দাউদ ইব্রাহিম পাকিস্তানে আছে না নেই? এতদিন পাকিস্তান বলত, নেই। কিন্তু সত্যিকে কি চিরকাল চেপে রাখা যায়?
ইসলামাবাদের কর্তারা এতদিন এমন ভাব দেখাতেন যেন দাউদ ইব্রাহিম বলে কারও নামই শোনেননি। কিন্তু গত শনিবার পাকিস্তানের মিডিয়ায় ছাপা হয়ে যায়, দাউদ ইব্রাহিম বাস করে করাচিতে। শহরের অভিজাত এলাকায় এক মসজিদের কাছে তার আস্তানা। ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই পাকিস্তান সরকার বলে, এটা রাষ্ট্রপুঞ্জের দাবি। রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদীর নাম-ঠিকানা দিয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা আছে, দাউদ পাকিস্তানে থাকে।
পাকিস্তান সরকার ফের বলেছে, দাউদ তাদের দেশে নেই। প্রশ্ন হল, তাহলে কি রাষ্ট্রপুঞ্জ ভুল করে বলেছে, সে করাচিতে বাস করে? ইসলামাবাদের কর্তারা এই প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়েছেন। তবে মিডিয়ায় মাফিয়া ডনের করাচির বাড়ির কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাঁরা যে বিপাকে পড়েছেন সন্দেহ নেই।
আরও একটি ব্যাপারে সম্প্রতি গুরুতর বিপাকে রয়েছে পাকিস্তান। কয়েক বছর ধরেই সেদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নড়বড়ে। ইমরান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে কয়েকবার পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির কাছে অনুদান চাইতে গিয়েছিলেন। কয়েক বছর ধরে দেশটা অনুদানের ওপরেই চলছে। এমন সময় এসে পড়েছে প্যানডেমিক। করোনা অতিমহামারীর ধাক্কায় বিশ্ব জুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ। ধনী দেশগুলোর অবস্থাও খারাপ। এই অবস্থায় আর পাকিস্তানকে সাহায্য করবে কে?
বিপদের ওপরে বিপদ। বিশ্ব জুড়ে জঙ্গিদের শায়েস্তা করার জন্য ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স নামে একটি সংগঠন সক্রিয়। জঙ্গিরা কোথা থেকে অর্থ সাহায্য পায়, তারা ঠিক খবর রাখে। তাদের কাছে খবর আছে, পাকিস্তানে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন সক্রিয়। প্রশাসন তাদের সাহায্য করে। প্রতিবেশী দেশে নাশকতা চালানোর কাজে ব্যবহার করে।
অতীতে কয়েকবার টাস্ক ফোর্স পাকিস্তানকে বলেছে, তোমরা সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নাও। নইলে কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থা তোমাদের সাহায্য করবে না। তোমরা বিশ্বে একঘরে হয়ে যাবে। সেই ভয়ে পাকিস্তান কয়েকজন জঙ্গি নেতার বিরুদ্ধে লোকদেখানো ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু দাউদের বিরুদ্ধে কিছু করেনি।
যতদূর জানা যায়, পাকিস্তানে নানা ব্যবসায় দাউদের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা আছে। সেদেশে সে সম্মানিত ব্যবসায়ী। সেনা ও গোয়েন্দাবাহিনীর কর্তাদের সঙ্গে তার ভাল সম্পর্ক। তার জোরেই সে রয়ে গিয়েছে ধরাছোঁইয়ার বাইরে।
ভারতের কাছে দাউদ মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল। বম্বে বিস্ফোরণে সে মূল অভিযুক্ত। ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ মুম্বই শহরে পরপর ১২ টি বোমা ফাটে। ২৫৭ জন নিহত হন। আহত হন ১৪০০ জন। তাঁদের অনেকে সারা জীবনের মতো পঙ্গু হয়ে গিয়েছেন।
বম্বে বিস্ফোরণের পরেও ভারতে সক্রিয় ছিল দাউদের ডি কোম্পানি। খুন, তোলাবাজি, জঙ্গি কার্যকলাপে মদত, ইত্যাদি একাধিক অপরাধ চালিয়েছে সেই গ্যাং। দাউদ করাচিতে বসে সব নিয়ন্ত্রণ করেছে।
বম্বে বিস্ফোরণের সময় ভারতে ছিল নরসিংহ রাও সরকার। তারপরে অনেক সরকার এসেছে, গিয়েছে। সকলেই কিন্তু একই সুরে দাবি করেছে, পাকিস্তান দাউদকে আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিক। এর মধ্যে পাকিস্তানেও বার বার জমানা বদল হয়েছে। কখনও এসেছেন সেনাশাসক। কখনও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দাউদ নিয়ে তাঁদেরও এক সুর। তাঁরা বলেছেন, সে তো এখানে নেই।
করোনা সংকটে পাকিস্তানের আরও বেশি আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রয়োজন। কিন্তু দাউদের মতো অপরাধীর জন্য যেটুকু সাহায্য তারা পায়, তাও হারানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল খুব ভাল করেই জানে, দাউদকে কারা আশ্রয় দিয়েছে। পাকিস্তান যদি বলে, রাষ্ট্রপুঞ্জের দেওয়া তথ্য ভুল, দাউদ পাকিস্তানে নেই, কেউ বিশ্বাস করবে না।
ইমরান যদি সত্যিই পাকিস্তানের ভাল চান, তাহলে দাউদকে অবিলম্বে ভারতের হাতে তুলে দেবেন। আন্তর্জাতিক অনুদান বন্ধ হলে অতিমহামারী সামলানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষ বিপদে পড়বেন। এক অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য ইমরান কি এতবড় ঝুঁকি নেবেন? যদি নেন তা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।