
শেষ আপডেট: 5 July 2018 19:54
বলে রাখা ভাল প্রদেশ কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে এর আগে বরাবরই ১২ নম্বর তুঘলক লেনে তাঁর বাসভবনে বৈঠক করেছেন রাহুল। কিন্তু আজকের বৈঠক ডাকা হয়েছে ১৫ নম্বর গুরুদ্বারা রেকাব রোডে কংগ্রেসের ওয়ার রুমে!
প্রশ্ন হল, আজ তবে কি যুদ্ধ ঘরে সত্যিই মহাভারত হবে? রাহুলের সামনেই!
বাংলা কংগ্রেসের বৈঠকে নাটক এর আগেও দেখেছেন রাহুল। বিহার কংগ্রেসের নেতা শাকিল আহমেদকে কিছুদিনের জন্য বাংলার পর্যবেক্ষক করেছিলেন তিনি। প্রদেশ নেতাদের নিয়ে রাহুলের সামনে তিনি একবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। বলেন, অধীর চৌধুরী বলেছেন, বাংলায় ঢুকলে ঠ্যাং ভেঙে দেবেন। অধীরবাবু শুধরে দিয়ে বলেন, ও কথা বলিনি। বলেছি বাংলার পর্যবেক্ষক হয়ে এসে গোষ্ঠী রাজনীতিতে উস্কানি দিলে মেনে নেব না।
আজ এমনই কোনও দৃশ্য হয়তো অপেক্ষা করে বসে রয়েছে। তবে গত দেড় বছরে বাংলা কংগ্রেসের মতি ও গতি দেখে যে টুকু বোঝা যাচ্ছে, আজকের বৈঠকে চাপানউতোর যাই হোক, সেটা রয়ে যাবে ক্ষুদ্র চিত্র হয়ে। বৃহত ছবিটা হলো, আদতে কিস্যু হবে না।
কেন?
কারণ, এমনিতেই দক্ষিণ বাংলায় এখন কংগ্রেসকে সাইনবোর্ড পার্টিও বলা যায় না। হাত-কংগ্রেসের সাইনবোর্ড খুঁজতে গেলেও দূরবীণ লাগবে। উত্তরবঙ্গে একদা কংগ্রেসের যে টুকু ভিটে মাটি ছিল তাও ভাঙনের গ্রাসে চলে গিয়েছে। বাংলার প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা একেক জন সব নিধিরাম সর্দার। ঢাল, তলোয়ার পরের কথা, লোক লস্কর বলতে কিচ্ছু নেই। আর তাই পঞ্চায়েত ভোটে খুঁজে পাওয়া গেল না কংগ্রেসকে। আবদুল মান্নান, প্রদীপ ভট্টাচার্যরা একটা গ্রাম পঞ্চায়েতেও গেলেন না প্রচার করতে। অধীর চৌধুরী হাইকোর্টে আইনজীবীর মতো সওয়াল করে বাহবা পেলেন। কিন্তু এক সময়ে সিপিএমের সঙ্গে জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে দেখা যেত মুর্শিদাবাদের যে রবিনহুডকে (সনিয়া গান্ধী কখনও কখনও সস্নেহে তাঁকে ও নামে ডাকতেন), তিনি প্রায় বিনা যুদ্ধে ওয়াকওভার দিয়ে দিলেন। একমাত্র বহরমপুরের বিধায়ক মনোজ চক্রবর্তীকে তবু দেখা গেল রাস্তায় নেমে শাসক দলের কর্মীদের হাতে হেনস্তা হতে।
তবে এ হেন বাংলা কংগ্রেসের একেবারে কিছু নেই বললে খামোখা বদনাম করা হবে। পড়তি বাজারেও ধনসম্পদ নেহাত কম নেই,- ঝগড়া আছে, আকচাআকচি আছে। আর এ হেন কাশ্যপ গোত্র কংগ্রেসেও কিছু নেতার এখনও পদের মোহ আছে, দলের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে রাজ্যসভায় নিজের আসন গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা আছে। এবং এঁদের কেউ কোনও প্রস্তাব দিলে তা যতই সঙ্গত হোক, অন্য জন বিরোধিতা করবেনই। তাতে দল গোল্লায় গেলেও ক্ষতি নেই। যেমন এক সময় বামেদের সঙ্গে জোটের প্রবর্তক ছিলেন যাঁরা, অধীর চৌধুরীর বামেদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে তাঁরাই এখন প্রশ্ন তোলেন!
এ কংগ্রেসের কিছু হতে পারে? যাদু-টোনা, আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ বা হীরক রাজার গবেষক ছাড়া সে মুরোদ কারও রয়েছে?
সব থেকে বড় কথা হল, রাহুলের যুদ্ধ ঘরে কার্যত নিষ্ঠাবান নেতা বা নেত্রীর ভেক ধরে আজ এমনও কয়েক জন থাকবেন, যাঁরা ইতিমধ্যে তৃণমূলকে বাগদান করে এসেছেন। এঁদের কারও উদয় হতে পারে তৃণমূলের একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে, কারও একটু পরে। কারণ, এখনই দল ছাড়লে সাংসদ পদ খুইয়ে উপ নির্বাচনের মুখে পড়তে পারেন।
তবে সমান দোষে দুষ্ট সর্বভারতীয় কংগ্রেসের বিপ্লবী কমান্ড্যাটটি। গত দেড় বছরের ব্যালেন্স শিট দেখলে বোঝা যাবে বাংলা ওঁর মানচিত্রেই ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র সাংসদ সংখ্যা দুই, বিধায়ক তিন জন। অথচ সেখানে শক্তি বাড়ানোর জন্য অমিত শাহ-র যে আগ্রহ দেখা যায়, রাহুলের কোথায়? সেই যে ২০১৬ সালের ভোটের সময় এসেছিলেন, তার পর আর তাঁকে দেখা গেছিল? গত চার বছর ধরে এ আই সি সি-র তরফে বাংলার পর্যবেক্ষক ছিলেন সিপি জোশী। তিনি চার বারও এসেছেন বাংলায়? রাহুল সে সবের খোঁজও রেখেছেন কি! উত্তরপ্রদেশ ভোটে সাতশ কোটি টাকা প্রচারে খরচ করে রাহুলের কংগ্রেস জিতেছিল মাত্র সাতটি আসন। তুলনায় বাংলায় ৪৫ টি বিধানসভা আসন জিতেছিলেন অধীর চৌধুরীরা। এ রাজ্যে কংগ্রেসের সাংসদ সংখ্যাও উত্তরপ্রদেশের থেকে বেশি। এর পরেও প্রদেশ কংগ্রেসের খরচ চালাতে দেড় বছরে সাত লাখ টাকাও কি দিয়েছেন দিল্লির কোষাধ্যক্ষ?
এখানেই শেষ নয়। কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক হিসাবে রাহুল এখন যাঁকে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই তিনি অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের ছেলে গৌরব গগৈ কতটা যোগ্য? নিজের রাজ্যে কংগ্রেসকে ঘুরে দাঁড় করানোর যাঁর জেদ নেই, তিনি পারবেন বাংলায় কংগ্রেসের ভাগ্য ফেরাতে?
এ সবের পরেও রেকাব গঞ্জের যুদ্ধ ঘরে বৈঠকের পর রাহুল ও বাংলা কংগ্রেসের রেকাবিতে আজ সাজানোর মতো একদম কিছু থাকবে না তাও বলা যাবে না। রাহুলের যেমন অভ্যাস, বৈঠকের পর হয়তো বলা হবে,-লোকসভা ভোটের দেরি আছে। এখন তৃণমূল বা বামেদের সঙ্গে জোট নিয়ে আলোচনার সময় নয়। এখন সংগঠন মজবুত করতে জোর দেওয়া হোক।
কিন্তু কে জোর দেবেন? অধীর চৌধুরী? আবদুল মান্নান ? প্রদীপ ভট্টাচার্য? সোমেন মিত্র?