Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

কবিতা লেখার মন ও মনের সম্পাদনা

অভিরূপ মুখোপাধ্যায়   ‘খেলা আর লেখা’, ‘রানাঘাট লোকাল’। ১৪ এপ্রিল, ২০১৬। রাত্রিবেলা। জয় গোস্বামী লিখছেন: বিধাতার ভাগ্য কখনো বদলায় না। বদলায় মানুষের ভাগ্য। তার কৃতকর্ম এক লৌহপিণ্ড। সেই পিণ্ডের সঙ্গে গড়াতে-গড়াতে সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামে।

কবিতা লেখার মন ও মনের সম্পাদনা

শেষ আপডেট: 10 November 2020 06:39

অভিরূপ মুখোপাধ্যায়

  ‘খেলা আর লেখা’, ‘রানাঘাট লোকাল’। ১৪ এপ্রিল, ২০১৬। রাত্রিবেলা। জয় গোস্বামী লিখছেন: বিধাতার ভাগ্য কখনো বদলায় না। বদলায় মানুষের ভাগ্য। তার কৃতকর্ম এক লৌহপিণ্ড। সেই পিণ্ডের সঙ্গে গড়াতে-গড়াতে সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামে। নামতে-নামতে ও-ই সে লৌহপিণ্ড পৌঁছল আগুনে... এখন অনন্তকাল জ্বলবে... ওই পিণ্ডের ভারবহনকারী একদিন যতটুকু সাধনাই করে থাকুক, সবই অন্যের অবিশ্বাসীরূপী আগুনে ছাই হতে থাকবে... ছাই... জীবনের সেই আশ্চর্য বিধাতা ও অবিশ্বাসী অগ্নি। ছাই এবং অনন্ত। এর মধ্যে থেকে এখন একটিইমাত্র বাক্যাংশ তুলে নিই যদি: “ওই পিণ্ডের ভারবহনকারী একদিন যতটুকু সাধনাই করে থাকুক...”--- যে-সাধনার কথা এখানে জয় গোস্বামী বলছেন, একজন কবিতা-লেখকের জীবনে, একজন শিল্পনির্ভর মানুষের মধ্যে সেই ‘সাধনা’ শব্দটির অর্থ কীভাবে দেখা দেয়? এ-সাধনা আসলের কার? ‘গোঁসাইবাগান’-এর ৩৫ সংখ্যক লেখায় জয় গোস্বামী লিখেছিলেন এমনই একটি লাইন: “সে-ই মন, যে-আমার প্রধান সম্পদ, প্রধান সহকর্মী।” সাধনা কি তবে সেই মনের? সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে জয় গোস্বামীর কাছে জানতে চাওয়া হয়: প্র: ... ‘আজকাল’ পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছেন, কবিতা লেখার কাজে নিরন্তর মন-কে সম্পাদনা করে চলবার কথা। মনের সম্পাদনা আসলে কী? উ: মনের সম্পাদনা আসলে কী তা এক-কথায় বুঝিয়ে বলা মুশকিল। মনের মধ্যে তো একটা ঝড় চলতে থাকে সবসময়। যদি সবসময় সেই ঝড় নাও চলে অন্তত লেখার সময় সেই ঝড় চলতেই থাকে। সেই ঝড়ে অনেক গাছ উপড়ে যায়। অনেক বাড়ির চালা উড়ে পড়ে। কত পাখির বাসা ছানাসুদ্ধু গাছ থেকে নীচে পড়ে থেঁতলে যায়। কবিতা লেখার সময় এরকম একটা তাণ্ডব মনের ভেতরে চলতে থাকে। তখন মন-কে একটা নিয়ন্ত্রণ দিতে হয়। যে-নিয়ন্ত্রণের দ্বারা আমি সম্ভাব্য লক্ষ্য স্থির করতে পারব। কারণ, আমি কখনো কবিতা লেখার সময় আমার লক্ষ্য স্থির করতে পারি না। এমনকি আমি যখন সম্পাদকদের বলে দেওয়া বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা লিখেছি তখনও যে কখনোই পুরোপুরি তাঁদের কথা অনুযায়ী লেখা তৈরি করতে পেরেছি তা নয়। সম্পাদকদের বলে দেওয়া বিষয়গুলি একটা সূচনাবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে মাত্র। ওই যে তোমাকে বললাম, এ হল শূন্যতার মধ্যে থেকে নিজেকে একটা বিষয়ের পাথরের গায়ে ক্রমাগত ছুঁড়ে দেওয়া এবং সেই পাথরে আঘাত লেগে বিস্ফোরিত হয়ে যাওয়া। তার থেকে মনের যে টুকরো-টুকরো অনু-পরমাণু চারিদিকে ছিটকে পড়ছে, তা-ই হচ্ছে কবিতা। এইবার বলি, নিজের মন-কে নিয়ন্ত্রণ দেওয়া বিষয়টি কীরকম? আমি যখন ‘বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা’ লিখলাম, ‘বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা’-য় চারটি দীর্ঘ কবিতা আছে। ‘বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা’ লেখা হয়ে যাওয়ার পর আমি লিখলাম ‘পাখি হুস্‌’। সবই ছোটো কবিতা। এইভাবেই মন-কে লেখার মধ্যে দিয়ে সম্পাদনা করতে-করতে যাওয়া। অবিরল সম্পাদনা। এই আর কি!   বিষয়টির আরো বিস্তারে ‘মনের সম্পাদনা’ কথাটিকে সামনে রেখে জয় গোস্বামীর কবিতার দিকে তাকাব এবার। তাঁর ‘কবিতা সংগ্রহ’-এর খণ্ডগুলি খুলে বসলে দেখা যায়, ২০০৮-এর ফেরুয়ারি থেকে ২০১১-এর জানুয়ারি পর্যন্ত--- এই তিন বছরের মধ্যে তিনি কোনো কবিতা লেখেননি। কিন্তু সেই আপাত বিরতির পর সদ্য যে প্রথম দশক পার করে এল আমাদের বাংলা কবিতা, সেই প্রথম দশকে জয় গোস্বামী লিখলেন সতেরোটি কবিতার বই: ‘হার্মাদ শিবির’, ‘ফুলগাছে কী ধুলো!’, ‘দু দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’, ‘আত্মীয়স্বজন’, ‘মায়ের সামনে স্নান করতে লজ্জা নেই’, ‘একান্নবর্তী’, ‘বিষ’, ‘প্রায় শস্য’, ‘গরাদ, গরাদ’, ‘নিশ্চিহ্ন’, ‘চরিত্র খারাপ’, ‘সপাং সপাং’, ‘আমরা সেই চারজন’, ‘প্রাণহরা সন্দেশ’, ‘পড়ন্ত বেলার রাঙা আলো’, ‘মরীচিকা’ এবং ‘দৈব’। এর সঙ্গে এই একই দশকে তিনি লিখেছেন কবিতা সম্পর্কিত গদ্যগ্রন্থ ‘গোঁসাইবাগান’ (১,২,৩ খণ্ড), ‘রানাঘাট লোকাল’ এবং একাধিক উপন্যাস ও ছোটোগল্প। সেই অর্থে আমরা বলতে পারি, একবিংশ শতকের প্রথম দশক-ই এখনও পর্যন্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময়পর্ব। কিন্তু মনের সম্পাদনা? আমি যে-হিসেবের খাতা খুলে বসেছি তার সঙ্গে ‘মনের সম্পাদনা’-র কী সম্পর্ক? সে-উত্তরে যাওয়ার আগে এই কবিতাটি পড়ি:   সম্পর্ক সম্পর্ক থাকে না। ক্রমে জলে ডুবে যায়। জল নেমে গেলে থাকে পলি। তাতে ঘাস ওঠে।                       লতাপাতা আগাছা জন্মায়।   রাস্তার কুকুর কোথা থেকে মরা একটা কাক মুখে আগাছার জঙ্গলে লুকোয়। আরেকটা কুকুর তাকে তাড়া করে আসে--- এ ওর মুখ থেকে কেড়ে খায়।   তোমার আমার মধ্যে সেটাই ঘটেছে--- মেনে নেওয়া ছাড়া আজ উপায় কোথায়?   কবিতাটির মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি এমন একটি সম্পর্ক যার শরীরে ক্রমাগত ঘটে চলেছে রক্তক্ষরণ। এমন ঘটনা কি আমাদের জীবনেও ঘটেনি কখনো? কত মানুষের সঙ্গেই তো এমন হয়! যখন বাইরের জগতের চোখে সে এবং আরেকজন সম্পর্কযুক্ত হয়ে দেখা দিতে থাকে। তারপর, সে-সম্পর্কও একদিন মাধুর্য হারায়। সেই তার ‘জলে ডুবে যাওয়া’। আর, ‘জল নেমে গেলে থাকে পলি। তাতে ঘাস ওঠে।/লতাপাতা আগাছা জন্মায়।’--- এখানে প্রথমে ‘পলি’ তারপর ‘ঘাস’ এবং ‘লতাপাতা’-র মধ্যে দিয়ে সম্পর্কের একটি অদৃশ্য সিঁড়ির পতন যেন রাখা আছে। এবং তারপরেই ‘আগাছা’ শব্দটির প্রয়োগ কী গুরুত্বপূর্ণ বলুন তো! ‘আগাছা’ শব্দটির কাছে পৌঁছেই যেন এইমাত্র নির্বাপিত হল মনের সমস্ত সহ্য-ক্ষমতা। কিন্তু সেই দু-জন মানুষ, যারা তখনও নিজেদেরকে নিজেদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করতে পারেনি। সামাজিকভাবে, কর্তব্যবোধে ভেতরে ভেতরে বহন করে চলেছে তাদের সেই ‘সম্পর্ক’ নামক ঘর। যা ততদিনে হয়ে উঠেছে একে অপরের পক্ষে শ্বাসরোধকারী। তখন তারা কি করে?--- ‘রাস্তার কুকুর কোথা থেকে/মরা একটা কাক মুখে আগাছার জঙ্গলে লুকোয়/আরেকটা কুকুর তাকে তাড়া করে আসে---/এ ওর মুখ থেকে কেড়ে খায়।’ তারা তখন মেনে নিতে শুরু করে। রক্তপাত, প্রতিদিনের ঘা, যন্ত্রণা, পুঁজ…। তারা মেনে নেয়। আর মাধুর্য নয়, মেনে নেওয়াই হয়ে দাঁড়ায় তখন তাদের সম্পর্ক। এ-কবিতা খুঁজে পাওয়া যাবে ‘দু দণ্ড ফোয়ারামাত্র’ বইয়ে। ‘দু দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এর ঠিক পাঁচ মাস আগে, এপ্রিল ২০১১-এ বেরিয়েছে ‘ফুলগাছে কী ধুলো!’। সে-বইয়ের একটি কবিতা এখানে তুলে দিচ্ছি এখন:   ময়লা ময়লা, কেমন কেমন, পালাও পালাও, খুলতে খুলতে   ময়লা ময়লা মাগো আমার আয়নায় কী মালা?   মনগুলো সব কেমন কেমন জল   দিয়ে দিলাম জলের আওয়াজ দিয়ে দিলাম পালাও পালাও হরিণ   তুই তোরা যা খুরের ঘায়ে থ্যাঁতলানো ঘাস বুঝতে বুঝতে বিকেল   এই মানে না ওই মানে মা? নারীর মানে খুলতে খুলতে শেষকালে অ্যাই!                                                                    পুরুষ?   টক্কা ফক্কা যা কিছু হোক ধরো।   ধরে দাঁড়াও। দাঁড়িয়ে থাকো। আমি এখন পালাই!   কোথায় পালাই কোথায় পালাই যে-কেউ এসো পায়ে ধরছি আমায় তাড়া করো   পাঠকদের অনুরোধ করব, কবিতাটি একবার সম্পূর্ণ পড়বার পরে, আরও একবার এর প্রত্যেকটি লাইন পৃথকভাবে পড়ার জন্য। সেক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাব, প্রায় প্রতিটি লাইনের প্রারম্ভ শব্দগুলি এক অসম্ভব গতিতে এগিয়ে গিয়ে নিজেদের সমর্পণ করছে সেই লাইনেরই প্রান্তে উপস্থিত শেষ শব্দের ভেতর। যেমন, ‘দিয়ে দিলাম জলের আওয়াজ দিয়ে দিলাম পালাও পালাও হরিণ’--- এই পুরো লাইনটি এসে ঝাঁপ দিল ‘হরিণ’ কথাটির মধ্যে। এবং তারপরেই ‘তুই তোরা যা খুরের ঘায়ে থ্যাঁতলানো ঘাস বুঝতে বুঝতে বিকেল’--- এক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ লাইনটির যে স্রোতধারা তা সম্পূর্ণ হল ‘বিকেল’ শব্দটির কাছে পৌঁছে। কবিতাটির লাইনগুলি পড়বার সময় মনে হয় যেন একটা বড়ো সুড়ঙ্গের মধ্যে গড়িয়ে চলেছি। ‘তুই তোরা যা খুরের ঘায়ে থ্যাঁতলানো ঘাস বুঝতে বুঝতে বিকেল’--- এই গড়িয়ে চলতে-চলতে শেষে ‘বিকেল’ শব্দটি যেই এল তখনই আমরা আকাশে পৌঁছলাম। লাইনটির মুক্তি ঘটল। ‘হরিণ’ শব্দটি আসা মাত্র আমাদের মন যেন অনেকটা বিস্তার পেল। এ-কবিতার প্রায় প্রতিটি লাইনের প্রান্ত-শব্দই ধারণ করে আছে এমন একেকটা মুক্তির আকাশ। এখনও পর্যন্ত কবিতাটির মধ্যে যে গঠন-ভঙ্গিমা ধীরে ধীরে উন্মোচন করেছে নিজেকে তা বহিরঙ্গ-বিমুখ। শান্ত, প্রচ্ছন্ন ও অন্তরালগামী। শীতের হাওয়ায় পাতায় পাতায় আগুন লেগে পুড়ে যাওয়া অরণ্য যেমন নিজের ভেতরে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে আর তারপর একদিন আচমকা বসন্ত এসে তার সমস্ত শাখা-প্রশাখায়, ঘন-গভীর বনপথেও ছড়িয়ে দেয় রঙ। তেমনই এরপর, এ-কবিতাটির মধ্যেও আচমকা এসে যোগ দিল সেই রঙের জাদু:   …নারীর মানে খুলতে খুলতে শেষকালে অ্যাই!                                                                          পুরুষ? প্রথমাবধি, ‘ময়লা’-‘ময়লা’, ‘দিয়ে দিলাম’-‘দিয়ে দিলাম’, ‘বুঝতে’-‘বুঝতে’, ‘পালাও’-‘পালাও’--- শব্দগুলির ধ্বনি-বিন্যাস একটু আগেই যাকে সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে গড়িয়ে চলা বলছিলাম, সেই গড়িয়ে চলার প্রকৃতিকে স্পষ্ট ও তীব্র করে তুলছিল। ‘…নারীর মানে খুলতে খুলতে শেষকালে অ্যাই!/পুরুষ?’--- এখানে এই ‘খুলতে’-‘খুলতে’ শব্দটি পূর্বের সেই দায়ভার সঙ্গে নিয়েই এইবার অর্থেরও একটি অতিসূক্ষ্ম সংকেতধর্ম যেন নিজের মধ্যে উপস্থিত করতে চাইল। কী সেই অর্থ? ‘নারীর মানে খুলতে খুলতে শেষকালে অ্যাই!/পুরুষ?’--- ‘খুলতে’-‘খুলতে’ শব্দটি ইশারায় আমাদের নারী-পুরুষের মিলনের দিকে নিয়ে যায়। এবং ‘শেষকালে অ্যাই!/পুরুষ?’--- কৌতুকপূর্ণ ‘অ্যাই!’ কথাটি সেই ইশারাকেই যেন সমর্থন করে। কিন্তু নারীর মানে কি শুধুই মিলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে? জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন: ‘এখনও নারীর মানে তুমি।’ এই ‘নারীর মানে’ কথাটির, একটি আশ্চর্য প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন জন্মান্তর ঘটালেন এই কবিতায় জয় গোস্বামী। ‘নারীর মানে’ খুলতে খুলতে খুলতে খুলতে কী পড়ে রইল শেষে? পড়ে রইল কেবল একটি শব্দ: পুরুষ। বীজ। জন্মের সম্ভাবনা। আবারও, সম্পূর্ণ লাইনটি এসে মিলিত হল সেই লাইনের শেষে থাকা ‘পুরুষ’ শব্দটির মধ্যেই। কিন্তু এইবার কবিতাটির গঠন-মন তাকে দিতে চাইল অর্থস্তর। যার জন্যে, শরীরী মিলনের ভূমি ছেড়ে কোনও অন্য পর্যায়ে পৌঁছে যেতে চাইল এই লাইনটি। পরপর দুটি কবিতার মধ্যে দিয়ে আমরা ভ্রমণ করলাম। দুটি কবিতাই দুটি ভিন্ন কাব্যগ্রন্থের। ‘দু দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’-র ‘সম্পর্ক’ কবিতাটির থেকে পিছনে মাত্র পাঁচ মাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘ফুলগাছে কী ধুলো!’-র ‘ময়লা ময়লা, কেমন কেমন, পালাও পালাও, খুলতে খুলতে’ কবিতাটি। পাঠকদের আরেকবার স্মরণ করাই, ‘দু দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’ প্রকাশিত হয়েছিল সেপ্টেম্বর, ২০১১। আর, ‘ফুলগাছে কী ধুলো!’-র প্রকাশকাল: এপ্রিল, ২০১১। অর্থাৎ, প্রায় সমসময়েই কাব্যগ্রন্থ দুটির কবিতাগুলি লিখেছেন জয় গোস্বামী। কিন্তু ‘দু দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’-র ‘সম্পর্ক’ আর ‘ফুলগাছে কী ধুলো!’-র ‘ময়লা ময়লা, কেমন কেমন, পালাও পালাও, খুলতে খুলতে’--- কবিতা দুটি একে অপরের থেকে কত আলাদা! কবিতা দুটির মধ্যে কবিতা-লেখকের মনের যে কারু-প্রক্রিয়া জাগ্রত হয়ে রয়েছে তা পরস্পরের বিচারে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অথচ, এদের ধারণ করে আছে যে কাব্যগ্রন্থ দুটি, তাদের নিজেদের মধ্যে দূরত্বের সময়সীমা মাত্র পাঁচমাস! ‘সম্পর্ক’ কবিতাটির যে জ্বালা-যন্ত্রণা তা অত্যন্ত প্রকাশ-উন্মুখ, অন্যদিকে ‘ময়লা ময়লা, কেমন কেমন, পালাও পালাও, খুলতে খুলতে’ কবিতাটি পেরিয়ে চলে যেতে চায় প্রত্যক্ষ অর্থের মান্য-সীমা। যন্ত্রণার বিন্দুমাত্র উপস্থিতি সেখানে নেই। বরং প্রচ্ছন্নে সে-কবিতা তৈরি করতে থাকে নিজের আশ্চর্য গঠন। প্রত্যেক লাইনের শেষে সেই লাইনকে ধরে রাখবার জন্য সে হাজির করে একটি করে আশ্রয়দাত্রী শব্দকে। একটি-ই মন এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এই দুটি কবিতা লিখছে, এ কী অবিশ্বাস্য নয়! এইবার, ‘ফুলগাছে ধুলো!’-র থেকে আরো একটু পিছিয়ে যাই যদি দেখব, ২০১১ সালে, ওই একই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জয় গোস্বামী লিখছেন ‘হার্মাদ শিবির’। সেই সময়ের এ-রাজ্যের শাসক দলের অত্যাচার এবং প্রধানত শাসকদল পোষিত হার্মাদদের দ্বারা নেতাই-এর গণহত্যার পরিবেশে জন্ম নিয়েছিল এই বই। সে-বইয়ের একটি কবিতা পড়ি:   নেতাই, ১১ জানুয়ারি, দুপুর ৩টে   দেওয়ালে গুলির গর্ত             দেওয়ালে, রোদ্দুরে শুকনো ঘিলু---   গুলির গর্তের মধ্যে দু-একগাছি চুল আটকে আছে, নারীর মাথার দীর্ঘ চুল...   একটা ফড়িং শুধু ঘুরে উড়ছে তার কাছে কাছে।      ‘হার্মাদ শিবির’ থেকে আরো একটি কবিতা তুলে দিই:   চুক্তি   গ্রামের বউরা সব শাক তুলতে গিয়ে পিছনে তাকায়   উঠোন-উনুনে রান্না বসিয়ে, তাকায়   শুতে যাবে, তার আগে, দাওয়া থেকে আঁধারে তাকায়   ওদের স্বামীরা সব ঘরছাড়া কতদিন--- ছেলে বাড়ি ফিরতে ভয় পায়   তুমি নাকি বিক্রি হয়ে গেছ, শান্তি?           কী চুক্তিতে? ক’লক্ষ টাকায়?   এসব কবিতার পরপরই কিন্তু জয় গোস্বামী লিখছেন ‘ফুলগাছে কী ধুলো!’। লিখছেন: ‘দিয়ে দিলাম জলের আওয়াজ দিয়ে দিলাম পালাও পালাও হরিণ’ অথবা ‘তুই তোরা যা খুরের ঘায়ে থ্যাঁতলানো ঘাস বুঝতে বুঝতে বিকেল’। তারপর লিখবেন ‘দু দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’--- যে কাব্যগ্রন্থে জীবনের তুচ্ছ ঘটনার মধ্যে আচমকাই এসে উপস্থিত হয় কাম, প্রেম, যন্ত্রণা আর মহাকাশ। সামান্য রোলের দোকানের মেয়েটিকে দেখে মনে হয়: ‘দোকান চালাচ্ছে একলা। ময়লা মুখ লাল ক’রে/স্টোভে পাম্প দিচ্ছে জোরে জোরে।/আগুন গনগন হচ্ছে। বললাম, মাগো তুই তো জগৎ চালাস!/বলতেই উনুন থেকে তাওয়া উড়ে যায়। তাওয়া ঊর্ধ্বাকাশে ওড়ে।/কিশোরীর হাতের আগুনে, আমি দেখি,/তাওয়ার পিছনে তাওয়া, অগ্নিময় চাকতি সব, এ ব্রহ্মাণ্ডে শূন্যে শূন্যে ঘোরে!’ এরপর, ২০১১ সালের একেবারে শেষে পৌঁছে, নভেম্বর মাসে প্রকাশিত হচ্ছে জয় গোস্বামীর আরো একটি কবিতার বই ‘আত্মীয়স্বজন’। সে-বই থেকেও একটি কবিতা পড়ি:   প্রপিতামহরা আমার ফেরার পথে পুরনো কবিতাদের হঠাৎ করে রাস্তায় দেখলাম। ‘আমি কবিশেখরের লেখা। কালিদাস রায়। তুমি আমাকে পড়েছ ইস্কুলে, ছোটোবেলায়, চিনতে পারছ কি?’ একজন বললেন, ‘আমাকে লিখেছিলেন করুণানিধান। শান্তিপুরে বড় রাস্তাতেই বাড়ি ছিল তাঁর।’ অন্যজন পরিচয় দেন ‘আমি যতীন সেনগুপ্তের বইতে রয়েছি।’ কেউ বলেন, ‘অক্ষয় বড়াল? নাম শুনেছ? তাঁর গ্রন্থে বাস করি আমি।’   এই ভরা বর্ষাকাল। এক্ষুনি তো বৃষ্টি এসে যাবে। আমি ছাতা ধরে ধরে ওঁদের সবাইকে এনে বই-এর টেবিলে বিছানা বালিশ পেতে, মশারি টাঙিয়ে শোবার ব্যবস্থা করলাম। টেবিলে জলের গ্লাস রেখেও এলাম। পরদিন দেখি, ওঁরা ভোর ভোর উঠে পড়েছেন। প্রাতঃভ্রমণ সারা। সকলেরই ভালোমতো বয়স হয়েছে।                                       এক-একজন লেখা আমার বাবার চেয়ে বড়ো। কাবেরীকে বললাম তুমি কিন্তু ওঁদের নাতবউ হও,                              ভালো করে সেবাযত্ন করো।   এ-কবিতায়, কবিতা-ই একেকটি চরিত্র হয়ে দেখা দিয়েছে। এভাবেই, সম্পূর্ণ ‘আত্মীয়স্বজন’ প্রয়াত কবি ও কবিতা-সমাজের মানুষদের নিয়ে লেখা। যেসব মানুষদের জয় গোস্বামী দেখেছেন, যাঁরা প্রয়াত এখন। যেমন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, ভাস্কর চক্রবর্তী, তুষার চৌধুরী। এমনকী যাঁদের কখনো দেখেননি, শুধু কবিতা পড়েছেন, অথবা কেবল সঙ্গ করেছেন তাঁদের শিল্পের, যেমন তুষার রায়, বিমলচন্দ্র ঘোষ, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র--- তাঁদের কোথাও রয়েছে এ-বইয়ে। শিল্পচর্চার সূত্রে যেকোনো শিল্পীর কাছে এঁরাই তো প্রকৃত আত্মীয়স্বজন--- এমনই একটি আশ্চর্য ধারণা থেকে বইটি তৈরি। এখানে কিন্তু কোথাও 'নেতাই'-এর হত্যাকাণ্ড নেই। ‘ফুলগাছে কী ধুলো!’-র কবিতার সেই বাচ্যার্থকে অতিক্রম করবার প্রবণতা নেই। ‘দু দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’-র কবিতার থেকেও কত আলাদা এই লেখা! অথচ ২০১১ সালে, একই বছর, একজন কবি এই চারটি বই লিখছেন। বাংলা কবিতাতেই ঘটে গেছে গেছে এমন ঘটনা। একবার নয়, দু-বার। এর আগেও, ১৯৯৯ সালে জয় গোস্বামী পরপর লিখেছিলেন: ‘মা নিষাদ’, ‘তোমাকে আশ্চর্যময়ী’ এবং ‘সূর্য পোড়া ছাই’। জয় গোস্বামীর পাঠক মাত্রেই জানেন যে এই বই তিনটি একে অপরের থেকে কত ভিন্ন। অথচ তাদের জন্মের মুহূর্তকাল প্রায় একই সময়-পর্বের অন্তর্গত। ঠিক যেমন, ‘হার্মাদ শিবির’, ‘ফুলগাছে কী ধুলো!’, ‘দু দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’ এবং ‘আত্মীয়স্বজন’--- কাছাকাছি সময়ের মধ্যে লেখা হলেও সম্পূর্ণ আলাদা তাদের প্রকৃতি, বিষয় ও মন। মন? হ্যাঁ মন। একজন কবির মনের ক্ষমতা কতদূর বিস্তার পেলে এমন করা সম্ভব তা আমরা শুধু কল্পনাই করতে পারি! “ওই পিণ্ডের ভারবহনকারী একদিন যতটুকু সাধনাই করে থাকুক...”--- এ-হল সেই সাধনা। ২০০৮ থেকে ২০১১--- এই তিন বছরের বিরতির পর প্রথম দশকের প্রথম বছরে যে চারটি কবিতার বই জয় গোস্বামী লিখলেন, তাতে চারটি পৃথক কবিমন-কে আমরা দেখতে পাই। এই তো আশ্চর্য! প্রকৃত মনের সম্পাদনা একেই তো বলব আমরা! আর এখানেই আবারও সত্যি হয়ে যেন জ্বলতে শুরু করে এই কথাগুলি: ‘সে-ই মন, যে আমার প্রধান সম্পদ, প্রধান সহকর্মী’। আমার অভিজ্ঞতাকে তার যোগ্যরূপের পাত্রে জন্ম দেওয়ার কাজে আমার সহকর্মী হিসেবে কে কাজ করছে? কাজ করছে আমার মন। অতিসামান্য সময়ের পার্থক্যে তাই বদলে যাচ্ছে একজন কবির কবিতার সম্পূর্ণ জগৎ। এই লেখা যখন শেষ করছি তখন আমার জানলায় বিকেলের আলো। আজ থেকে কয়েক বছর আগে এমনই একটি নভেম্বর মাসের বিকেলবেলা, আজকের এই শীতের রোদ্দুরের মধ্যে দিয়ে উড়ে আসছে আমার দিকে। তখন চোখের সমস্যায় ভুগছেন তিনি। কবিতার লাইনগুলি সারাদিন মনে-মনে লিখে চলেছেন। প্রধানত ‘প্রায় শস্য’ পর্বের কবিতা লিখছেন তখন। চোখের সমস্যা তাই খাতা-কলম নিয়ে বসতে পারেন না। কবিতার লাইনগুলি কাউকে মুখে বলে খাতায় লিখিয়ে নেন। এমনই একদিন, উনি বলছেন। আমি লিখে নিচ্ছি। বলতে-বলতে একটি লাইনে এসে থামলেন। তখনও কবিতাটি সম্পূর্ণ হয়নি। যে-লাইনে এসে থামলেন সেই লাইনেরই বিকল্প ভাবছেন। আমি চুপ করে বসে আছি। বাইরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে-রাত হয়ে এল যখন উনি আমাকে একটা কথা বলেছিলেন। একটি-ই মাত্র লাইন কিন্তু, অতটা সময় পার হওয়ার পর, তার কোনো যোগ্য পরিবর্তন না-পেয়ে উনি বলেছিলেন: ‘আজ আর মনে হয় কিছু হবে না। নিজের চোখেই দেখছ তো অভিরূপ, কবিতা কী করে লিখতে হয় আমি এখনও জানি না!’ তাঁর সেই অজানার পায়ে আমার জীবন-ভরা প্রণাম। যাঁর হাতে প্রতিনিয়ত ভরে উঠছে বাংলা কবিতার ঐশ্বর্যের ভূমি, তিনি যে-সময়ে কবিতা লিখে চলেছেন সেই সময়ের অন্তর্গত হয়ে আমিও বেঁচে রয়েছি, তাঁর কবিতা পড়তে পারছি, এ-আমার ভাগ্যের কাছে অপরিশোধ্য ঋণ! রাত পেরিয়ে আর কিছুক্ষণ পর শুরু হবে ১০ নভেম্বর। আমি জানি, এইবার আস্তে-আস্তে পাখি ডাকতে শুরু করবে। উড়ে আসবে শীতের বাতাস। সেই বাতাস গায়ে নিয়ে ভোর এসে দাঁড়াবে তাঁর বাড়ির দরজায়। এই বাংলা ভাষার বহু শতাব্দীর ভোরবেলারা আমাদের সকলের হয়ে তাঁকে বলবে: শুভ জন্মদিন!   অভিরূপ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৩। কৃষ্ণনগর। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর-পাঠ গ্রহণ করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্বভারতী থেকে ২০১৮ সালে সম্পূর্ণ করেছেন এম. ফিল। বর্তমানে দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি-র একটি গবেষণা-প্রকল্পে নিযুক্ত রয়েছেন। ২০২০ সালে কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে অভিরূপের প্রথম কবিতার বই: এই মন রঙের কৌতুক। প্রকাশক: সপ্তর্ষি।  

```