
শেষ আপডেট: 25 June 2023 08:29
গুরুত্বপূর্ণ, স্মরণীয় ঘটনা-দুর্ঘটনার সূত্রে যাওয়া জায়গাগুলিতে সুযোগ পেলে রিভিজিট করা আমার বিশেষ আগ্রহের বিষয়। বিহারের জাহানাবাদের সেই গ্রামটিতে ২০১৫-র নভেম্বরে গেলাম ঠিক কুড়ি বছর পর। ১৯৯৫-এর বিহার বিধানসভার ভোট কভার করতে গিয়ে ওই গ্রামে দেখেছিলাম, গিজ গিজ করছে আধা সেনা। শুনলাম, স্বাধীনতার পর সব নির্বাচনেই ভোট লুঠ এবং ভোট বয়কট ছিল ওই এলাকায় দস্তুর। সেবার দোর্দণ্ডপ্রতাপ নির্বাচন কমিশনার টিএন শেসন তাই আধা সেনা নামিয়ে ভোটদানের ব্যবস্থা করেছেন। গ্রামবাসীদের মুখে শুনেছিলাম, আগের নির্বাচনগুলিতে কীভাবে ভোটের আগে গ্রামগুলি সব যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হত। পাখি মারার মতো হত্যা করা হত প্রতিপক্ষকে।

কুড়ি বছর পর ২০১৫-র বিধানসভা ভোটে সেই একই গ্রামে গিয়ে দেখি, এক প্রার্থীর এজেন্ট দুপুরে বাড়িতে খেতে গেলেন প্রতিপক্ষের এজেন্টের উপর সব দায়দায়িত্ব চাপিয়ে। ভোট হচ্ছে, বোঝার উপায় নেই। আধা সেনা দূরে থাক, হোমগার্ডও চোখে পড়ল না। দুপুরে গাছতলায় বাঁশের মাচায় বসে তাস খেলতে ব্যস্ত প্রবীণদের একজন আমার পরিচয় এবং উদ্দেশ্য জানার পর প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘বাঙ্গাল মে ইয়ে সব ক্যায়া হো রাহা হ্যায় দাদা। বিহার বদল গয়ি, আপলোগ অভি ভি বিহার বনে রহে হ্যয়।’ আসলে ক’দিন আগেই বিধাননগর পুরসভার ভোটের দিনে রক্তারক্তি কাণ্ড টিভিতে দেখেছেন বিহারের গ্রামের ওই বাসিন্দারাও। আমাকে কাছে পেয়ে তাই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন বয়স্ক মানুষটি। ঘাড় নাড়লেন বাকিরা। নির্বাক থেকে ফিরে আসা ছাড়া আমার উপায় ছিল না।
অথচ, এই একটা সময় ভোট-বিহার-হিংসা ছিল সমার্থক। এই বিষয়েই বিহারের বন্ধু-সাংবাদিক শ্রীকান্ত বছর পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ আগে বই লিখেছেন। সেই বিহারে সেবার, অর্থাৎ ২০১৫-র ভোটে অশান্তির ঘটনা বলতে ভোটের দিন মুখ্যমন্ত্রীর বুথে একটি বাঁদরের উৎপাত। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৪-র লোকসভা ভোট নিয়ে অক্সফোর্ড ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে হওয়া একটি স্টাডি রিপোর্টে বলা হয়, সেবার দেশের মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন নির্বাচন হয়েছিল বিহারে।

তাই, ‘রাজ্যটা কি বিহার হয়ে গেল?’ খেদের সঙ্গে এমন কথা বলার অধিকার অন্তত ভোটের ক্ষেত্রে আমরা হারিয়েছি। হয়তো আরও অনেক কিছুতেই বিহার, ওড়িশা আমাদের ছাপিয়ে গিয়েছে। গত বছর বিহারে পঞ্চায়েত ভোট হয়েছে দশ দফায়, তিন দফায় হয়েছে ওড়িশায়। দুই রাজ্যেই মৃত্যু শূন্য। আর আমাদের ভাবতে হচ্ছে, মৃত্যুতে ২০২৩ আগের পঞ্চায়েত ভোটগুলিকে ছাপিয়ে যাবে না তো! আধা সেনা হয়তো সব বুথে থাকবে। কিন্তু সেনা নামালেও কি আমরা মৃত্যু শূন্য ভোটের কৃতিত্ব অর্জন করতে পারব?
বাংলার রাজনীতি, নির্বাচন, বিশেষ করে পঞ্চায়েত ভোট ঘিরে অশান্তির ঘটনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে পত্র-পত্রিকায়। আইনের পথেই পঞ্চায়েত ও পুরসভার হাতে প্রচুর ক্ষমতা আছে। ক্ষমতা থাকলে খেয়োখেয়ি স্বাভাবিক। পঞ্চায়েতের হাত দিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়। সেই টাকায় ভাগাভাগি নিয়ে অশান্তি, বিবাদ স্বাভাবিক। রাজ্যে কলকারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য নেই। গ্রামে আর্থিক কর্মকাণ্ড স্তব্ধ। নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। অতএব সরকারি স্কিমের উপর ভরসা বাড়বেই। সুবিধা বিলিয়ে ভোটারকে দলদাস করে তোলার দৌড়ে শাসক দলের এগিয়ে থাকা, দাদাগিরিও অস্বাভাবিককাণ্ড নয়। পূর্বসূরি শাসকেরা সেই ঐতিহ্য মজবুত করে দিয়ে গিয়েছেন।
সুবিধাদি নিয়ে সংঘাতই হিংসার কারণ বলে অনেকের অভিমত। হয়তো অনেকটাই ঠিক। কিন্তু এসবই বিহার, ওড়িশার-সহ অনেক রাজ্যের জন্য সত্য। বিহার, ওড়িশার গ্রাম থেকেও লাখ লাখ মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে পাড়ি দেয়। কই সেখানে গ্রামের ভোটে তো কারও প্রাণ যায় না।

বাংলা তবে ব্যতিক্রম কেন?
কারণ, অনুসন্ধানে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিযুগে বিপ্লবীদের লড়াই-সংগ্রামের দিনগুলিতেও। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময়ের দাবি মেনেই স্বাধীনতার সেনানিরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁরা জানতেন, এই অসম লড়াইয়ে ব্রিটিশের প্রাণ কাড়ার চেয়ে সম্ভাবনা শতগুণ বেশি প্রাণ যাওয়ার। দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার সংকল্পই কাজ করেছিল ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকি, সূর্য সেন, প্রীতিলতা, বাঘাযতীন, ওদিকে ভগৎ সিংহের মতো বিপ্লবীদের মধ্যে। বোমা-বন্দুক হাতে তুলে নেওয়ার পিছনে কাজ করেছিল আত্মবলিদানের সংকল্প। সেই পথ সঠিক কী বেঠিক তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক তখনই হয়েছে। এই বিষয়ে আর গভীরে যাচ্ছি না। এই নিবন্ধের বিষয় সেই বিতর্ক নয়।
ঘটনা হল, স্বাধীনতার পর অস্ত্রগুলি কেউ নদীতে ভাসিয়ে দেয়নি। অস্ত্র রইল, মুছে গেল দেশ ও দশের জন্য আত্নবলিদানের সংকল্প। অস্ত্রগুলি ব্যবহৃত হতে থাকল দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কাজে। কমিউনিস্ট পার্টির রাষ্ট্রশক্তিকে মোকাবিলার রাজনীতি অস্ত্রের প্রয়োজনকে প্রাসঙ্গিক করে তুলল, নকশাল আন্দোলন একেবারে শিলমোহর দিল শ্রেণিশত্রু হত্যাকে। চারু মজুমদার বললেন, শত্রুর রক্তে হাতে না রাঙালে কীসের বিপ্লবী! তাই বোমা, বন্দুক নয়, ছুরি দিয়ে মানুষ খুনের নিদান দিলেন। রাজনীতিতে হিংসা এবং অস্ত্রের প্রয়োজন আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে সেই পর্ব।

স্বাধীনতা পরবর্তী বেশ কিছু বছর কংগ্রেস সরকারি ক্ষমতার জোরে পাল্টা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে হিংসার রাজনীতির মেয়াদ ও গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলল। সেই সঙ্গে পুলিশ প্রহরায় নিজেরাও জায়গা বিশেষে অস্ত্র হাতে তুলে নিল। বাংলায়, বামপন্থীরা তাই পাকাপাকিভাবে ক্ষমতাসীন হওয়া মাত্র কংগ্রেসকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে গ্রামে সন্ত্রাসের জাল বিস্তার করে। ’৭৭-এ তৃতীয় দফায় বাম শাসনের সূচনার আগে এবং পরবর্তী কয়েক বছর নির্বাচন ছাড়াও গ্রামবাংলার রক্তস্নান দস্তুর ছিল ধানকাটার মরশুমে। লোক দেখানো সর্বদলীয় বৈঠক একটা হত বটে, কিন্তু হিংসা থামাতে পুলিশ কিছুই করত না। ফলে বাম জমানায় বিহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাতেও গণহত্যার রাজনীতি সমানতালে চলেছে। শুধু কারণটাই যা ভিন্ন ছিল।
একটা বিষয় লক্ষণীয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিযুগের বিপ্লবী আর স্বাধীন দেশে বিপ্লবী আন্দোলনে শহিদের সঙ্গে বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক হিংসার বলি হওয়া মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের বিস্তর ফারাক। বিপ্লবী আন্দোলনের শহিদদের অনেকেই সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের, তুলনায় বিগত কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার রাজনীতির বলি মানুষেরা সংখ্যায় বেশিরভাগই প্রান্তিক অংশের মানুষ, দলিত, সংখ্যালঘু। সহজ কথায় গরিব, অসহায়। দল বা ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীই যাদের জীবনে বটবৃক্ষ। দারিদ্র, অশিক্ষা, রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝতে না পারা সেই মানুষদের ডান-বাম সব পক্ষই সচেতনভাবে ঠেলে দিচ্ছে না তো? ‘এলিট’ বাংলায় এই ব্যাপারে কোনও সর্বদলীয় সহমত তৈরি হয়ে যায়নি তো? নিহতের রাজনৈতিক পরিচয়েই বিতর্ক থেমে থাকা বাঞ্ছনীয় নয়।
এ বছরের পঞ্চায়েত ভোটের বাকি দিনগুলি হিংসা মুক্ত রাখার নানা আয়োজনের কথা জানা যাচ্ছে। আদালত অতিসক্রিয়। আধা সেনার ঘেরাটোপে বাকিদিন গুলিতে জীবনহানি আটকানো গেলে তার চেয়ে ভাল কিছু আর হতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন তো থেকেই যায়, তারপর কী হবে? ভোটপর্ব মিটে গেলে, আধা সেনা চলে গেলে বাংলার গ্রাম কি শান্তির মরূদ্যান হয়ে উঠবে? অতীত বলছে, সে সম্ভাবনা নিছকই কষ্ট কল্পনা। বরং প্রতিহিংসার রাজনীতি নতুন চেহারায় অবতীর্ণ হতে পারে।

বিহারের সেই প্রবীণের প্রশ্নটি আজও মনে নাড়া দেয়। তাঁর অনুচ্চারিত প্রশ্নটি ছিল বাংলায় রাজনীতির নামে খুনোখুনির অবসান হবে কবে? উত্তরটা অজানা। কারণ, হিংসার কারণ আমরা অনুসন্ধান করিনি।
আসলে রাজনৈতিক নীতি, নৈতিকতার মোড়কের আড়ালে চলে আসা এই হিংসার আমরা মুক্ত কণ্ঠে নিন্দা করিনি। বরং খুন-সন্ত্রাসে ‘আমরা-ওরা’ রাজনীতি টেনে এনে হত্যার রাজনীতিকে মান্যতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সমাজের শিক্ষিত, প্রভাবশালী অংশও নানা সময়ে হিংসা, খুনের রাজনীতিকে মান্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা বিহার, উত্তরপ্রদেশে জাতপাত, ধর্মের সংঘাত ঘিরে হওয়া গণহত্যাকে ঘৃণা করে বাংলার রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে গর্ব করেছি। বিহারে, উত্তরপ্রদেশে জাতপাতের সংঘাত কমেছে, কমেছে জাতের প্রশ্নে খুনোখুনি। লালুপ্রসাদ, রামবিলাস, নীতীশ কুমার, মুলায়ম সিংহ যাদব, মায়াবতী, অখিলেশদের মতো মধ্য ও প্রান্তিক অংশের লোকেরা রাজনীতির শিখরে পৌঁছেছেন। ফলে জাতপাতের সংঘাত ঘিরে হত্যা, গণহত্যায় লাগাম দেওয়া গিয়েছে। বাংলায় দল নির্বিশেষে রাজনীতিতে নেতৃত্বের দখলদারি মধ্য ও উচ্চবিত্ত এলিটদের কুক্ষিগত। যাদের ঈশারায় দলের ঝাণ্ডা হাতে রাজনীতির প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে মরতে হচ্ছে গরিব মানুষকে।