প্রজাতন্ত্রের শক্তি কেবল তার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়িত্বের মধ্যেই নিহিত নয়, বরং জনগণের বাস্তব জীবনের সঙ্গে শাসনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার অবিরাম প্রচেষ্টার মধ্যেও নিহিত।

শেষ আপডেট: 26 January 2026 00:07
১৯৫২ সালের ১৬ মে, প্রথম নির্বাচিত সংসদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ সেই মুহূর্তটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেছিলেন। তিনি সদস্যদের এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, এটি ভারতের যাত্রাপথের কেবল একটি পর্যায় সম্পন্ন হওয়ারই ইঙ্গিত দেয় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে, 'কোনও জাতি বা জনগণের অগ্রযাত্রার পথে বিশ্রাম নেওয়ার কোনও অবকাশ থাকবে না।'
এটি ছিল একটি সুক্ষ্ম অথচ গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব অর্জিত হলেও, প্রজাতন্ত্রের কাজ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ড. প্রসাদের ভাষায়, ভারতের সামনে আসল কাজ ছিল “আমাদের জনগণের জন্য কিছুটা সুখ বয়ে আনা এবং তাঁদের দুর্ভোগের বোঝা লাঘব করা'—এই দায়িত্বই নতুন প্রজাতন্ত্রের নৈতিক উদ্দেশ্যকে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
গণতান্ত্রিক শাসনের কেন্দ্রে এই নৈতিক বাধ্যবাধকতাকে স্থাপন করে ড. প্রসাদ রাষ্ট্র এবং তার জনগণের মধ্যে সম্পর্ককে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। ভারত আর প্রজাদের জাতি থাকবে না, বরং নাগরিকদের সাধারণতন্ত্র হবে—যাঁরা রাজনৈতিকভাবে সমানাধিকারী, সংবিধান দ্বারা আবদ্ধ এবং একটি অভিন্ন জাতীয় যাত্রাপথে সহযাত্রী হিসেবে ঐক্যবদ্ধ।
সুতরাং, ভারতীয় সাধারণতন্ত্র কেবল স্বাধীনতার ফলস্বরূপ জন্ম নেয়নি, বরং এটি একটি সচেতন সাংবিধানিক পছন্দের ফসল, যা গণতন্ত্রকে তার প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠা করেছিল। গণতন্ত্রকে প্রায়শই 'জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য' সরকার হিসেবে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়—এই বাক্যটিই এর অপরিহার্য দর্শনকে ধারণ করে।
'জনগণের' নীতিটি সংবিধান গ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল, যা নাগরিকদের হাতে সার্বভৌমত্ব অর্পণ করেছিল এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সাংবিধানিক সীমার অধীন করেছিল। 'জনগণের দ্বারা' নীতিটি ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে প্রকাশ পেয়েছিল, যখন সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয়কে, প্রেক্ষিত নির্বিশেষে, সমান রাজনৈতিক অধিকার প্রদান করেছিল।
তবে, তৃতীয় ধারাটি, 'জনগণের জন্য', রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকদের ক্ষমতায়ন এবং মঙ্গল নিশ্চিত করার একটি চলমান বাধ্যবাধকতাকে বোঝায়। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ অবশ্যই আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত হতে হবে। ভারতীয় সংবিধানও জনগণের কল্যাণের প্রসারের জন্য একটি সামাজিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেয়।
একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করে শাসনব্যবস্থা কতটা জনগণের সেবা করে তার উপর। গণতান্ত্রিক বৈধতা কেবল পদ্ধতির মাধ্যমে নয়, বরং কর্মক্ষমতার মাধ্যমে টিকে থাকে—অর্থাৎ সামাজিক চাহিদা পূরণে, বৈষম্য কমাতে এবং মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রাখতে রাষ্ট্রের সক্ষমতার মাধ্যমে। একটি প্রজাতন্ত্রের শক্তি পরিমাপ করা হয় তার দুর্বলতম নাগরিকদের প্রতি আচরণের মাধ্যমে।
ভারতীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারা ধারাবাহিকভাবে গণতন্ত্রের একটি মানব-কেন্দ্রিক উপলব্ধির উপর জোর দিয়েছে। প্রাচীন ভারতে, ‘যোগ-ক্ষেম’ ধারণাটি ব্যক্তির মঙ্গল ও সুরক্ষার কথা বলত। মহাত্মা গান্ধীর সর্বোদয়ের ধারণা সকলের, বিশেষ করে সমাজের শেষ ব্যক্তির উত্থানের কথা কল্পনা করেছিল। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের একাত্ম মানববাদ উন্নয়নের একটি সামগ্রিক, মানব-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে।
সমসাময়িক শাসনে, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ ধারণাটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জন-কেন্দ্রিক শাসনের প্রতি একটি স্থায়ী আদর্শিক প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি। এই প্রতিশ্রুতি, যেখানে রাষ্ট্র দুর্বলতম এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিয়ে সক্রিয়ভাবে 'মানুষের জন্য' কাজ করে, তা প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে গত ১২ বছরে অসাধারণ ফলাফল দিয়েছে। সরকার আদর্শ দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব কর্মে রূপান্তরিত করেছে, যা সমাজের প্রতিটি কোণ এবং প্রত্যেক স্তরে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পৌঁছে দিয়েছে।
সংবিধানের চতুর্থ অংশ অনুসারে, রাষ্ট্র ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক কাজের পরিবেশের জন্য বিধান তৈরি করতে বাধ্য। ঊনত্রিশটি শ্রম আইনকে চারটি সমন্বিত শ্রম কোডে সংহত করার মাধ্যমে, সাংবিধানিক নির্দেশিকা অনুসারে শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ প্রচারের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
গত দশকে, 'জনগণের জন্য' অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচারকে ক্রমবর্ধমান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের স্প্রিং ২০২৫ দারিদ্র্য ও সমতা বিষয়ক সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন অনুসারে, গত দশকে ভারত ১৭ কোটি ১০ লক্ষ মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে। ইতিবাচক পদক্ষেপের লক্ষ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বিভাগগুলিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসংস্থানে সংরক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীগুলোর মর্যাদা ও সমতা বজায় রাখতে এবং তাঁদের জন্য বাস্তবসম্মত ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আইন, ২০১৬ এবং মুসলিম মহিলা (বিবাহে অধিকার সুরক্ষা) আইন, ২০১৯-এর মতো প্রগতিশীল আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
এই জন-কেন্দ্রিক শাসনের অন্যতম শক্তিশালী উদাহরণ হলো স্বচ্ছ ভারত মিশন (এসবিএম)। এই মিশনটি তৃণমূল পর্যায়ে 'জনগণের জন্য' গণতান্ত্রিক আদর্শকে কার্যকর করেছে। এটি কেবল একটি স্যানিটেশন উদ্যোগের চেয়েও অনেক বেশি কিছু ছিল; এটি মানব মর্যাদা, জনস্বাস্থ্য, নারীর নিরাপত্তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির উপর কেন্দ্র করে একটি দেশব্যাপী আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত একটি বিষয়কে সমাধান করার মাধ্যমে, স্বচ্ছ ভারত মিশন এই শতাব্দীর বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সফল জন-নেতৃত্বাধীন ও জন-চালিত গণআন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সুযোগ ও মর্যাদার সমতা নিশ্চিত করার জন্য বঞ্চিত, স্বল্প-সক্ষম, বয়স্ক এবং ব্যক্তিগত দুঃখ/দুর্ভোগের সম্মুখীন ব্যক্তিদের কল্যাণ অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনার অধীনে ৮০ কোটিরও বেশি মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ এর একটি উদাহরণ।
লক্ষ লক্ষ ভারতীয় পরিবারের জন্য, প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বিমা যোজনা কেবল একটি নীতির চেয়েও বেশি কিছু—এটি তাঁদের সবচেয়ে কঠিন সময়ে মর্যাদা এবং আশার প্রতীক। ৫৩% সুবিধাভোগী নারী এবং ৭২%-এর বেশি গ্রামীণ ভারতের বাসিন্দা হওয়ায়, এই প্রকল্পটি দেশব্যাপী জীবন বিমার সুযোগ প্রসারিত করেছে।
যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আত্মনির্ভর ভারতের জন্য আহ্বান জানান, তখন এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক স্লোগান ছিল না, বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ে আত্মনির্ভরশীলতারই একটি সম্প্রসারণ ছিল। মুদ্রা যোজনা এবং স্কিল ইন্ডিয়া মিশনের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নাগরিকদের আত্মনির্ভরশীল, উদ্যোক্তা এবং নিজেদের ক্ষমতায় আত্মবিশ্বাসী করে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। আত্মনির্ভরশীলতা ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসনের মূলে রয়েছে এবং এই পদক্ষেপগুলো এটিকে একটি নির্ণায়ক গতি দিয়েছে। একইভাবে, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প সম্মানজনক ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করে স্বাধীনতার প্রসার ঘটিয়েছে, অন্যদিকে জন ধন যোজনা লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার আওতায় এনেছে।অসাধু মহাজনদের উপর নির্ভরতা থেকে তাঁদের মুক্ত করে, এটি সেইসব মানুষকে আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত ছিল।
‘জনগণের জন্য’ শাসনের এই একই গণতান্ত্রিক তাগিদ নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়মে শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে, যা লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে।
এই সংস্কারটি সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের সামাজিক ভিত্তি প্রসারিত করে ‘জনগণের দ্বারা’ নীতিকে শক্তিশালী করে। এটি প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাজের বৈচিত্র্যের আরও বেশি প্রতিফলন ঘটিয়ে ‘জনগণের দ্বারা’ নীতিকে সমৃদ্ধ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, এটি নিশ্চিত করে যে শাসনের ফলাফলগুলো যেন বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়, যার মাধ্যমে ‘জনগণের জন্য’ নীতিটি আরও এগিয়ে যায়।
সুতরাং, ভারতের গণতান্ত্রিক যাত্রা কোনও স্থির সাংবিধানিক অর্জন নয়, বরং এটি একটি চলমান জাতীয় প্রকল্প। সংবিধান এবং নির্বাচন গণতন্ত্রের কাঠামো প্রতিষ্ঠা করলেও, প্রজাতন্ত্র টিকে থাকে সংবেদনশীল শাসন, নৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার সাথে অবিরাম সংযোগের মাধ্যমে। গণতন্ত্র তার প্রকৃত অর্থে তখনই টিকে থাকে, যখন রাষ্ট্র ‘জনগণের জন্য’ শাসন করার প্রতি অবিচলভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে।
প্রজাতন্ত্রের শক্তি কেবল তার প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়িত্বের মধ্যেই নিহিত নয়, বরং জনগণের বাস্তব জীবনের সঙ্গে শাসনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার অবিরাম প্রচেষ্টার মধ্যেও নিহিত। প্রতিটি প্রজন্মকে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি নবায়নের জন্য আহ্বান জানানো হয়—যে স্বাধীনতাকে অবশ্যই সকলের জন্য মর্যাদা, সুযোগ এবং ন্যায়বিচারে রূপান্তরিত করতে হবে। ভারতীয় সাধারণতন্ত্র কোনও সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া প্রকল্প নয়; এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব, যা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে টিকে থাকে এবং রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কতটা বিশ্বস্ততার সঙ্গে সেবা করে, তার মাধ্যমেই এর বিচার হয়।
এই ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসে বলা যায় যে, আজ নাগরিকরাই শাসনের কেন্দ্রে রয়েছে এবং ভারতীয় সাধারণতন্ত্র এগিয়ে চলেছে, সামাজিক ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করছে, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে সম্ভব করে তুলছে এবং একটি কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সুসংহত করছে।
(লেখক ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত)