
শেষ আপডেট: 4 December 2022 07:19
‘অন্যের জীবন বিনষ্ট করে দিয়ে জেলের বাইরে দিব্যি ঘুরে বেড়ায় কিছু মানুষ’, বলেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু (Draupadi Murmu)।
তিনি দৃষ্টান্ত না দিলেও কুখ্যাত আসামিদের জেলের বাইরে থাকার নজির অসংখ্য। তাজা দৃষ্টান্ত বিলকিস বানোকে (Bilkis Bano) গণধর্ষণ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের খুনে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা। গুজরাতের চলতি নির্বাচনে সেই অপরাধীরা ভোটও দিয়েছে। বিজেপি সমর্থকেরা জেলের গেটে ফুল, মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছিল তাদের।

এই ঘটনা নিয়ে রাষ্ট্রপতির প্রকাশ্যে মুখ খোলার সুযোগ তেমন একটা নেই। কিন্তু বিবেকের ডাক সরকারি নিষেধ মানে না। জনমনে তাই প্রশ্ন জেগেছে, বিলকিসের ধর্ষকদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তকেই কি গত শনিবার (২৬ নভেম্বর) সংবিধান দিবসের সরকারি অনুষ্ঠানে কাঠগড়ায় তুললেন দ্রৌপদী মুর্মু?
ব্যতিক্রমী এক-দু’জন বাদে এ দেশে রাষ্ট্রপতিরা আড়ালেই থেকেছেন বরাবর। সদ্য প্রাক্তন রামনাথ কোবিন্দ তাঁদের অন্যতম। রাষ্ট্রপতির কনভয় যাতায়াতের কারণে অ্যাম্বুলেন্সে আটকে পড়া রোগীর মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ছাড়া যাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রপতিদের এই ভূমিকাই যদিও সংবিধান নির্ধারিত। ভারতের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে মর্যাদা দিয়েছে, অধিকার বা ক্ষমতা দেয়নি।
কিন্তু বিবেকের ডাকে সাড়া দিতে ক্ষমতার রাজদণ্ড লাগে না। বিশ বছর আগে গুজরাতের যে দাঙ্গার শিকার হয়েছিলেন বিলকিস ও তাঁর পরিবার, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম সে সময় আর্তের পাশে ছুটে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ির পরামর্শ উপেক্ষা করে।
বিবেকের ডাক সব বিধি-ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি সে দিন আরও অনেক কথা বলেছেন, যা কোটি কোটি ভারতবাসীর অন্তরের কথা। হয়তো সেই কারণেই সংবিধান দিবসে রাষ্ট্রপতির ওই ভাষণ সামাজিক মাধ্যমে ক্রমেই ছড়িয়ে গিয়ে নয়া নজির তৈরি করেছে। আইনমন্ত্রী কিরেন রিজেজু, দেশের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় এবং সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি সে দিন বলেন, ‘আমার যতটা বলার বললাম। আরও যা যা বললাম না, আপনারা তা বুঝে নিন।’
দ্রৌপদী মুর্মু সে দিনের ভাষণে বলতে গেলে সেই সব অসহায় নাগরিকের জীবন-যন্ত্রণার কথা বলেছেন, যাঁরা সামান্য অপরাধে বছরের পর বছর জেলে পচে মরছেন। মামলা লড়ার আর্থিক সঙ্গতি তাঁদের নেই। বিচার ব্যবস্থাও ওই মানুষগুলির ব্যাপারে ততোধিক অন্ধ।
দ্রৌপদী মুর্মু সে দিন দেশের বিচার-ব্যবস্থা নিয়ে অনেকটা সময় নিজের কথা বলেছেন যা রাষ্ট্রপতি ভবনের আমলাদের লিখে দেওয়া ভাষণে ছিল না। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জেলে সেই মানুষেরা বছরের পর বছর আটকে থাকে যাঁদের বাড়ির লোকেরা জানেন না সংবিধান কী, মৌলিক অধিকার কাকে বলে। এই মানুষের কথা কেউ ভাবছে না।’

দ্রৌপদী মুর্মু এর আগে ওড়িশার বিধায়ক, মন্ত্রী এবং ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল ছিলেন। জেলবন্দিদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরতে ওড়িশার বিধায়ক থাকাকালে বিধানসভার স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারপার্সন হিসাবে জেল সফরের অভিজ্ঞতা এবং ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল থাকার সময় মামলার বোঝা নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শোনান সে দিন। বলেন, ‘এমন বন্দিও আছেন যিনি কাউকে থাপ্পড় মারার দায়ে বছরের পর বছর জেল খাটছেন। মামলা চালাতে ঘটি-বাটি বেচতে হয় পরিবারকে।’ তাঁর বিস্ময় ভরা প্রশ্ন, ‘এই মানুষদের কি জেলেই গোটা জীবন থাকতে হবে?’
মহারাষ্ট্রের জেলে আদিবাসী আন্দোলনের মুখ মানবাধিকার কর্মী স্ট্যান স্বামীকে শেষ পর্যন্ত জেলেই মরতে হয়েছে। এই প্রবীণ মানবাধিকার কর্মীকে গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও দিনের পর দিন জামিন দেওয়া হয়নি। জামিনের পরবর্তী শুনানির আগেই মারা যান তিনি। মৃত্যুকালের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে বলতে হয়, অঘোষিত মৃত্যুদণ্ডই কার্যকর হয়েছে তাঁর উপর। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের তোলা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে শত প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও বিচারালয়ের একাংশ জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের থেকে লোকদেখানো দেশপ্রেমে মেতে ছিল রাষ্ট্রহিতে কাজের অজুহাত অস্ত্র করে!
প্রবীণ সমাজকর্মী হিমাংশু কুমারের কথা এখন অনেকেই জানেন। ছত্তীশগড়ের জনজাতি মানুষের আন্দোলনের সমমর্মী হিমাংশু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অত্যাচারের কথা বারে বারেই প্রকাশ্যে এনেছেন। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হওয়া মানুষের পক্ষে ন্যায়বিচারের দাবিতে দেশের শীর্ষ আদালতে আর্জি জানিয়েছেন। অভিযোগ, বিচার তো মেলেইনি, উল্টে তাঁকেই জরিমানা করেছে সুপ্রিম কোর্ট, ফৌজদারি মামলা শুরুরও সুপারিশ করেছে। তাঁকে শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে হয় সেটাই দেখার।
জাতীয় অপরাধপঞ্জির গত বছরের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের জেলগুলিতে বন্দি সংখ্যা পাঁচ লাখ ৫৪ হাজারের কিছু বেশি, যাদের ৭৭.১ শতাংশই বিচারাধীন। অর্থাৎ অপরাধ প্রমাণ হয়নি। কতদিনে হবে, কেউ জানে না। যতদিন হবে না, ততদিন জেলে আটকে থাকাই ভবিতব্য বেশির ভাগের ক্ষেত্রে। আইন কমিশনের রিপোর্ট বলছে, ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় দেশের জেলগুলিতে বিচারাধীন বন্দি ছিল মোট বন্দির ৫৭.৬ শতাংশ, আজকের তুলনায় অনেকটাই কম। ঘোষিতের চেয়ে অঘোষিত ইমার্জেন্সি কত ভয়ঙ্কর, ভারতবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
এই কারণেই বোধহয়, ‘দেশটা কি পুলিশ স্টেট হয়ে গেল’— প্রশ্ন তুলেছে খোদ সুপ্রিম কোর্ট। তিস্তা সেতলবাদের জামিনের আবেদনে গুজরাত হাইকোর্ট কেন ছয় সপ্তাহ পর শুনানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে প্রশ্নও তোলে সর্বোচ্চ আদালতই। অনর্থক বিলম্বে বিরক্ত সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট পদক্ষেপ করার আগেই নিজেরা মামলা শোনার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। পান থেকে চুন খসলেই দেশদ্রোহিতার ধারার মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। অপরাধ প্রমাণের বালাই নেই। বছরের পর বছর জেলে পচিয়ে মারার সব আয়োজন প্রস্তুত। সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলেছে, ব্রিটিশের তৈরি যে আইনে মহাত্মা গান্ধী, বাল গঙ্গাধর তিলকের মতো মানুষেরা জেল খেটেছে, স্বাধীন দেশের নাগরিককে কেন সেই একই ধারার নাগপাশে জর্জরিত হতে হবে?
দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক রায়ে বলেছে, ‘জামিন হল নিয়ম, জেল নিতান্তই ব্যতিক্রম।’ বিত্তবান, ক্ষমতাশালীদের ক্ষেত্রে সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়। আর্থিক ভাবে দুর্বল, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে ছবিটা উল্টো। বিচারাধীন এবং সাজাপ্রাপ্ত, দুই গোত্রের বন্দিদের মধ্যেই যাঁদের সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে যথেষ্ট বেশি। ওড়িশার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী জানেন, যে রাষ্ট্রের তিনি সংবিধানের ধারক, রক্ষক--সেই দেশের প্রভুরা জনজাতিদের কী চোখে দেখে।
বছর দুয়েক আগের হিসাবে (প্রিসন স্ট্যাটিস্টিক্স, ২০২০) কারাগারে বন্দিদের দুই-তৃতীয়াংশ হল দলিত, উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত মানুষ। ১৯ শতাংশ মুসলিম। তখনকার চার লাখ ৬৬ হাজার বন্দির ৬৬ শতাংশ নিরক্ষর বা দশম শ্রেণির পরে পড়াশোনা করেনি। উত্তরপ্রদেশে জেলবন্দিদের সিংহভাগ দলিত ও মুসলিম। মধ্যপ্রদেশের জেলে সংখ্যায় বেশি আদিবাসীরা।
বিলকিস বানোকে ধর্ষণ ও একাধিক খুনে অভিযুক্তদের যাবজ্জীবনের সাজা মকুব করে আগাম মুক্তি দিয়েছে গুজরাতের বিজেপি সরকার। সেই সরকারই এখন সুপ্রিম কোর্টে লড়াইয়ে ব্যস্ত কী করে গোধরায় ট্রেনে ইট-পাটকেল ছোড়ার অপরাধে ১৭-১৮ বছর জেলে আটক আসামিদের জামিনের আবেদন খারিজ করা যায়। জেল-মুক্তি, জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্ম পরিচয়কে বিবেচনায় রেখে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিকেই ক্রমে মূল ধারা করে তুলছে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি। এই মামলায় প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড়ও বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন, ইট-পাথর ছোড়ার অপরাধে ১৭-১৮ বছর জেলে বন্দিদের জামিন দিতে কীসের এত আপত্তি? ক’দিন আগে তিনিই প্রকাশ্যে বলেছেন, নিম্ন আদালত চাপের কাছে নতিস্বীকার করে জামিনের আবেদন অগ্রাহ্য করে।
তার ফলে জেলগুলি বন্দির চাপে উপচে পড়ছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষে পশ্চিমবঙ্গের ৬০টি জেলে আটক ছিল ২৫,২৬৩ জন বন্দি। যেখানে থাকার ব্যবস্থা আছে মাত্র ২১,৭১৪ জনের। সেই বন্দিদের ৮৫ শতাংশের অপরাধই বিচারাধীন। মালদহ জেলে ৩৫৩ জন বন্দির থাকার ব্যবস্থা আছে। রাখা হয়েছিল ১১৩১ জনকে। দেশের সব জেলের চিত্রই কম-বেশি এক।
জেলে ভিড় উপচে পড়ার সমস্যা গত এক দশকে আরও তীব্র হয়েছে। বন্দিদের দেখভালে জেলকর্মীরাও সংখ্যায় ততোধিক অপ্রতুল। দিন যত গড়াচ্ছে অপরাধের লঘু-গুরু ভেদাভেদ ভুলে ততই জনপ্রিয় হচ্ছে ফাঁসি, জেলে পচিয়ে মারার তালিবানি ভাবনা। যা মান্যতা পাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্তর থেকে। জেলে করোনা মহামারী ঠেকাতে সুপ্রিম কোর্ট লঘু অপরাধে বন্দিদের জামিন দিতে বললেও তেমন কানে তোলেনি কোনও সরকার।
কারাগারে বন্দির চাপ কমাতে সরকার দেশে আরও দু’শো জেল তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। রাষ্ট্রপতির প্রশ্ন, ‘কী হবে নতুন জেল বানিয়ে? আমরা কি সামনের দিকে এগোচ্ছি, বিকাশের পথে হাঁটছি!’ পরিবর্তে দ্রুত বিচারের কথা বলেছেন তিনি।
জনাকীর্ণ জেল ফাঁকা করতে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতেই ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি অপরাধের চরিত্র নির্ধারণ করে জামিনের সুপারিশ করেছিল। পরামর্শও কানে তোলেনি কোনও সরকার। ফলে জেলে ভিড় উপচে পড়ছে, বাড়ছে হেফাজতে মৃত্যু। অমৃত মহোৎসবে মেতে থাকা দেশ নির্বিকার। প্রাপ্তি রাষ্ট্রপতির বিবেকের ডাক।