিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট স্কিমের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যাবে? শিক্ষকদের একাংশ এই প্রশ্ন সামনে এনেছেন।
শিক্ষাবিদরা অন্য একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। একদিকে 'র্যাশনালাইজেসন অফ টিচার' এর মাধ্যমে এক স্কুলের উদ্বৃত্ত শিক্ষক দিয়ে অন্যত্র শিক্ষকের ঘাটতি মেটানোর ভাবনা, অপরদিকে স্কুল হাব বা ক্লাস্টারিং এর মোড়কে এক স্কুলের বিষয় শিক্ষক দিয়ে অন্য স্কুলে সেই বিষয় পড়ানোর পরিকল্পনা- এই দুইকে ব্যবহার করে সরকার ভবিষ্যতে শিক্ষক নিয়োগে ইতি টানবেন না তো?
প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরটাও জানা! তবুও বলব লার্নিং হাবের সাফল্য দেখতে আমাদের আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতেই হবে।
(লেখক কৃষি অর্থনীতির গবেষক)
মতামত ব্যক্তিগত