Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনের

প্রথম দিনই বলেছিলেন, কোনও বিষয়ে আপত্তি থাকলে অবশ্যই বলবেন, ফাইলে নোট দেবেন

দেবাশিস সোম সুব্রত মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন। পাঁচ বছর তাঁর সঙ্গে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। সৌভাগ্য শব্দটি স্রেফ কথার কথা হিসাবে বলছি না। সৌভাগ্য বলছি এই কারণে, যে অফিসাররা কাজের জায়গায় যেটা সবচেয়ে বেশি যেটা প্রত্যাশা করেন সেটা হল, তাঁর পল

প্রথম দিনই বলেছিলেন, কোনও বিষয়ে আপত্তি থাকলে অবশ্যই বলবেন, ফাইলে নোট দেবেন

শেষ আপডেট: 6 November 2021 01:55

দেবাশিস সোম

সুব্রত মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন। পাঁচ বছর তাঁর সঙ্গে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। সৌভাগ্য শব্দটি স্রেফ কথার কথা হিসাবে বলছি না। সৌভাগ্য বলছি এই কারণে, যে অফিসাররা কাজের জায়গায় যেটা সবচেয়ে বেশি যেটা প্রত্যাশা করেন সেটা হল, তাঁর পলিটিক্যাল বস হবেন এমন মানুষ যিনি রাজনৈতিক কারণে কাজে হস্তক্ষেপ করবেন না এবং সিদ্ধান্ত রূপায়নে স্বাধীনতা দেবেন। ভালো কাজের উদ্যোগ, প্রস্তাবে সায় দেবেন। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে এর সব কিছুই পেয়েছি। ২০০০ সালে সুব্রতবাবু কলকাতার মেয়র হওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। একদিন সন্ধ্যার পর পুরসভার এক অফিসার ফোন করে বললেন, মেয়র চান আমি যেন তাঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করি। মুশকিল হল, রাজ্য সরকার না বললে আমি তো সরাসরি মেয়রের কাছে যেতে পারি না। ঘটনাচক্রে সেই রাতেই আমার সঙ্গে মুখ্যসচিব মনীশ গুপ্তর কথা হল। ফোনে তিনি জানতে চাইলেন, আমি কি কলকাতা পুরসভার কমিশনার পদে কাজ করতে ইচ্ছুক? সত্যি কথা বলতে কী, দুটি কারণে আমার ইচ্ছা ছিল না। প্রথমত, কলকাতা পুরসভার তখন আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। এমন একটা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমি কী কাজ করব? দ্বিতীয়ত, সরকার ও পুরসভায় দুটি ভিন্ন দলের অধীনে। পুরসভাকে রাজ্য সরকার কতটা সাহায্য করবে কে জানে। কর্মচারীদের মাইনে দিতে না পারলে তারা তো আমার চামড়া গুটিয়ে নেবে। আবার এটাও ভাবলাম, মুখ্যসচিব যখন বলেছেন তখন ভয় পেয়ে গেলে চলবে না। আমি তো একজন পেশাদার। মুখ্যসচিবকে ফোনেই বললাম, আমি রাজি। পুরসভায় কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার দিন সুব্রতবাবুর সঙ্গে দেখা করলাম। উনি প্রথমেই আমাকে একটা ক্রশ বল পেন উপহার দিয়ে বললেন, ‘বেস্ট অফ লাক ফর ইওর নিউ অ্যাসাইনমেন্ট।’ পেনটা আমার কাছে এখনও আছে। তাঁর আগে একদিন ফোনে বলেছিলেন, আপনি তো ইঞ্জিনিয়ার (আইআইটি খড়্গপুরের প্রাক্তনী। পুরসভায় ই়ঞ্জিনিয়ারদের অনেক সমস্যা আছে। আপনি এলে ভালো হবে। চ্যালেঞ্জিং কাজ।’ সেদিন মুখোমুখি দেখা করতে গিয়ে বললাম, স্যার আমার একটা প্রিন্সিপ্যাল আছে। উনি বললেন, কী প্রিন্সিপ্যাল? আমি বললাম, আমার যদি কোনও কাজ, নির্দেশ পছন্দ না হয় আমি কিন্তু সরাসরি বলব। সিরিয়াস কিছু হলে ফাইলে নোট লিখে জানাব। উনি বললেন, অবশ্যই করবেন। একবার নয় প্রয়োজনে পাঁচবার বলবেন, পাঁচবার লিখিত দেবেন। এটাই তো আপনার কাজ। আর আমিও একটা কথা বলছি, আমার যখন যা বলার আপনাকেই বলব। দেখবেন আমার সঙ্গে অনেক লোক চলাফেরা করে। এরা কেউ আমার লোক নয়। আমার নাম করে কেউ কোনও কিছু করে দিতে বললে আপনি করবেন না। এই মৌখিক বোঝাপড়া দিয়ে পুরসভায় আমাদের একত্রে যাত্রা শুরু হল। তারপর পাঁচ বছর আমি ওঁর সঙ্গে কাজ করেছি। কোনও দিন এর অন্যথা হয়নি। কোনও দিন না। উনি এতটাই ডেকোরাম মেন্টেইন করতেন যে আমার কোনও সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব হয়তো ওঁর পছন্দ হয়নি, উনি ফাইলে শুধু লিখতেন, প্লিজ ডিসকাস। কখনও অস্বস্তিকর কিছু ফাইলে লিখতেন না। মাস তিনেক পর উনি বকেয়া পুরকর আদায়ে উদ্যোগী হলেন। বকেয়া পুরকর আদায়ে কলকাতা পুরসভার বিখ্যাত ওয়েভার স্কিমের তখনই সূচনা হল। ভাবনাটা সুব্রতবাবুরই। সত্যি কথা বলতে কী, তৃণমূল পরিচালিত পুরসভার প্রস্তাবে বাম সরকার সায় দেবে না, এমন ধারনার বশবর্তী হয়ে আমি খানিকটা নিরুৎসাহী ছিলাম। কিন্তু উনি এগোলেন এবং পুরসভার প্রস্তাবে সরকারের অনুমতি আদায় করে আনলেন। স্কিমটা ছিল বকেয়া পুরকরে পেনাল্টির পাশাপাশি সুদেও ছাড় দেওয়া হবে। বস্তুত ১৮ শতাংশ সুদ গুনতে হত বলেই অনেকেই কর জমা করতেন না। দেখা গেল, ওয়েভার স্কিম চালুর পরও কয়েকটি নামী প্রতিষ্ঠান বকেয়া কর জমা করেনি। শেষ দিনে এমন তিনটি সংস্থা গ্র্যান্ড হোটেল, হোটেল হিন্দুস্থান এবং পোদ্দার কোর্ট অথরিটি মেয়রের দ্বারস্থ হল। সেদিনও দেখলাম সুব্রতবাবুর প্রশাসনিক দৃঢ়তা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর না মেটানোয় আমি পুর আইন মেনে ওই তিন সংস্থার জলের লাইন কেটে দেওয়ার সুপারিশ করলাম। মেয়র সুব্রতবাবু আমার নোটে একবার চোখ বুলিয়েই বললেন, ‘গো অ্যাহেড।’ ওই তিন সংস্থার কর্তারা তখন মেয়রের চেম্বারে তাঁর সামনে বসে। তিনি ওঁদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, আপনাদের জলের লাইন কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে দিলাম। সেই প্রথম শহরের অমন বড় কোনও প্রতিষ্ঠানের জলের লাইন কেটে দেওয়া হল। ম্যাজিকের মতো কাজ হল, সে রাতেই একটি সংস্থা বকেয়া পুরকর জমা করে দিল। দ্বিতীয় যে সিদ্ধান্তটি যুগান্তকারী তা হল, স্টার থিয়েটার অধিগ্রহণ। আমি জানতাম না, উনিই একদিন হেরিটেজ আইন খুলে দেখালেন, ঐতিহ্যশালী কোনও প্রতিষ্ঠান ঠিকঠাক দেখভাল না করা হলে পুরসভা অধিগ্রহণ করতে পারে। কমিশনার হিসাবে আমি অধিগ্রহণের বিজ্ঞপ্তি জারি করলাম। সেই নির্দেশের কপি ব়ড় করে ছাপিয়ে বাঁধিয়ে নিয়ে তিনি শহরে পদযাত্রা করলেন। স্টার থিয়েটারের হাল বদলের কথা এখন সকলেই জানেন। সেই সব দিনে উনি স্টার থিয়েটারের ব্যাপারে রীতিমত আবেগ তাড়িত ছিলেন। তৃতীয় সিদ্ধান্তটি ছিল সিটিজেন পার্ক, যেটা এখন মোহরকুঞ্জ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পাশের সেই জমিটায় একটা পার্ক করা যায় কিনা, মেয়রের কাছে বলাতেই তিনি বললেন, চলুন জমিটা দেখে আসি। তখন মে মাস এবং বেলা দু’টো-আড়াইটে বাজে। রোদ মাথায় নিয়েই ছুটলেন এবং সেখানে দাঁড়িয়েই পার্ক করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাই-ই শুধু নয়, সেখানে দাঁড়িয়ে বলে দিলেন কেমন হতে হবে পার্কটি। এই ভাবেই তৈরি হয়ে দীর্ঘদিন গোডাইনে পড়ে থাকা ইন্দিরা গান্ধীর মূর্তি দ্রুত বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের উল্টোদিকে বসানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। কলকাতা শহরে পুরকর নির্ধারণে ইউনিট এরিয়া ব্যবস্থা চালুর প্রাথমিক ধাক্কা এবং সব ধরনের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক বাধা এড়িয়ে এগনোর কাজটাও তিনিই করেছেন। যেমন ট্রেড লাইসেন্স রিনিউয়াল ব্যাঙ্কের মাধ্যমে করার সিদ্ধান্ত। পুরসভার অফিসাররা বৈঠকে অনেক বাধা বিপত্তির কথা বললেন। সব শুনে সুব্রতবাবু আমাকে বললেন, মিঃ সোম বাধা এড়িয়ে চলার রাস্তা খোঁজাই তো আপনাদের কাজ। অফিসারদের বলুন কেন করা যাবে না, সেটা না ভেবে কীভাবে করা যাবে, সেটা নিয়ে ভাবুক। ওঁর ওই কথাতেই কাজ হয়ে গেল। পুরসভার খরচ-খরচার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। এতটাই যে একজনও নতুন লোক নিয়োগ করেননি, বেতনের বোঝা বেড়ে যাবে বলে। এই সিদ্ধান্তে এমন অনড় ছিলেন যে মাত্র তিনজনের নিয়োগ সংক্রান্ত একটি মামলায় পদস্থ আইনজীবীরা একদিন মেয়রকে বললেন, আদালত অবমাননার অভিযোগে তাঁকে স্বশরীরে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সামনে হাজির হতে হবে এবং মামলার যা মেরিট তাতে মেয়রের জেল পর্যন্ত হতে পারে। সব শুনে নির্বিকার সুব্রতবাবু বললেন, জেলে যেতে হয় যাব, কিন্তু চাকরি আমি দিতে পারব না। নির্দিষ্ট দিনে আদালতে হাজিরা দিলেন। প্রধান বিচারপতি তাঁর যুক্তি শুনে সন্তুষ্ট হলেন। এই হলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে কাজ করা ছিল অত্যন্ত আনন্দের। তার মুখ্যত কারণ, তিনি ভালো কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না।

লেখক কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন কমিশনার

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'

```