
শেষ আপডেট: 29 August 2021 16:45
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর (prime minister) কথা আর কাজের সঙ্গে চুটকির সেই কাল্পনিক পাক নাগরিকের দেখছি দারুণ মিল। নরেন্দ্র মোদী (narendra modi) দেশের শাসনভার নেওয়ার পর যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো বলতে শুরু করেছিলেন, স্বাধীনতার পর দেশে কিছুই তেমন হয়নি। তিনি এবার দেশটা নিজের মতো করে গড়বেন।
বলাই বাহুল্য, এসব কথা বলার সময় মানুষ খানিক ইতিহাস বিমুখ হয়ে থাকেন। মোদীরও মনে ছিল না, তিনি বিজেপির দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। প্রথমজন অর্থাৎ দলকে যিনি দিল্লির সিংহাসনে আসীন করেছিলেন সেই অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারের অন্যতম স্লোগান ছিল, ‘ফিল গুড’ এবং ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’। সত্যি কথা বলতে কী, গ্রামে পাকা রাস্তা (প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা) এবং চওড়া, দ্রুতগতির জাতীয় সড়ক (সোনালি চতুর্ভুজ প্রকল্প)-এর জন্য বাজপেয়ীর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর কে না জানে, রাস্তাই অর্থনীতির আসল মেরুদণ্ড।
কিন্তু, ২০১৪ থেকে ২০২১, এই সাত বছরে নরেন্দ্র মোদী দেশে গড়লেনটা কী? উল্টে সেই পাক নাগরিকের মতো অন্যের সম্পদকে নিজের বলে চালানোর মতো তিনি অতীতে তৈরি রাষ্ট্রীয় সম্পদকে এতটাই আপন করে নিয়েছেন যে সেগুলি এবার একে একে বিক্রি করতে চলেছেন। সরকারি ভাবে, খাতায় কলমেও যদিও বলা হচ্ছে লিজ, কিন্তু ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইন ঘোষণা করে সরকারি সম্পত্তি বেসরকারি হাতে দেওয়ার যে ঘোষণা করা হয়েছে, তা বেসরকারিকরণেরই নামান্তর। অন্তত, অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে।
ঘটনাচক্রে এই স্বাধীনতার মাসেই, দিন কয়েক আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সে দেশে প্রধানমন্ত্রীর বিলাশবহুল বাড়িটি লিজ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। উদ্দেশ্য সরকারি কোষাগারে দু-পয়সা আনা।
আরও পড়ুন: পুরভোটের ঘণ্টা বাজালেন মমতা
পাকিস্তানের মতো দেউলিয়া অবস্থা অবশ্যই আমাদের নয়। কিন্তু ভারত সরকারের আর্থিক স্বাস্থ্য ভাল নয়। প্রধানমন্ত্রীর শরীর-স্বাস্থ্য বেশ ভালে। কিন্তু তাঁর সরকার যে অপুষ্টিতে ভুগছে তা আর চাপা নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের চাই লক্ষ্য হল, বন্দর, বিমানবন্দর, রেল, জাতীয় সড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ইত্যাদি বেসরকারি হাতে লিজ (privatisation) দিয়ে আগামী চার বছরে ছয় লাখ কোটি টাকা রোজগার করা। ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’-এর মতো নরেন্দ্র মোদী অতপর রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লিজে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে মেনেই নিলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেও দেশে বন্দর, বিমানবন্দর, রেল ইত্যাদি হয়েছিল।
বস্তুত, সেই সম্পত্তির ঠিকঠাক আর্থিক মূল্যায়ন করা গেলে হয়তো দেখা যাবে এদেশে রাষ্ট্রীয় বিত্তের কোনও অভাব নেই। যত গোলযোগ সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থায়। এমন অনেক রেলপথ, ট্রেন ইত্যাদি চালু করা হয়েছে যেগুলির প্রয়োজন ছিল না। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের নামে চালু করা কলকারখানাগুলি পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালনা করা হয়নি। হয়নি বন্দর, বিমানবন্দরের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার। কালের নিয়মে সম্পদের পরিবর্তে সেগুলি তাই হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের বোঝা। অনেকটা পুরনো জমিদার বাড়ির মতো। যেগুলি থেকে রোজগার দূরে থাক, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর ইত্যাদি খাতে বিপুল খরচের বোঝা বইতে হয়।
এমন সম্পদ বেসরকারি সংস্থাকে লিজ দিয়ে সরকারের ঘরে টাকা এলে সাধারণভাবে আপত্তি করার কিছু থাকে না। কিন্তু কথাটা বলা যতটা সহজ, কার্যক্ষেত্রে তা নয়। সংশয়, সন্দেহ দুটি কারণে।
প্রথমত, বিগত এক দশকের বাজেট প্রস্তাব খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, কলকারখানা, রেল, রাস্তা, উচ্চশিক্ষা, আধুনিক চিকিৎসার পরিকাঠামো গড়াতে সরকার অনেক আগেই হাত গুটিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, শিল্পে, পরিকাঠামোয় বেসরকারি উদ্যোগও সীমিত। দেশের তাবড় শিল্পমহল এখন সরকারের মুখাপেক্ষী। তাদের একমাত্র বাহাদুরি হল নতুন বোতলে পুরনো মদ বিক্রির মতো সরকারি সম্পদের গায়ে রং মাখিয়ে নিজের এবং নতুন বলে চালানো। ফলে দেশের অর্থনীতিতে ক্রমশই এক ফড়েরাজ কায়েম হচ্ছে যা এতকাল অত্যন্ত সীমিতভাবে পুরনো কলকারখানা বিশেষ করে জুটমিল, কটন মিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যার উদ্দেশ্য শুধুই মুনাফা, সম্পদ সৃষ্টি বা বৃদ্ধি কোনওটাই নয়।
দ্বিতীয়ত, ইউপিএ-র জমানায় কয়লাখনি লিজ, টুজি-র মতো কেলেঙ্কারি থেকে দেশ যে শিক্ষা পেয়েছে তা হল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির তথাকথিত সরকারি নীতির মধ্যেই স্বজনপোষণের রাস্তাটি খুলে রাখা হয়। যেটাকে বলা চলে পলিসি কোরাপশন বা নীতি-পোষিত দুর্নীতি। অর্থাৎ এমনভাবে নিয়মকানুন তৈরি করা হবে, যে সেগুলির সুবিধা পাবে কোনও বিশেষ শিল্পগোষ্ঠীই। শিল্প-বাণিজ্যে যে মনোপলি বা একচেটিয়া আধিপত্যের কথা বলা হয়, তাতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
এই প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর সরকার সেই ব্যবস্থাকেও যেন নিজেদের জন্য একচেটিয়া করে নিয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা বিলিয়ে। যে বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির বিলগ্লীকরণের কথা ঘোষণা করা হয়েছে তাতে সরকারের জায়গায় কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া দখলদারি কায়েম হলে তাতে হয়তো আমরা একদিন এমন পরিস্থিতির মুখে এসে দাঁড়াব, যে দেশের নামটিও বদলে নিয়ে বলতে হতে পারে, ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ... ইন্ডাস্ট্রিজ।
আর নরেন্দ্র মোদী! এই তো সেদিনও গর্বের সঙ্গে শুনিয়েছেন, একটা সময় তিনি চা বেচেছেন। আমরা ছাপোষা নাগরিক রোমাঞ্চিত, পুলকিত হয়েছি চা-বিক্রেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়ে। সেই তিনি চা বেচার বিদ্যা কাজে লাগাচ্ছেন দেশ বেচার কাজে। ম্যানেজমেন্টের কোনও ডিগ্রি ছাড়াই অসাধ্য সাধন করছেন তিনি।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'