
শেষ আপডেট: 21 February 2022 05:00
অনেকের ধারণা, মোদী ২০২৪-এও জনপ্রিয়তায় ভর করে ফের বাজিমাৎ করবেন। জনপ্রিয়তার নিরিখে তাঁর সঙ্গে রাহুল গান্ধীর ব্যবধান এখন ৪৬ শতাংশের। অর্থাৎ আজকের দিনে রাহুলকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখতে চায় মাত্র সাত শতাংশ নাগরিক। মোদীকে চান ৫৩ শতাংশ জনগন।
জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে তুলনা টানলে মনে হওয়া স্বাভাবিত মোদী অপ্রতিরোধ্য। তবে মনে রাখা দরকার, ভোটের ময়দানে জনপ্রিয়তার মেয়াদবিহীন নয়। ইন্দিরা গান্ধীর ইমার্জেন্সির আগের দিনগুলির কথা স্মরণ করা যাক। রাজন্য ভাতা বিলোপ আইন সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিলে ‘গরিবি হটাও’-এর ডাক দিয়ে তিনি তখন আম-আদমির নয়নের মণি৷ তার উপর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো মানুষ সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ৷ কংগ্রেসিদের চোখে তিনি এশিয়ার মুক্তিসূর্য। তখন ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা’—অনেকেই স্রেফ এই উক্তির জন্যই অসমের কংগ্রেস নেতা তথা দলীয় সভাপতি দেবকান্ত বড়ুয়াকে মনে রেখেছেন৷
সেই প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরার বিরুদ্ধে মানুষ এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল যে জয়প্রকাশ নারায়ণের ডাকে বাম-ডান-অতি ডান, সব হাত এক হয়ে গেল৷ বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থা জারির মতো কঠোর কিন্তু অসহায় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন নেহরু কন্যা৷
রাজনীতির এই উত্থান-পতনও এক প্রকার হাওয়া৷ যা ঠিকঠাক চালিত করতে পারলে ক্ষমতার এভারেস্টে পোঁছে যাওয়া যেমন অসম্ভব নয়, উল্টোটা হলে সমুদ্রে নিক্ষেপিত হওয়া সময়ের অপেক্ষা৷ ইন্দিরা গান্ধীকে বিজেপির মোকাবিলা করতে হয়নি। জনতা পার্টিও ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কেন্দ্র-রাজ্য সুসম্পর্ক নিয়ে তাঁকে ভাবতে বাধ্য করেছিল একাধিক আঞ্চলিক শক্তি।
নরেন্দ্র মোদী কথায় কথায় নেহরুর ভারতের সঙ্গে তুলনা টানেন। ইন্দিরার প্রসঙ্গ আনেন কম। হয়তো তিনিও বোঝেন গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার, মানবাধিকার, সর্বোপরি কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে ইন্দিরা সময়ের তুলনা টেনে কৃতিত্ব দাবি করার মতো দৃষ্টান্ত তাঁর ঝুলিতে নেই। রাজ্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ শুধু নয়, রাজ্যে রাজ্যে এখন অঘোষিত কেন্দ্রীয় শাসন চলছে।
বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল সন্ত্রাস। প্রতিবাদে রাজ্যের পুলিশের নিরাপত্তা নেননি। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বুলেট প্রুফ গাড়িটিও। তবু কেন্দ্রের কংগ্রেস বা অটলবিহারী বাজপেয়ির বিজেপি সরকার কখনও তাঁর নিরাপত্তায় সিআইএসএফ মোতায়েন করেনি। নির্লজ্জের মতো তা চাননি তিনিও। অন্যদিকে, মোদী সরকার রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি নেতাদের শোভা বর্ধন করেছে আধা সেনাকে ছায়াসঙ্গী করে। কার সঙ্গে ক’জন আধাসেনা, সেই বিচারে নেতার দর বাড়ে কমে।
সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখাদেখি প্রায় সব অ-বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আইএএস-আইপিএস অফিসারদের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের এককরফা নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে। ৫০-৫৫ বছর আগেও বাংলার তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকার সর্ব ভারতীয় অফিসারদের দিয়ে মাতব্বরি বন্ধ করতে অল ইন্ডিয়া ক্যাডার তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে দিল্লিতে চিঠি পাঠিয়েছিল। রাজ্যের অনুমতি ছাড়া আধাসেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানানোর পাশাপাশি কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরির ধর্মঘট ভাঙতে পুলিশ পাঠাতে দিল্লির নির্দেশ অগ্রাহ্য করেছিল তারা।
আসলে সংবিধানে এমন কোনও সংস্থান নেই যা দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলিকে কোনও সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করাতে পারে। ৩৫৬ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়াও এখন আর সহজ কথা নয়। মোদী সরকার তাই গোয়েন্দা এজেন্সি আর রাজ্যপালদের পেয়াদা বানিয়ে নিয়েছে।
বিএসএফের নজরদারির এলাকা বৃদ্ধি এবং তিন কৃষি বিলও সংবিধানে উল্লেখিত রাজ্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ। আয়ুষ্মান ভারতের মতো নিজেদের পছন্দমতো প্রকল্প রাজ্যগুলির উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ঘোষণার আগে মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। রাজস্ব আদায়, কর চাপানো, সারচার্জ বসানো এবং বাজার থেকে যত খুশি ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে কুক্ষিগত। অথচ, রাজ্যগুলির দিল্লির অনুমতি ছাড়া এক পা-ও এগোনোর উপায় নেই।
এই পরিস্থিতির বদল ঘটাতে সবচেয়ে আগে জরুরি আঞ্চলিক দল তথা শক্তির কনফেডারেশন। খাবার টেবিলের বিক্ষিপ্ত আলোচনা অর্থহীন। রাজ্যগুলির ইস্যু অভিন্ন। লোকসভা ভোটের এখনও বছর দুই বাকি। আশু কাজ হল, আঞ্চলিক দলগুলির কনফেডারেশন গড়ে অভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্রের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করা এবং নানা ইস্যুতে দর কষাকষি চালিয়ে যাওয়া। সেখান থেকেই নিজের নিজের রাজনৈতিক অবস্থান অটুট রেখে জন্ম নিতে পারে নতুন জোটও। ভোটের পর সেই জোট সরকার গড়ার সুযোগ না পেলেও সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে শর্ত আরোপ করতে পারবে তারা।
মনে রাখতে হবে, দেবগৌড়া, আইকে গুজরালদের সংযুক্ত মোর্চা সরকারের শরিক ছিল ২২টি ছোট ছোট দল তথা আঞ্চলিক শক্তি। সিপিএম সেই সরকারে যোগ না দিলেও বেশ কিছু দিন মোর্চার আহ্বায়ক ছিলেন জ্যোতি বসু। তারপর হন চন্দ্রবাবু নাইডু। আর বাজপেয়ীর বিজেপি সরকারের শরিক ছিল ২৭টি পার্টি। তাতে দেশ কিন্তু লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়নি।
কংগ্রেসের কথাও খানিক বলা যাক। নরেন্দ্র মোদীর অপকর্মের অনেকগুলিই সনিয়া গান্ধীর পার্টির জেরক্স কপি। বিএসএফের নজরদারির এলাকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংসদে প্রস্তাব এনেছিল কংগ্রেসের নেতত্বাধীন ইউপিএ সরকার। পদে পদে হেনস্থার অভিযোগ ওঠা গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ তৈরি হয় ইউপিএ জমানাতেই।
আর আগে দিল্লির কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধেই ‘রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতা চাই’—স্লোগান মুখে নিয়ে জ্যোতি বসুর বামফ্রন্ট সরকার এবং বামপন্থীদের দীর্ঘ লড়াই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অধ্যায়। চলতি পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ছুতমার্গ ঝেড়ে ফেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের উচিত পূর্বসূরির ওই স্লোগানটিকে সামনে রেখে এগোনো। সেই সঙ্গে মোদী তথা বিজেপির বিরোধিতায় আন্তরিক, সৎ প্রচেষ্টা দৃষ্টান্তও তুলে ধরতে হবে। কারণ, অনেক আঞ্চলিক শক্তি যেমন বিজেপি বিরোধী জোটে আছে, আবার মনে প্রাণে চায় দিল্লিতে মোদী থাকলে রাজ্যে সংখ্যালঘুরা বিজেপির ভয়ে তাদের টিকিয়ে রাখবে। শেষ করার আগে সিপিএম ও তৃণমূলের কাছে মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি এই নিবন্ধে তাদের আঞ্চলিক দল বলে গন্য করায়।