Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেইWeather: পয়লা বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআইWest Bengal Election 2026 | হার-জিত ভাবিনা, তামান্না তো ফিরবেনা!

মার্ক টালি—পূর্ণতা‌ ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচা এক সাংবাদিক, যাঁকে বিদায় জানাতে আমার কষ্ট হয়

প্রতিবেদনের লেখক সুবীর ভৌমিক সতেরো বছর ধরে বিবিসির পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সংবাদদাতা ছিলেন। মার্ক টালিই তাঁকে বিবিসিতে নিয়ে আসেন এবং তিনি বহু বছর তাঁর সঙ্গে কাজ করেন।

মার্ক টালি—পূর্ণতা‌ ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচা এক সাংবাদিক, যাঁকে বিদায় জানাতে আমার কষ্ট হয়

পৃথা ঘোষ

শেষ আপডেট: 26 January 2026 00:12

সুবীর ভৌমিক

মার্ক টালি চলে গেলেন। বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরোর দীর্ঘদিনের এই সাবেক প্রধান প্রতিষ্ঠানটির মতোই ভারতকেও আপন করে নিয়েছিলেন। ‌ রবিবার দিল্লিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন টালি।

মার্কের বয়স হয়েছিল ৯০। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি ভাল ছিলেন না। ভারতের সবকিছুর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসাই আংশিকভাবে এর জন্য দায়ী ছিল। ভাল-মন্দ—সবকিছুকেই একই অবিচল হাসি সহযোগে গ্রহণ করার ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল। তাঁর কাছে তেমন কিছুই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না—সবই জীবনের অংশ।

আমার এবং আমার বহু দক্ষিণ এশিয় সহকর্মীর কাছে—যাঁরা এমন এক সময়ে বিবিসি'তে কাজ করে নাম করেছিলেন—মার্ক ছিলেন তাঁদের পিতৃসদৃশ এক ব্যক্তিত্ব, অভিভাবক ও শিক্ষক, যাঁর জন্যই সবকিছু সম্ভব হয়েছিল। তিনি দক্ষিণ এশিয় প্রতিভায় বিশ্বাস করতেন‌ আমাদের আঞ্চলিক দক্ষতার ওপর আস্থা রাখতেন এবং লন্ডন থেকে আসা কিছু অতিমূল্যায়িত, সবজান্তা ভঙ্গির বড়কর্তাদের মতো নিজেকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতেন না। গভীরভাবে বিনয়ী মানুষ মার্ক জানতেন, এই অঞ্চলের বিপুল জটিলতা বিবিসি সামলাতে পারবে কেবল তখনই, যখন লন্ডনের বড়কর্তারা মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকদের ওপর ভরসা রাখবেন।

একই সঙ্গে তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে আমাদের খবরগুলি বিপণন করতে হবে। কীভাবে সেগুলিকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে হাজির করতে হয়। স্থানীয় থেকেই আমরা হয়ে উঠেছিলাম বৈশ্বিক।মাটিতে পা রেখেই উপলব্ধি করতাম এখানকার কোনও ঘটনা কেন দূরের দর্শকের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮৬ সালের এক গ্রীষ্মের দুপুরে, বিবিসি দিল্লি ব্যুরোর তৎকালীন সেকেন্ড-ইন-কমান্ড সতীশ জ্যাকব—আর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী—আমাকে দিল্লির নিজামুদ্দিনের ১ নম্বর বাড়িতে টালির অফিস-কাম-বাসভবনে নিয়ে গেলেন। আমি ভেবেছিলাম, স্যুট পরা এক ব্রিটিশ ‘বড় সাহেব’-এর সঙ্গে দেখা হবে। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, কুর্তা-পাজামা পরা এক হাসিমুখ মানুষ আমাকে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করছেন, 'বিবিসি মে কাম করেঙ্গে?' মার্ক আলাদা করে চেষ্টা করতেন যেন আমরা অনুভব করি—বিবিসি যেমন তাঁর, তেমনই আমাদেরও। আর এই অনুভূতি টিকিয়ে রাখতে তিনি নিরলসভাবে জোর দিতেন রেডিওর ভাষা পরিষেবাগুলোর ওপর, যেগুলোই ছিল বিবিসির বৈশ্বিক বিস্তার ও গ্রহণযোগ্যতার মূল চাবিকাঠি। ভাষা মহত্ত্বের কারণে তাঁর ডেসপ্যাচগুলো তাঁকে পেশোয়ার থেকে ইয়াঙ্গন পর্যন্ত এক বিশ্বাসযোগ্য মিডিয়া আইকনে পরিণত করেছিল। তিনি মন দিয়ে ভারতীয় সংবাদপত্র পড়তেন।‌ ভালো আঞ্চলিক প্রতিবেদকদের আলাদা করে চিহ্নিত করতেন। এরপর তাঁদের স্ট্রিংগার হিসেবে নেওয়া হতো। কাজ ভালো হলে স্থায়ী কর্মী হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব আসত। তিনি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বিস্তারে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং আমাদের বিবিসির মানদণ্ডে প্রশিক্ষিত করেছিলেন—আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ যেমন, তেমনি প্রতিদিনের হাতে-কলমে পরামর্শের মাধ্যমে। নেটওয়ার্ক নির্মাতা হিসেবে তিনি ছিলেন অতুলনীয়।

মার্ক টালির আরও কিছু সমসাময়িক ছিলেন, যাঁরাও একই মানসিকতার—উইলিয়াম ক্রলি, ইতিহাসবিদ ডেভিড পেজ এবং প্রয়াত আলেকজান্ডার থমসন। তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু মাঠপর্যায়ে আমাদের জন্য তাঁরা এমন এক অনন্য মিডিয়া পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে প্রতিভা ও দক্ষতার মূল্য ছিল। আমাদের অঞ্চলের বড় কোনো খবর অনায়াসে বৈশ্বিক শিরোনামে জায়গা করে নিতে পারত। যখন বসেরা অঞ্চলটিকে বোঝেন, তখন কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

মার্ক টালি কেমব্রিজে ধর্মতত্ত্ব পড়েছিলেন, কিন্তু সম্প্রচার জগতের সৌভাগ্য যে তিনি চার্চে যাননি। তিনি ছিলেন বিবিসির সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করা দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো প্রধান—মোট তিরিশ বছর।‌ তারমধ্যে কুড়ি বছর নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি চাইলে বিবিসিতে আরও অনেক উঁচু পদে যেতে পারতেন, কিন্তু দিল্লিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বি
বলতেন, 'বিবিসির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেয়ে ভারত আর এই অঞ্চল আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে।

মার্ককে নিয়ে গল্পের শেষ নেই—এগুলো দিয়েই একটি বই লেখা যায়। ১৯৯৪ সালে নতুন, ব্যয়-সংকোচন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মতবিরোধের পর তিনি রাগ করে বিবিসি ছাড়েন। তখনই তিনি বলেছিলেন, 'বিবিসিতে হিসাবরক্ষকেরা ঢুকে পড়েছে।'

এই বিরোধের কেন্দ্রে ছিল ‘এছাড়া আরেকজন’ হয়ে থাকতে না চাওয়ার মানসিকতা। তিনি চাইতেন বিবিসি বড় খবর ফাঁস করুক, স্কুপ আনুক, অসাধারণ তথ্যচিত্র বানাক—যেগুলো দর্শকরা বছরের পর বছর মনে রাখবে। তিনি নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যেসব ‘হিসাবরক্ষক’-কে তিনি এত অপছন্দ করতেন, তাঁদের বোঝাতে পারেননি যে মানের পেছনে খরচ লাগে। তাঁরা যদি তা না বোঝেন, তবে তিনি চলে যাবেন, কিন্তু আপস করবেন না।

পেশাগত সততার প্রশ্নেও মার্ক ছিলেন অনড়। জরুরি অবস্থার সময় তিনি পরিস্থিতিকে হালকা করে দেখাতে অস্বীকার করেছিলেন। যার ফলে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাঁকে দেশছাড়া করে। পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন নায়ক হয়ে।

মার্ক বিবিসি ছেড়েছিলেন, কিন্তু সংস্থাটি বারবার তাঁর দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে। আমি যখন মাদার টেরেসার মৃত্যুর খবর প্রথম প্রকাশ করি এবং বিবিসি কলকাতায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সারাদিন সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বিশেষজ্ঞ হিসেবে মার্ক টালিকে এবং প্রধান অ্যাঙ্কর হিসেবে নিক গাওয়িংকে আনা হয়। নিক তার আগে এক সপ্তাহ ধরে প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর খবর উপস্থাপনা করছিলেন। হোটেল পিয়ারলেসে আমাদের অস্থায়ী স্টুডিওতে দু’জনের সঙ্গে দেখা হলে, মার্ক আমাকে বললেন তাঁদের কলকাতা কফি হাউসে নিয়ে যেতে—'দাদাদের সঙ্গে একটু আড্ডা দিতে চান।'

পরদিন মাদার টেরেসার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিবিসি কভারেজটি বৈশ্বিক দর্শকদের কাছে এই অনন্য শহরের এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি হয়ে উঠেছিল এবং অন্য বিদেশি মাধ্যমগুলোর চেয়ে আলাদা করে নজর কাড়ে। মার্কের জোরেই আমাকে রামকৃষ্ণ মিশনের এক সন্ন্যাসী ও এক মুসলিম ইমামকে স্টুডিওতে আনতে হয়েছিল, মাদার টেরেসা এবং যে শহর তাঁকে গড়ে তুলেছিল—তার উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনার জন্য।

এভাবেই কাজ করতেন মার্ক।

গভীর গবেষণা, বিষয়টিকে অনুভব করার জন্য বারবার বোঝার চেষ্টা করা, সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে কথা বলা।‌ তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষায় গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা, যা সবাই বুঝতে পারত।

দিল্লিতে মাঝে মাঝে বক্তৃতা দিতে গিয়ে যখন তাঁর সঙ্গে দেখা হতো, তিনি বিবিসির বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে পতন নিয়ে আক্ষেপ করতেন। আর ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন থাকতেন। তাঁর প্রাক্তন সহকর্মী ও হাজার হাজার বন্ধু তাঁর চির বিদায়কে মেনে নিতে পারবে না। গভীর শোকে আচ্ছন্ন হবে ন। ‌কোনও ‘ফুলস্টপ’ ছাড়া তিনি কবরে যাবেন—পূর্ণতায় ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচা এক  মানুষ হয়ে।

(সুবীর ভৌমিক সতেরো বছর ধরে বিবিসির পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সংবাদদাতা ছিলেন। মার্ক টালিই তাঁকে বিবিসিতে নিয়ে আসেন এবং তিনি বহু বছর তাঁর সঙ্গে কাজ করেন।)


```