
শেষ আপডেট: 22 October 2023 17:17
সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ালে ছবির পোস্টার সাঁটা অনেক দিন হল প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একটা সময় সেটাই ছিল শহরের দৃশ্য দূষণের অন্যতম কারণ। বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং ছিল হাতে গোনা। তবে নাটক-সিনেমার পোস্টার কিছু বাছাই করা জায়গায় লাগানো হত, শহরের যত্রতত্র নয়।
বাংলায় রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনের একটা ঐতিহ্য আছে। তা গণ-আন্দোলনের অংশ। তা নিয়ে বাড়াবাড়িও ছিল ততোধিক দাদাগিরির সংস্কৃতি। ২০০৬ সালে বিধানসভা ভোটের মুখে নির্বাচন কমিশন রাজ্যের ১৯৭২ সালে তৈরি অব্যবহৃত একটি আইন প্রয়োগ করে দেওয়াল লিখনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে সব দলই আপত্তি করে। পরে আইন সংশোধন করে অনুমতি সাপেক্ষে দেওয়ার লেখার অধিকার ফিরিয়ে দেয় সরকার। যদিও অনুমতি নেওয়ার বালাই আজও নেই। জোর যার মুলুক তার সংস্কৃতিই চলছে। একটি ভোটের সময় লেখা দেওয়াল মোছা হয় পরের ভোট এলে। বিগত শাসকেরা যে সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, বর্তমান শাসক দল সেটাই অনুসরণ করে চলেছে। আর এবারের পুজোয় পথঘাট, অনেক প্যান্ডেল লাগোয়া এলাকা দেখে মনে হচ্ছে রাজ্যে কাল-পরশু বুঝি ভোট। বিশেষ করে তৃণমূল ও বিজেপির নেতাদের ছবির বহর দেখে এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
বামপন্থী দলগুলিতে নেতা-মন্ত্রীর ছবি দিয়ে পোস্টার দেওয়ার রেওয়াজ তেমন এতটা ছিল না। সিপিএমের সভা-সমিতিতে প্রধান বক্তা জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের নাম একটু বড় হরফে লেখা হত, ছবি বলতে গেলে থাকতই না। ২০০৬-এর বিধানসভা ভোটের প্রচারে সিপিএম বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ছবি-সহ কিছু পোস্টার-ব্যানার ছাপালে দলের অনেকেই আপত্তি তোলেন। অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সিপিএমও বদলে গিয়েছে। তবে নেতাদের ছবি দলের সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ।
ডানপন্থী দলগুলি আবার প্রথম থেকেই ভিন্ন পথের অনুসারী। নেতাদের ছবি সামনে রেখে রাজনীতি করাটাই চালু সংস্কৃতি সেখানে। তবে সেটা কখনই ২০১১ পরবর্তী তৃণমূল জমানার মতো নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসে থাকার সময় থেকেই অনুগামীরা তাঁর ছবি সামনে রেখে লড়াই করতেন। তিনি দল গড়ার পর তাঁর ছবিই ক্রমে তৃণমূলের আসল পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর স্বভাবতই নেত্রীর ছবির ব্যবহার আরও বেড়েছে।
কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ছবি ছাড়া রাজনীতি করা যায় না, এমন অলিখিত ব্যবস্থাই যেন চালু হয়ে গিয়েছে এই দলে। রাঘববোয়াল থেকে চুটোপুটি, তৃণমূলের নেতা মানেই এলাকায় যত্রতত্র তাঁর ছবি শোভা পাবে, এটাই যেন দস্তুর। পথে প্রতি মুহূর্তে শাসক দলের নেতার ছবি জানান দিচ্ছে এলাকা কার দখলে, স্থানীয় এমএলএ, এমপি কে, কে ব্লক সভাপতি, কে সভাধিপতি, পঞ্চায়েত প্রধান, পুরসভার চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর-- নেতা-মন্ত্রীর ছবি দেখে বোঝা যায় কোন এলাকা ধরে চলেছি। এটাই সারা বছরের ছবি।
একে তো বিজ্ঞাপনে ঢেকে আছে গোটা শহর, মফস্বল। গাছপালা, শহরের বাড়িঘর, কিছুই দেখার উপায় নেই। তার উপর নেতাদের রং-বেরংয়ের ছবির পোস্টার, ব্যানার, হোর্ডিংয়ে আকাশ ঢেকে যাওয়ার পরিস্থিতি। দৃশ্য দূষণের চূড়ান্ত। মন্দের ভাল, এই সুবাদে পোস্টার, ব্যানার, হোর্ডিংয়ের ব্যবসায়ীরা সারা বছর ব্যবসা পেয়ে থাকেন।
ব্যবসা আরও বেড়েছে রাজ্য-রাজনীতিতে বিজেপির উত্থানের ফলে। ভারতের শাসক দল এখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী পার্টি। টাকা-পয়সায় তাদের সঙ্গে বাকিদের তুলনা চলে না। তৃণমূলের মোকাবিলায় পদ্ম শিবিরের সস্তা কৌশলটি হল যত খুশি পতাকা আর নেতাদের ছবি-সহ পোস্টার, ব্যানার, হোর্ডিং দিয়ে দলের উপস্থিতি জানান দেওয়া। ফলে রাজ্যে দৃশ্য দূষণের অন্যতম বিষয় এখন দুই ফুলের পার্টির পতাকা আর নেতাদের ছবি দেওয়া পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, হোর্ডিং। বহু রাস্তায় ছ’মাস-এক বছর আগে হওয়া পার্টি পোগ্রামের সময় রাস্তায় তৈরি তোরণ এখনও দিব্যি আছে। সেগুলিতেও শোভা পাচ্ছে নেতা-নেত্রীর হাতজোর করার ছবি। তাতে দুর্নীতির মামলায় জেল খাটা নেতারাও বাদ নেই। সুন্দর প্রতিমা, প্যান্ডেলের সঙ্গে এই সব পচা মুখগুলিও দেখতে হচ্ছে।
এবারের দুর্গাপুজোয় সেই ছবি ঘৃণ্য কালচার ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। প্যান্ডেলের পাশে, রাস্তার দু’ধারে রাজ্য ও কেন্দ্রের শাসক দলের নানা স্তরের নেতার ছবি এবারের মতো অতীতে দেখা যায়নি।
এমনিতেই বিগত কয়েক বছর যাবত দুর্গাপুজোর দখল নিয়ে তৃণমূল-বিজেপির লড়াইয়ে দুই দলের প্রথমসারির নেতারা নেমে পড়েছেন। লড়াই এতটাই যে, রাজ্য সরকারের পুজো অনুদান প্রকল্পের বিরোধিতা করা বিজেপি দলীয় তহবিলের টাকা ঢেলে বেশ কিছু সর্বজনীন পুজোর দখল নিয়েছে। বীরভূমে অনুব্রত মণ্ডলের দখলে থাকা তিনটি সর্বজনীন পুজোয় বিজেপি এবার বিপুল টাকা ঢেলেছে। রাজ্যের নানা প্রান্তে এমন বেশ কিছু বিজেপির স্পনসর করা পুজোয় এবার কেন্দ্রের নেতা-মন্ত্রীরা উদ্বোধন করেছেন। অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, কে না এসেছেন! গদি টিকে গেলে আগামী বছর প্রধানমন্ত্রীর আসাও অসম্ভব নয়। তাছাড়া ভার্চুয়ালি উদ্বোধনের ব্যবস্থা তো আছেই।
দুর্গা পুজো বাংলার অন্যতম উৎসব। এমন উৎসবে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর যোগদান অস্বাভাবিক নয়। বরং মানুষের সঙ্গে মেলামেশায় সর্বজনীন পুজোর বিকল্প নেই। যে কারণে ঠাকুর-দেবতায় অবিশ্বাসী বামদলগুলিও পুজোতেই দলের পত্র-পত্রিকা বিক্রির অভিযান চালিয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে একদা কংগ্রেস, অধুনা তৃণমূলের বহু নেতাকে রাজ্যের মানুষ পুজো উদ্যোক্তা হিসাবে প্রথম চিনেছে। দক্ষিণ কলকাতায় পার্থ-ববি-অরূপের পুজো তারমধ্যে অন্যতম। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের একডালিয়া এভারগ্রিনের পুজো বরাবর বাঙালির অবশ্য গন্তব্য। উত্তরে সুজিতের পুজো, মধ্য কলকাতায় প্রদীপ, রেল প্রদীপের পুজোর কথা লোকের মুখে মুখে ঘোরে। সেগুলিতে নেতার ছবির রমরমা দেখা যায়নি এতকাল। আর এবারের মতো গোটা রাজ্যে নেতার ছবিতে ঢাকা পড়েনি দুর্গোৎসব। বাঙালির অন্যতম উৎসবকে এবার গ্রাস করেছে এই নয়া অপসংস্কৃতি।
পুজোয় সরকারি অনুদানের শর্ত হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেওয়া ব্যানার বহু প্যান্ডেলে শোভা পায়। রাজ্যের প্রধান শাসকের পুজোর শুভেচ্ছাবাহী ব্যানার না হয় মানা গেল। কিন্তু যত্রতত্র তৃণমূল, বিজেপির নেতাদের ছবি কেন? প্রয়াত অজিত পাঁজা পুজো, ইদ উপলক্ষে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার, ব্যানার দিতেন। পুজো প্যান্ডেল দখল করেননি। সোমেন মিত্র কালী পুজো করতেন। সেই মণ্ডপে বা আশপাশে কখনও তাঁর ছবি শোভা পায়নি। এই সংস্কৃতি ছিল না।
নেতাদের ছবি টাঙানো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তৃণমূলে নানা নিয়মবিধির কথা শোনা গিয়েছে। তেমন কিছু সত্যিই বলবৎ থাকলে নেতা-নেত্রীর ছবি গোটা রাজ্যে দৃশ্য-দূষণের কারণ হত না। বিজেপিতে আবার এই ধরনের বিধির কথা শোনা যায়নি কখনও।
সর্বজনীন পুজোর সঙ্গে বাম দলগুলির সম্পর্ক একটা সময় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় ছিল। বহু বছর আগে গণশক্তি-র শারদ সংখ্যায় নিবন্ধ লিখে বিমান বসু স্পষ্ট করে দেন মামনুষের উৎসবে পার্টি কর্মীরা সহযোগীর ভূমিকা নেবেন। প্রয়াত সিপিএম নেতা সুভাষ চক্রবর্তী কোনও কালেই পার্টির চাপিয়ে দেওয়া নিয়মকানুন মানতেন না। পুজোর সময় তাঁর ব্যস্ততা বেড়ে যেত। পুজো উদ্বোধনের মঞ্চে হাসিমুখে হাজির হতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল ক্লাব-সংগঠন হল মানুষের এলাকার মিলন মঞ্চ। কমিউনিস্ট পার্টি এগুলিকে উপেক্ষা করতে পারে না। ক্লাব ঘিরে ডান-বাম রাজনৈতিক যোগও আড়ালে ছিল না। কিন্তু আজকের মতো দুর্গাপুজোকে নেতাদের ছবিতে ঢেকে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল না। বাংলার প্রধান উৎসবটি ঘিরে এই নয়া অপসংস্কৃতি ভয়ঙ্কর, চরম দুর্ভাগ্যের, যা আদতে রাজনীতিতে দখলদারি, জমিদারির নয়া প্রবণতা।