ভিবিএসএ-এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। বিকশিত ভারত শিক্ষা মানক পরিষদ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষাদানের মান নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেবে। বিকশিত ভারত শিক্ষা বিনিয়ম পরিষদ, ভারতীয় শিক্ষার গুণমান বৃদ্ধি করে তাকে আন্তর্জাতিক মানের সমতুল করে তুলবে। বিকশিত ভারত শিক্ষা গুণবত্ত্বা পরিষদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দিতে তার মানোন্নয়নের বিষয়টি নির্ধারণ করবে। এইভাবে দেশে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সমস্যার সমাধান করবে ভিবিএসএ। এর ফলে, ভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় সামিল হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও-কে বর্তমানে ২৮.৪% থেকে বৃদ্ধি করে ৫০% নিয়ে যাবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করে সেগুলিকে স্বীকৃতিদান এবং যুক্তিযুক্তভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য তহবিলের যোগানের ব্যবস্থা করতে হবে। এর ফলে, সামাজিক চাহিদা অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে গবেষণা ও উদ্ভাবনমূলক উদ্যোগ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি, ভারতের নাগরিকদের চাহিদা মেনে সামাজিক দিক থেকে প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করা হবে। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে যা ভারতের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের আরও পেশাদার ব্যক্তিত্ব করে তুলবে। পাশাপাশি, ভারতীয় মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বিকশিত ভারত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠবে এইসব শিক্ষার্থীরা যাঁরা একইসঙ্গে বিশ্ব নাগরিকের দায়িত্বও পালন করবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এডুকেশন ৫.০ অনুসরণ করা হচ্ছে। ২০২০-র জাতীয় শিক্ষানীতিও এই ধারাকে অনুসরণ করেই তৈরি করা হয়েছে। এডুকেশন ৪.০-এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল। এডুকেশন ৫.০ প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবস্থা থেকে মানবিক দৃষ্টিকোণ অনুসরণ করে এগিয়ে চলার দিকে গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ, যুবক-যুবতীদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার বন্দোবস্ত করার পাশাপাশি, মানসিক, শারীরিক সহ সর্বাঙ্গীণ এক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে, এককভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে পারস্পরিক মতবিনিময়ের সুযোগ যেমন থাকতে হবে, পাশাপাশি বিভিন্ন পরিচালনগত ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ২০২০-র জাতীয় শিক্ষানীতি যে চাহিদাগুলি পূরণ করতে পারবে না, সেগুলি পূরণ করার জন্যই ভিবিএসএ-এর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে, ছাত্রছাত্রীরা একটি বিষয় থেকে অন্য একটি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার আরও সুযোগ পাবে। এক্ষেত্রে যেসব সংস্থাগুলি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেয়, তাদের নিয়মাবলীতে যে সমস্যা রয়েছে, তা দূর করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য একটি অভিন্ন স্বীকৃতিদানের সংস্থা গড়ে উঠবে। এর ফলে, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ভুয়ো প্রতিষ্ঠাগুলি আর বিভিন্ন সংস্থা থেকে স্বীকৃতি লাভের সুযোগ পাবে না। ভিবিএসএ-এর যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে।
ভিবিএসএ ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় দেশীয় বিভিন্ন উপাদানকে যুক্ত করতে পারবে। ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরাকে পাঠক্রমে যুক্ত করার মাধ্যমে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি সমতা বিধান করা যাবে। ২০২০-র জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে দেশের যুব সম্প্রদায়ের শিক্ষাদান করা হবে। এর আগে মেকলের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভারতীয় শিক্ষাদানের পদ্ধতিকে ‘শ্বেতাঙ্গদের বোঝা’ বলে যে ধারণা তৈরি করা হয়েছিল, সেটিকে ভেঙে ফেলার সম্ভব হবে। দেশের ঐতিহ্যশালী সংস্কৃতির প্রতি যে অবজ্ঞা করা হত, তার অসাড়ত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে।
বিশ্বে সবথেকে বেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ভারতে। কিন্তু, অভিবাসন ব্যুরোর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৭ লক্ষ ৬০ হাজার ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়। ভিবিএসএ গঠিত হলে দেশেও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাদান সম্ভব হবে। ফলে, এই সংখ্যাটি কমে আসবে। এই ব্যবস্থায় যথাযথ ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সময় সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি, উন্নতমানের গবেষণামূলক বিভিন্ন উদ্যোগ কার্যকর করা যাবে। ভিবিএসএ-এর অন্যতম লক্ষ্য হল অনলাইন এবং কৃত্রিম মেধার সাহায্যে স্বচ্ছ এক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের জন্য এই প্রক্রিয়াটি ব্যয় এবং সময় সাশ্রয়ী হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে দেশজুড়ে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থায় সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা তাদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পাবে। ফলে, যথাযথ প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে, কেন্দ্রের থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে যে তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়, সেই তহবিল লাভের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য দূর হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি উন্নতমানের শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে স্বশাসিত হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। এর ফলে, অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের থেকে অনুপ্রাণিত হবে। পাশাপাশি, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি শিক্ষা এবং গবেষণা ক্ষেত্রে আরও সময় ব্যয় করবে। তাদের প্রশাসনিক নানা কাজে সময়ের সাশ্রয় হবে।
ভারত শিক্ষাক্ষেত্রে “বিশ্বগুরু” হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে প্রয়োজনীয় সংস্কারকে কাজে লাগিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। এক্ষেত্রে তার চিরায়ত ঐতিহ্যকেও গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০২০-র জাতীয় শিক্ষানীতি এই লক্ষ্য পূরণে একটি আইনি পদক্ষেপ। আর এখন, বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান ভারতীয় পদ্ধতিতে জ্ঞানলাভের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারকে বাস্তবায়িত করবে, যার মূল উদ্দেশ্য “সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়”।
লেখক : কলকাতার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের ডিরেক্টর। মতামত ব্যক্তিগত।