Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেইWeather: পয়লা বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআইWest Bengal Election 2026 | হার-জিত ভাবিনা, তামান্না তো ফিরবেনা!

বাংলার দুই মাদ্রাসা শিক্ষার অনুশাসনে ছক ভাঙছে, মুসলিমদের তুলনায় হিন্দু ছাত্রছাত্রীই বেশি

এই দুই মাদ্রাসায় (West Bengal Madrasah) ধর্মীয় কোনও গোঁড়ামির জায়গা নেই। জায়গা নেই কোনও কুসংস্কারের বা প্রাচীনমনস্কতার। শিক্ষাই সেখানে আসল শক্তি, নিয়মানুবর্তিতাই আসল অনুশাসন। রেজাল্ট থেকে খেলাধুলো—সব দিকেই তাক লাগানো সাফল্য এই দুই মাদ্রাসার।

বাংলার দুই মাদ্রাসা শিক্ষার অনুশাসনে ছক ভাঙছে, মুসলিমদের তুলনায় হিন্দু ছাত্রছাত্রীই বেশি

ছক ভাঙা মাদ্রাসা। ছবি: অরিত্র কবিরাজ। গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস।

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: 29 August 2025 20:24

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

‘মাদ্রাসা’ শব্দটি শুনলেই, অনেকেরই মনে হয়, খুবই রক্ষণশীল, উগ্র ধর্মীয় অনুশাসনের ঘেরাটোপে বন্দি কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অথচ পশ্চিমবঙ্গেই এমন দুটি মাদ্রাসা (West Bengal Madrasah) রয়েছে, যেখানে মুসলিমদের থেকে অ-মুসলিম পড়ুয়াদের সংখ্যাই বেশি (Peace and Harmony)। সেখানে মুসলিমরাই সংখ্যালঘু, অন্য ধর্মের পড়ুয়ারা সংখ্যাগুরু (West Bengal Madrasah Service Commission)। শুনতে অবাক লাগছে না কি!

সেই অবাক লাগা পার করে, সত্যিকারের চর্মচোখে দেখার পরে বোঝা গেল, পুরুলিয়ার লালপুরের হুড়া থানা মোজাফ্ফর আহমেদ অ্যাকাডেমি হাই মাদ্রাসা (Hura Thana M. A. Academy High Madrasah) এবং বর্ধমানের ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লি হাই মাদ্রাসা (Orgram Chatuspalli High Madrasah) কীভাবে এতটা আলাদা হয়ে উঠল। কীভাবে অনন্য পঠনপাঠনে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলে, এলাকার অ-মুসলিম পরিবারগুলিকেও অনুপ্রাণিত করছে, ছেলেমেয়েদের মাদ্রাসায় পাঠাতে।

WB Madrasa

আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে, উদারবাদী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানসিকতায়। ধর্ম বা বর্ণ বা জাতি এমনকি রাজনীতি—এর কোনও কিছুরই প্রবেশাধিকার নেই মাদ্রাসার ভিতরে। লালপুরের মোজাফ্ফর আহমেদ হাই মাদ্রাসার বাংলা শিক্ষক স্বপন মণ্ডলের কথায়, ‘ধর্ম সকলেরই আছে নিজের নিজের, তবে তার জায়গা ক্যাম্পাসের বাইরে। ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকলে ছেলেমেয়েদের একটাই পরিচয়, তারা শিক্ষার্থী, তাদের কাজ পড়াশোনা করা। আর আমাদেরও একটাই পরিচয়, আমাদের কাজ শিক্ষা দেওয়া।’

এই দুই মাদ্রাসায় ধর্মীয় কোনও গোঁড়ামির জায়গা নেই। জায়গা নেই কোনও কুসংস্কারের বা প্রাচীনমনস্কতার। শিক্ষাই সেখানে আসল শক্তি, নিয়মানুবর্তিতাই আসল অনুশাসন। রেজাল্ট থেকে খেলাধুলো—সব দিকেই তাকলাগানো সাফল্য এই দুই মাদ্রাসার। সেই সঙ্গে উদারমনস্ক শিক্ষকদের আধুনিক পড়ানোর ধরনে, শুধু মুসলিম ছাত্রছাত্রী নয়, সমান ভিড় হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদেরও। আর তার কৃতিত্ব তাদের অভিভাবকদেরও। এই মিলনমেলা যেন শুধু শিক্ষার অঙ্গনকে আলোকিত করছে না, গোটা সমাজকেই একটা নতুন বার্তা দিচ্ছে।

WB Madrasa

পুরুলিয়ার মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক মহম্মদ শহিদুল্লা আনসারির কথায়, ‘আমাদের উদ্দেশ্যই ছিল, বিজ্ঞানমনস্ক ছেলেমেয়ে গড়ে তোলা। আমার এলাকা থেকে তো বটেই, বাইরে থেকেও বহু হিন্দু ছেলেমেয়ে পড়তে আসে এখানে। এসসি-এসটিদের মধ্যেও একটা সাড়া পড়েছে যে, এই মাদ্রাসায় পড়লে রেজাল্ট ভাল করা যাবে। পড়াশোনা তো মূল বিষয় বটেই, তার পাশাপাশি, আমরা ডিসিপ্লিনের জায়গা থেকে একচুলও নড়ি না।’

গাছপালায় ঘেরা শান্তির আবহে, বড় বড় ক্লাসরুমে চলে অঙ্ক, ইংরেজি, বিজ্ঞানের পাঠ। শিক্ষক-শিক্ষিকারা চান, ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে ছাত্রছাত্রীরা যেন মানুষ হয়ে ওঠে। পরীক্ষার ফলাফলও তাই বলে দিচ্ছে— এই মাদ্রাসা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য।

WB Madrasa

তবে এই কর্মকাণ্ড সফল হতো না অভিভাবকদের ভরসা ও উদ্যোগ ছাড়া। এলাকাবাসী সকল অভিভাবকই মাদ্রাসার প্রতি কৃতজ্ঞ, ছেলেমেয়েদের গড়ে তোলার জন্য। এখানকারই পড়ুয়া ছেলে-মেয়ের বাবা অশ্বিনী দাস মনে করিয়ে দিলেন নজরুলের কবিতা, ‘একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।’ তাঁর কথায়, ‘আমরা এখানে জাতি-ধর্মে কোনও ভেদ করি না। আমার বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠান হলে মুসলিম ছেলেমেয়েরাও যায়। আমার ছেলে ফার্স্ট ডিভিশনে ভালভাবে পাশ করেছে এখান থেকে। মেয়ে সব ক্লাসে ফার্স্ট হয়। কলকাতার ভাল কোনও স্কুলে পড়লে যেমন শিক্ষিত হতো, আমি মনে করি, এখানে পড়েও সেই শিক্ষাই পেয়েছে।’

এখানকার পড়ুয়া ছেলেমেয়েরাও সমস্বরে জানাল, শিক্ষকরা সন্তানসম স্নেহে তাদের পড়ান, সমস্ত বিষয় ভাল করে বুঝিয়ে দেন। প্রতিদিনের মিড ডে মিলেও থাকে যত্নের ছোঁয়া। তাদের কথায়, প্রতিদিন পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম পরে স্কুলে আসা, মেয়েদের গুছিয়ে চুল বাঁধা, ছেলেদের হাতে-কানে কোনও বালা-দুল না থাকা, চুলে রং না করা—এগুলোই অনুশাসন। মুসলিম মেয়েদের মধ্যেও হিজাব পরা বা না-পরা নিয়ে কোনও আলাদা বাধ্যতা নেই। কারও ইচ্ছে হলে পরে, নইলে নয়।

WB Madrasa

মাদ্রাসার বাংলা শিক্ষক মতিবুর রহমান দালালের স্পষ্ট কথা, ‘মন্দির, মসজিদ, গির্জায় ধর্মীয় শাসন চলতেই পারে। কিন্তু মাদ্রাসা শব্দের অর্থ বিদ্যালয়। সেখানে ধর্মপ্রচার চলে না। সেখানে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে সচেতন নাগরিক তৈরি করাটাই কাজ। আমরা সেই কাজেই ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমাদের এখানে ক্লাস ইলেভেনে ৪০০ জন পড়ুয়া আছে, তাদের মধ্যে ৪৩ জন মুসলমান। আমাদের একটাই অগ্রাধিকার। কীভাবে ছেলেমেয়েরা আগামী দিনে মানুষ হবে, সমাজ গড়ার কারিগর হয়ে উঠবে।’

WB Madrasa

পুরুলিয়ার লালপুরের মতোই বর্ধমানের ওড়গ্রামের চতুষ্পল্লী হাই মাদ্রাসাতেও, প্রায় একইভাবে, পড়াশোনা করছে বহুসংখ্যক অ-মুসলিম ছাত্রছাত্রী। সেখানকার প্রধান শিক্ষক শেখ আব্দুল আলিমের কথায়, ‘এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এখানে সকলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা গ্রহণ করতে আসে। সেখানে ধর্মের কোনও জায়গা নেই। লেখাপড়া, খেলাধুলো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ডিসিপ্লিন— এগুলোই আমাদের অগ্রাধিকার। উন্নত ল্যাব, স্মার্ট ক্লাসরুম, জিম— এসবেই আমরা বেশি জোর দিই। ধর্মীয় অনুশাসনের কোনও জায়গা নেই।’

WB Madrasa

ছবি: চন্দন ঘোষ।

ঠিক এখানেই আরও বহু মাদ্রাসার থেকে আলাদা এই দুই মাদ্রাসা। অন্যান্য অনেক জায়গায় যা ভাবা যায় না, তা এখানে অনায়াসে করা যায়। লালপুরের মাদ্রাসার পদার্থবিদ্যা শিক্ষক অভিজিৎ মজুমদার বুঝিয়ে বললেন, ‘আমি অন্য মাদ্রাসাতেও পড়িয়েছি। সেখানে কোনও গানবাজনা চলত না। এই মাদ্রাসায় দেখছি, নানা অনুষ্ঠানে জয় গণেশ দেবা বা আয়গিরি নন্দিনীর মতো গানও দিব্যি বাজছে, ছেলেমেয়েরা পারফর্ম করছে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে। এমনকি মুসলিম শিক্ষকরাও তাতে তাল দিচ্ছেন, খোলা মনে।’

চতুষ্পল্লী মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষক সু্প্রভাত দে যেমন বলছেন, ‘সম্প্রীতির মাদ্রাসা হিসেবে এই মাদ্রাসার নাম সুপরিচিত। ধর্মীয় কোনও অনুষ্ঠান এখানে পালন করা হয় না। হিন্দু ছেলেমেয়েরা কোনও অস্বস্তি বোধ করে না। সর্বধর্মসমন্বয়ের দিকে নজর রেখে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালন করা হয়। পড়াশোনা তো বটেই, নাচগান থেকে খেলাধুলো—সবেতেই আমরা এগিয়ে।’

WB Madrasa

জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণির ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষাই যে হতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র, আত্মপরিচয় গড়ার সবচেয়ে বড় জায়গা, এই মাদ্রাসা দুটি যেন তার জীবন্ত প্রমাণ। যেখানে সমান সুযোগ পাচ্ছে সব ধর্মের ছাত্রছাত্রী, আর বইয়ের পাতায় গড়ে উঠছে ভবিষ্যতের পথ। হয়তো এভাবেই শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে এক সেতুবন্ধন, মুছে দিতে পারে মানুষে-মানুষে সবরকম ভেদাভেদ।


```