
শেষ আপডেট: 26 August 2021 19:42
লিখব বললেই লেখা যায়না, কালি, কলম, মন লেখে তিনজন। সেই মনটাই এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে ইতিউতি। একটি 'নেই' এর খবরের সূত্র ধরে অজস্র 'আছে' ঢেউ তুলছে মনে।
গৌরীদিকে দেখার আগে শুনেছি প্রথম, রবীন্দ্রসদনে নিয়মিত নৃত্যনাট্যের আসরে। সাক্ষাৎ পরিচয় হয় আকাশবাণী ভবনে বছর পঞ্চাশ আগে আমাদের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে গিয়ে। কোনও কোনও মানুষের সঙ্গে দেখা হলেই কীরকম মনে হয় না বহু বহু দিনের চেনা! গৌরীদি তাঁর স্বভাবগুণে তেমনই একটি বাতাবরণ সৃষ্টি করে আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন।
বাচিকশিল্পী শব্দটি তখনও লব্জ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আবৃত্তি-শিল্পীদের ঘনিষ্ঠ আবর্তে আমার জায়গা সেই তখন থেকেই। মঞ্চে, নয় প্রেক্ষাগৃহে, শ্রোতার আসনে বা সাজঘরে আমার নীরব-সরব উপস্থিতি সেই তখন থেকেই। ফলে গৌরীদি আমার সহকর্মী নন, আমার সহমর্মী সেই শুরুর দিনগুলো থেকেই।
সেইসময় মাঝে মাঝেই আমরা বাইরে বেড়াতে যেতুম। কাছাকাছির মধ্যেই, ওই দীঘা, চাঁদিপুর। আমাদের দুটি পরিবার। তুলসী রায়, গৌরীদির দুই ভাইঝি বাচ্চু (অরুণিতা রায়চৌধুরী) আর বুড়ু, অমিতাভ বাগচী, সুবীর চ্যাটার্জি (আবৃত্তিপ্রেমী), এই কজনের ছোট্ট একটি দল। দল ছোট্ট বটে কিন্তু মজা বিরাট। দুটো দিন এক ফুৎকারে উড়ে যেত। কিন্তু অনেক অক্সিজেন নিয়ে ফেরার রেশ কাটত না সহজে। একবার দীঘার সমুদ্রের ধারে বসেছিলুম সন্ধে থেকে। চাঁদ আর ওঠেনা! হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে হা হা করে চাঁদ উঠল, সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে গৌরীদি তাঁর রিনরিনে কণ্ঠে গান ধরলেন 'যখন এসেছিলেম অন্ধকারে চাঁদ ওঠেনি' সমস্ত পরিবেশে মুহূর্তে মায়া ঘনিয়ে উঠল। এই যে নির্বাচন- ঠিক সময়, ঠিক জায়গায়, ঠিক গানটি- এর উৎস তো সেই দুর্লভতম বস্তুটি, যার নাম 'বোধ'। সারাজীবন সর্বক্ষেত্রে এই বোধের পরিচয় রেখে গেছেন গৌরীদি।
বাংলা উচ্চারণের ক্ষেত্রে তাঁকে অনন্যা বললেও সব বলা হয়না। এই কথা লিখতে গিয়েও কেঁপে উঠলাম যেন, কানে শুনতে পাচ্ছি- 'অর্জুন জননী বটে,তাই মনে গণি দ্বেষ
করিয়ো না বৎস' অথবা '...স্তব্ধ স্কন্ধাবারে,পাণ্ডুর বালুকাতটে' ওই গলা, উচ্চারণ- সে তো 'নেই' হওয়ার নয়।