শেষ আপডেট: 29 September 2020 10:30
হিন্দোল ভট্টাচার্য
"কী হইলে নিজেকে সফল মনে করিতে পারিতাম? এমন কোনো
সাফল্য কি রহিয়াছে যাহা হইলে বাকি জীবন নিজেকে নিশ্চিন্ত
মনে সফল বলিয়া ধারণা করা যায়? ঈশ্বরের মুহূর্ত জানিয়াছি,
ক্ষুধার মুহূর্ত জানিয়াছি, ত্রাস, প্রেম, সন্তানসুখ, বৃদ্ধবৃদ্ধার মুখের
মুহূর্ত – কিন্তু সকলি মুহূর্ত মাত্র। পুনরায় গড়াইয়া পড়িতে
হইয়াছে, ট্রাম বাস বিছানা চেয়ার সিগারেট সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী
রমণীশরীর ধরিয়া ফেলিতে হইয়াছে, শরীরকে খারাপ করিতে
হইয়াছে, শরীরকে ভালো করিতে হইয়াছে। আমি মারদাঙ্গাপ্রিয়
নয়। খুনে। সাফল্যের জন্য মারপিট করিতে পারিব না, কিন্তু
খুন করিতে পারিব। তাই আমার ক্লান্তি একজন শিকার না
পাওয়া ঘাতকের সহিত তুলনীয় – আমি জহ্লাদ, কিন্তু
কাহাকেও বধ করিবার আদেশ যেন দীর্ঘদিন আসে না। আমার
ভিতরের সংস্কৃতজ্ঞের সহিত আমার বিতর্ক চলে – সব
বৃক্ষে কি ফল ধরে? তবে কেন তুমি বলিলে, ফলেই
বৃক্ষের পরিচয়, যেখানে গাছে একটি পাতা না
থাকিলেও তুমি গাছকে গাছ বলিয়াই চেনো?" বিতর্ক প্রস্তাব, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল ( ১৯৪৯-২০২০)
বাংলা ভাষায় কবিতাচর্চাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহের মধ্যে উপস্থাপিত করতে খুব কম কবি পেরেছেন।
এখানে আবহ বলতে শুধুমাত্র আমি উপস্থাপনের ভাষ্যকেই বোঝাচ্ছি না, বরং তার বিষয়কেও বোঝাচ্ছি। যেভাবে এক কাপালিক শব এবং সন্ন্যাস নিয়ে সময়ের এক বিন্দু থেকে নানা বিন্দুতে নিজেকে নিয়ে যান, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতা সেরকম। কিন্তু শুধু সময়ের কথা বলেই, এখানে যা বলার তা বলা হয়ে ওঠে না। বরং বলা ভালো, বলার শুরুর কথাটিই শুধু বলা হয় তখন। কারণ সময় এবং মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে এক গভীর আবহমান সত্ত্বার উপস্থিতির দিকেই এই কবি অনুসন্ধান করেছেন আজীবন। সেখানে মৃত্যু যেমন স্বমহিমায় উপস্থিত, তেমন মৃত্যুকে ছাপিয়ে উপস্থিত জন্মান্তরবাদ।
পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতা মানেই সময়ের এক স্তর থেকে আরেক স্তরে, এক ইতিহাস থেকে আরেক ইতিহাসে হেঁটে যাওয়া এক সচেতন পর্যটকের বিড়বিড়ানি। এই বিড়বিড়ানি কিন্তু অসংস্কৃত নয়। বরং বলা ভালো অত্যন্ত কুলীন। পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতার কৌলিন্য যেমন তাঁর কবিতার অন্তঃস্থিত সন্দর্ভের মধ্যে পাওয়া যায়, তেমন ভাবেই, পাওয়া যায় কবিতার রেটরিকের মধ্যেও। আর এই আঙ্গিক ও বিষয়ের পারস্পরিকতার মৈথুনে ডুবে থাকেন কবি স্বয়ং। এমনভাবেই ডুবে থাকেন, যে কবিতার অন্তরের বিশ্ব তাঁর অস্তিত্বকেও প্রভাবিত করে। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে যেমন মনে হয় জগতের সমস্ত ঘটনার মধ্যেই রয়েছে কোনও গভীর যোগসূত্র। হয়ত সেই যোগসূত্রটি এই সময়ের প্রেক্ষিতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়ত তার সূত্র রয়েছে অতীতের কোনও গর্ভে। বা হয়ত আদৌ অতীত বর্তমান বলে কিছু নেই। সময় আদৌ এরকম ভাবে ভাগ করা যায় না হয়ত। যাঁরা অনুভব করতে পারেন সময়ের আবহমানতাকে, তাঁরা পেয়ে যান সেই দীর্ঘসূত্রকে। তখন হয়ত তাঁদের মনে পড়ে যায় প্রাকৃতিক সমস্ত বিষয়-ই আসলে ঐশ্বরিক, আধ্যাত্মিক, সংযুক্ত।
আধ্যাত্মিকতার কথাই মনে আসে তাঁর কবিতাগুলি পড়ার সময়। কারণ আধ্যাত্মিকতা মানে তো কেবল উপাসনা নয়, আবার উপাসনার মানেও নয় অধর্মের পুজো। এই আধ্যাত্মিকতা হল সংযোগ। যোগ বা সংযোগের যে জন্ম-মৃত্যুর সীমানা ছাড়িয়ে আধ্যাত্মিকতার কথা বারবার তুলে ধরনে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, তা পাঠক হিসেবে আমাকে তো বিভিন্ন জায়গায় নিয়েও যায়। আবার একটু পাশ্চাত্য-ভাব থেকে এ কথাও বলা যায়, যদি বাংলা কবিতায় ম্যাজিক রিয়ালিজমের কথাও ভাবি, তাহলেও তা পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতায় সার্থক ভাবেই উঠে এসেছে। আর দেশ-কালের মধ্যে থেকে দেশ-কাল নিরপেক্ষতায় নিয়ে যাওয়ার যে সাধনা তাঁর কবিতাগুলির মধ্যে বারবার ফুটে ওঠে, তা একান্তই পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের সিগনেচার বলা চলে। এমনটিও হয়, যে কখনও কখনও তাঁর কবিতায় বোঝা যায় এক অদৃশ্য চোখ ঘোস্ট ক্যামেরার মতো লুকিয়ে আছে। যেন বা অনুসরণ করছে। পাঠক নিজেকেই যেন নিয়তির মতো করে অনুভব করতে পারে সেই সব কবিতায়। পার্থপ্রতিম সহজেই পাঠককে সেই লেখার যে অংশ করে নেন, এটি, তাঁর কবিতার দুরূহতাকেও করে তোলে কবিতার এক অংশ। উদাহরণ স্বরূপ ভাবা যেতে পারে এই কবিতার কথা,-
"চলিত ক্রিয়াপদের বাংলা আর লিখিতে ইচ্ছা হয় না। এই বাংলা বড়ো সাহিত্যিক। যদিও আমার বয়স ত্রিশ বৎসর ও ২মাস পূর্ণ হইয়াছে এবং এক্ষণে আমি রবিবারের মধ্যাহ্নে, ত্রিতলে, খাটে বসিয়া আছি, চারিদিক বেশ শান্ত, একটি কাক ডাকিতেছে—কেমন ধারণা হইতেছে যে ইহার মধ্যেই মিশিয়া আছে আমারই মরণোন্মুখতা। কোনো-না কোনো একটি সত্য বলিতে ইচ্ছা করিতেছে। আমার ব্যক্তিগত সত্য। জীবন এপর্যন্ত যতোটা যাপিত হইয়াছে, তাহার তথ্য ও চিত্রের ভিত্তিতে কিন্তু এই সত্য প্রস্তুত নয়। কেবলি মনে হইতেছে আঁটপুর বা ঐরকম কোনো একটা গ্রামের বাড়িতে বসিয়া থাকিতে পারিলে বিলক্ষণ শান্তি হইত। না, যে থাকিত সে কোনো ত্রিশবয়সী লোক নয়। তাহার বয়স কোনোমতেই সতেরোর বেশি হইবে না। সে ধুতি ও হাতকাটা গেঞ্জি পরিবে। এখন নির্জন দুপুর, কলাঝাড় পার হইয়া সে জামের বনে যাইতেছে। সেখানে কি একটি বালিকা থাকিবে না, যে তাহাকে আঁকাবাঁকা হরফে বহু সাধ্যসাধনায় একটি চিঠি দিয়াছে কিছুদিন আগে—‘কেমন আছ। আমার প্রণাম নিবে।’ তাহার মুখ ও হাবভাবের বর্ণনা, আমি, ওই সতেরো বছরের হাতকাটা গেঞ্জি ও ধুতি পরা যুবা, দিতে মনস্থ করিতেছি না; শুধু পাঠকের সঙ্গে কথা বলিতে ভাল লাগে তাই বলিব, তাহার নাম পূর্ণশশী। কতবার ভাবিয়াছি—ঐ তো সে এখনো ভাবিতেছে আজ হয়তো তাহার হাত তাহার বশ মানিবে না, আলিঙ্গন করিবে; আজ হয়তো তাহার মুখ চুম্বনে চুম্বনে পূর্ণশশীকে জানাইয়া দিবে সে ডাগর হইয়াছে, সে শহরে গিয়া জানিয়াছে; কিন্তু ঐ তাহাকে দেখা যায়, পূর্ণশশীর হাত হইতে জাম খাইতেছে যেভাবে পোষা ঘোড়ায় মানুষের নিকট হইতে দানা খায়, শুধু একটি করতল পূর্ণশশীর পদমূলে। জামবনে হাওয়া অতি ধীরে বহিতেছে। পাঠক, আপনাকে ভগবান জানিয়া বলিতেছি, আমি এ-ই। " (আত্মকথন)
এই কবিতাটি কিন্তু অন্তর্গত কথোপকথন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত এক অদৃশ্য ব্যক্তি। তিনি পাঠক। যেন কবি স্বীকারোক্তি করছেন পাঠকের কাছেই। কবির কাছে পাঠকের কাছে স্বীকারোক্তি করা ছাড়া আর তেমন কিছু হয়ত করার থাকে না। সমস্ত শিল্পকর্মই কি তবে একপ্রকার স্বীকারোক্তি? আমাদের বিভিন্ন মুহূর্তে বিভিন্ন নগ্ন সত্যগুলির সঙ্গে যাপনের স্বীকারোক্তি? এতটাই ব্যক্তিগত, যে পাঠক যেন বা সেখানে কবির কাছে ত্রাতা হয়ে আসেন। বা, হয়ে পড়েন কবির চলমান জীবনপ্রবাহের সাক্ষী। মনে হয়, কবির আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক, সমস্ত প্রকার সংযোগের সাক্ষী হয়ে থাকে কবিতা এবং সেই কবিতার পাঠক। কবি সেখানে সৎ, পরিশ্রমী এবং উদাসীন। সত্য কথা উচ্চারণ করে যাওয়া ছাড়া কবির আর তেমন কিছু করার থাকে না। তিনি এই সত্য কথাগুলি বলতে বলতে নিজের অস্তিত্বকেও স্বাভাবিকতায় ঊর্ধ্বে নিয়ে যান। বিপন্ন হন। এই বিপন্নতার মধ্যে বিস্ময়ের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় তাঁর ‘আসক্ত নির্লিপ্তি’।
এই ‘আসক্ত নির্লিপ্তি’-র কথাই আমার ব্যক্তিগত ভাবে পাঠক হিসেবে মনে হয় পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতা পড়তে পড়তে। কারণ কবির সেই প্রথম পর্যায়ের কবিতার সময় থেকেই প্রত্যক্ষ করি, তিনি প্রবল আসক্ত হয়ে কোনও বিষয়ের অভ্যন্তরের কথা বলতে বলতে অনুভব করছেন, তিনি নিজেও সেই বিষয়ের কেবল একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া আর কিছু নন। কিন্তু এই প্রত্যক্ষদর্শনের কাজ কেবল যে তাঁর এই জন্মেই ঘটে চলেছে তা নয়, বরং এক জন্মের মধ্যে দিয়ে তিনি বারবার অভিযাত্রা করছেন বিভিন্ন জন্মের মধ্যে। তিনি যেন ভূতগ্রস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনও কখনও দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। আসক্ত হয়ে পড়ছেন যা কিছু মায়া, সে সবের প্রতি। নিজেকে বলছেন, এই আসক্তির কোনও অর্থ নেই। আবার এও তিনি অনুভব করছেন, আসক্ত হওয়া ছাড়া আর কিছু করারও নেই, কারণ পূর্বজন্মসূত্রেই তিনি এই অনুভূতিমালাকে প্রত্যক্ষ করার এক আবহমান ‘নিয়তিচেতনা’-র মধ্যে আছেন। এই নিয়তিচেতনার সূত্রেই তাঁর কাছে ফিরে আসে প্রেম, যৌনতা, মায়া এবং ক্রোধ। সেই সব অনুভূতিমালাকে ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁর মনের অন্তস্থিত রসবোধ তাঁকে অনেক ক্ষেত্রেই করে তোলে কৌণিক। যেন বা, একটু তির্যক কটাক্ষপাতের মধ্যেই রয়েছে তাঁর সত্যসন্ধানের গভীরতা।
যেমন্, 'অমিতব্যয়ী' নামক কবিতাটির কথাই যদি তুলে ধরি-
"টাকা মানুষের মনের প্রতিনিধি বলিয়াই টাকায় মানুষ রাজার মুখ, মনীষীর মুখের ছাপ বসায়, দেশের কোনও প্রিয় বৈশিষ্ট্যকে উৎকীর্ণ করে। কৃপণ এ কথা জানে। কৃপণ মানুষের মনকে অত্যন্ত বেশি মূল্য দেয় তাই উহার ব্যবহার রুদ্ধ করিতে চায়। কৃপণ চায় উত্তর-মন মনুষ্যত্ব, যাহা এখনও আবিষ্কৃত হয় নাই।"
কবিতার অন্তর্নিহিত এই সত্যের সঙ্গে ধ্রুপদী বিস্তারের সম্পর্ক যদি প্রত্যক্ষ করতে হয় তবে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে বারবার। এ ক্ষেত্রে যেমন আমরা দেখি বিষয়ের ধার ও ভারের কারণে তিনি কবিতার কাঠামো নিয়ে বারবার পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন, তুলে ধরছেন বিভিন্ন আঙ্গিকের বাংলা কবিতা, বিভিন্ন ছন্দকে রূপ দিচ্ছেন, সেই সব ছন্দে প্রাণপ্রতিষ্ঠায় মূর্ত হয়ে উঠছে তাঁর লিখিত নিরভিসন্ধির বাংলা কবিতা, ঠিক তেমনি, তিনি ছন্দ এবং কাঠামোর ক্ষেত্রে কেবল বাংলা তথা ভারতবর্ষের কাঠামোগুলির মধ্যেই তাঁর কবিতাকে সীমাবদ্ধ রাখছেন না।
তাঁর লিখিত চতুর্দশপদী বা সনেটগুলি আমাদের কাছে সনেট বিষয়ে শেষ কথা হিসেবেই থেকে যায়। সেক্ষেত্রে তিনি তানকা সনেট থেকে কামিংস, শেক্সপীয়র, পেত্রার্ক, উবের্তি, দান্তে গ্যাব্রিয়েল রসেটি সকলের মিল কাঠামো অনুসরণ করেই সনেট লিখেছেন। কাঠামোয় যেমন তিনি সনেটের ধ্রুপদী মিলের বিন্যাসে, এই শাসনের মধ্যেই কবিতাকে বেঁধে রেখেছেন, তেমন তাঁর সনেটগুলি পড়লে মনে হয়, শাসনেই তাদের মুক্তি। এ যেন সাধু ভাষায় গদ্যে কবিতা লেখার মাধ্যমে যেভাবে তিনি নানা সময়কে এক করে দেন, ঠিক তেমন কোনও ঘটনাই ঘটে।
পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের সনেট বললেই মনে হয়, হাঁটু মুড়ে সেই সনেটের সামনে বসে বিষয়টি শিখি। কারণ সনেটে অন্ত্যমিল বিন্যাসের ব্যবহার থেকে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার, যতিচিহ্নের ব্যবহার সর্বক্ষেত্রেই পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের সনেটগুলি আমাদের কাছে সনেটের পাঠক্রম। কিন্তু ধ্রুপদী এই কাঠামোর মধ্যেও যে পার্থপ্রতিমের কবিতার স্বর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সন্দর্ভে কাজ করে যায়, তা বলাই বাহুল্য। সেভাবে ভাবতে গেলে, আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, সনেটের পার্থপ্রতিম এক ভিন্ন কবিব্যক্তিত্ব। ব্যক্তি শিল্পী বা কবি হিসেবে তাঁর দার্শনিক অবস্থান হয়ত পালটায় না, কিন্তু কীভাবে তিনি সেই ভাবনার সঙ্গে কথা বলছেন, তা পাল্টে যায়। এই বিষয়টি লক্ষ্য করি 'রাত্রি চতুর্দশী', 'পাঠকের সঙ্গে, ব্যক্তিগত' এবং 'বর্ণজীবের সনেট' এবং 'নবান্ন' গ্রন্থেও।
"সনেট লেখার আগে পাণ্ডুলিপি এলো,
শূন্যে কোথাও কেউ আদেশ পেয়েছে
কাজ করবার জন্য, যন্ত্রকে চেয়েছে,
সে-যন্ত্র বলতে এই আমি, এলোমেলো।
কে কাকে বা পায়, তবু আমাকে তো পেলো
সেই চাপ --- তা এখন আকাশে ছেয়েছে,
বাতাসে গানের নৌকো অনেক বেয়েছে
তার মৃদুতীক্ষ্ণ ধ্বনি, কথার ইজেল-ও।
আমার দুপুর শেষ, বয়েস বিকেলে,
সুনিশ্চিত, দম গেছে অনেকটা কমে;
ভ’রে আছি পুড়ে-যাওয়া পুঞ্জপুঞ্জ মোমে।
এই পুঁজি তার কাছে ধরতে হবে মেলে,
কে জানে সে নিয়ে যাবে ঠিক কোন ধারে,
মণিপুরে, আজ্ঞাচক্রে, নাকি সহস্রারে।"
(চাপ, বর্ণজীবের সনেট এবং আগন্তুক)
কখনও কখনও মহাকাব্যের মধ্যে যেমন নিহিত থাকে কিছু কিছু সাবটেক্সট-এর মহত্ব, ঠিক তেমন, তাঁর চতুর্দশপদীগুলির মধ্যে কিছু কিছু সাবটেক্সট থাকে, যা সেই সব সনেটকেই আরও মহৎ করে তোলে। ভালো হত, যদি আমার এই ভাবনাটির স্বপক্ষে সবকটি সনেট নিয়েই আলোচনা করা যেত। কিন্তু তা এখানে সম্ভব নয়। মনে হয়, পার্থপ্রতিমের সনেটগুলি এক একটি বনস্পতির মতো, ডালপালা বিছিয়ে, অসংখ্যা পাতায়, ফুলে, ফলে নিজেকে বিস্তারিত করে আছে। কথাপ্রসঙ্গে এমন কিছু সত্য উচ্চারণ, চিত্রকল্প উঠে আসে, যেগুলি পাঠক হিসেবে আমাকে অন্তত এক দীর্ঘকালীন ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়।
যেমন-
১
স্বপ্নেও কি ব্যস্ত থাকি সে যৌবনবীজেরই বপনে?
অন্ধকারে ভয় নেই, ভয় থাকে শুধু কুয়াশাতে,
যা জানায়, রক্তও ধূসর হবে কালসন্নিপাতে,
যতো পারো মন দাও রোপণের ব্রত উদযাপনে।
(সুতীর্থ)
২
ধানের বাঙালি তুমি, একদিন পায়েসে, সৌরভে,
লক্ষ্মীপূর্ণিমার চান্দ্র স্বাদে খুব, খুবই নেশা ছিল,
প্রযুক্তিপ্রহারে সমকাল সেই নেশা ভেঙে দিল,
ডাক এলো পৃথিবীর বহুবিধ ভোজ্যের পরবে।
( অগ্রহণ)
প্রকৃতপ্রস্তাবে, সনেটের ধ্রুপদী কাঠামোর মাধ্যমে কবির ভাবনাজগতে ভ্রমণ আরও বিস্তৃত হয়। যে ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপট তিনি নির্মাণ করেন তাঁর কবিতায়, সেখানে মিশে যায় তাঁর ভাবনাজগতের ভ্রমণ, অভিজ্ঞতা, মেটাফিজিকাল আবহ ও অন্তর্জগতের মধ্যে কথোপকথন। বস্তুত, পাঠকের সঙ্গে, ব্যক্তিগত যে পরিসর, তা তিনি আজীবন তৈরি করেছেন তাঁর কবিতায়। বিশেষ করে এই সনেটগুলি সেই ভাবনাজগতের এক সঞ্চারীর মতো। যেমন 'বিরহী' কবিতাটির কথা এখানে বলা যায়। আস্তিকতা ও নাস্তিকতা নিয়ে সমস্ত ভাবনার নির্যাস এই সনেটটি-
"ঈশ্বরকে না মানলেও, ঐশ্বর্যকে রীতিমতো মানে
বুদ্ধিজীবী নাস্তিকেরা। ফল হয় ভাবনা যাদৃশী,
অন্তত ধনীজনের সঙ্গে হয় গাঢ় মেশামিশি,
ভিতরে পুলক,মুখ কপটবিষাদে পূর্ণ ধ্যানে।
ঈশ্বর ও ঐশ্বর্যকে অনেকেই রাখে এক স্থানে,
কোনোটি না ফসকে যায়, এমন দুশ্চিন্তা দিবানিশি,
মাঝে মাঝে শুনতে চায় কি বলছেন গুরু যোগী ঋষি
মাঝে মাঝে গেয়ে ওঠে ভক্তিমূলক গীতিগানে।
ঐশ্বর্য মানি না, শুধু ঈশ্বরকে মানি, অল্প লোকে
এই কথা বলে বটে। কিন্তু নিরাকার বা সাকার
ঈশ্বরের খ্যাতি হয় দেখিয়ে নানান চমৎকার,
সে কথা তারাও জানে, তাই থাকে গূঢ় দুঃখে, শোকে।
অপেক্ষা, অপেক্ষা শুধু, এটাই তাদের ব্রতকথা,
মানুষের ইতিহাস এর হতে দেয়নি অন্যথা।"
মনে পড়ে যায় বেলা অবেলা কালবেলার কথা। ঠিক যেমন পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের সাধু ভাষায় লিখিত কবিতাগুলির মধ্যে বিভিন্ন সময়ের মধ্যে যে ভ্রমণ তা নিয়ে যায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। বিশেষ করে তাঁর লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং ছোটগল্পগুলির কথা মনে পড়ে। মনে হয় তাঁর যে মৃত্যুকে অতিক্রমকারী জাতিস্মর-পর্ব ছোটগল্প ও উপন্যাসগুলির মধ্যে ফুটে ওঠে, একটি সময়ের মধ্যে দিয়ে অবলীলায় যেভাবে তিনি বিভিন্ন সময়ে চলে যান, মনে হয় তা গভীর ভাবে রেখাপাত করেছে কবির মননে। সেই আবহ, যে আবহ কবিতাগুলির মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে, তা যেন এক দীর্ঘতম মহাকাব্য বা উপন্যাসের অংশ।
জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতার কথা-য় যে মহাকাব্যিক রচনার কথা বলেছেন, তা পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতায় প্রথম থেকেই ছিল। তিনি আজীবন সেই মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটেই আছেন, লিখছেন। সনেটগুলি যদি সেই মহাকাব্যিক কবিতার বিস্তার হয়, তবে অন্যান্য কবিতাগুলি সেই বিস্তারের এক একটি দিগন্তকে ছুঁয়ে আছে। এক-ই সঙ্গে কেন্দ্র ও পরিধিকে ধারণ করাই হল পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতার বৈশিষ্ট্য।
তাঁর কবিতার মধ্যে যে ভাবনাগত ও বলার আঙ্গিকগত রহস্যময়তা, তা একপ্রকার বাস্তবতার তথাকথিত দেওয়ালকে ছুঁড়ে ফেলে বহু-বাস্তবতার সঙ্গে নিয়ত সংযোগ গড়ে তোলে। এক ধারাবাহিক অথচ দীর্ঘকালীন আধ্যাত্মিকতার পরিসর তৈরি হয়, যেখানে তথাকথিত ভাবে পরস্পর বিরোধী যুক্তিগুলিও সহাবস্থান করে। কারণ তিনি রামকৃষ্ণদেব কথিত সেই পাঁচিলের ওপারের যে জগৎ, তার সঙ্গে নিজের সংযোগ স্থাপন করেন। তাই একপ্রকার মাত্রা বা একপ্রকার বাস্তবতার ন্যারেটিভ তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য নয়, বরং মনে হয় বহুমাত্রা ও বহুবাস্তবতাকেই তিনি কবিতায় আহ্বান করেন। সেখানে মিলেমিশে যায় রাজনীতি, রাজনৈতিক দর্শন, ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা এবং আস্তিকতাও। বামপন্থী দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার মিলনের মতো এক দুরূহ বিষয় যে তাঁর কবিতাকে শেষের দিকে টেনে নিয়ে গেছে ভাবনাগত জায়গায় এমন একটি পরিসরে, যা বাংলা কবিতায় প্রকৃতই এক নতুন দিকের ইঙ্গিত।
কবি চলে গেলেন। কিন্তু আসলে এই যাওয়াটাই তো সব নয়। মহাকাব্যিক কবিতার দিকে তাঁর এই অভিযাত্রা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ফুরোয় না। বরং কবিতার এক অনন্ত সমুদ্রের মধ্যে মিশে গেলেন তিনি।
কবিতাসংগ্রহ ছাড়াও রয়েছে তাঁর অগণিত কবিতা যেগুলির গ্রন্থভুক্তি হয়নি। বিশেষ করে প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'দেবী' প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। তার পর তেরো বছর তিনি লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। সেগুলির অধিকাংশই এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। মৃত্যুর আগেও তিনি লিখছিলেন বেশ কিছু নতুন কবিতা।
এক প্রকৃত কবির নশ্বর দেহ হয়তো এভাবেই চলে যায়। কিন্তু অক্ষরগুলি জীবন্ত হয়ে ওঠে। আগামীর পাঠক কবিকে আবার ফিনিক্স পাখির মতো জন্ম দেন। কারণ কবিতা, প্রকৃতই, অবিনশ্বর।
পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতা তো আরও অনেক বেশি অবিনশ্বর।
(লেখক কবি, অনুবাদক ও গদ্যকার। পেশায় বিজ্ঞাপনকর্মী। লিখেছেন পনেরোটি কাব্যগ্রন্থ, দুটি গল্প সংকলন ও একটি উপন্যাস। পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার (২০০৯) ও অনিতা- সুনীল বসু পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি (২০১৮)।)